You are currently browsing xanthis’s articles.

মুহম্মদ তাওসিফ সালাম
১৬ এপ্রিল, ২০১১

বাংলাদেশে চাঞ্চল্যকর অর্থ কেলেঙ্কারিগুলোর সমালোচনায় রাজনীতির বেশ দৃশ্যমান উপস্থিতি থাকার ফলে ঠিক কি পরিমাণ টাকার জালিয়াতি হয়েছে, তা মুহুর্মুহ রাজনৈতিক বক্তব্য-পাল্টাবক্তব্যে হারিয়ে যায়। পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক কেলেংকারিতে প্রচারিত অর্থের পরিমাণ হাজার থেকে লক্ষ কোটির মাঝে ঘোরাফেরা করেছে। সম্প্রতি বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থর সংসদীয় বক্তব্যের ফলে ‘তিরিশ থেকে চল্লিশ হাজার কোটি’ সংখ্যাটি জাতীয় সংসদের রেকর্ডভুক্ত হয়েছে।

এটা বলা অপেক্ষা রাখে না যে যে অর্থ কেলেংকারিতে হাজার হাজার কোটি টাকা জড়িত, সেই কেলেংকারির নায়করাই হচ্ছে সে টাকাগুলোর প্রকৃত দখলকারী, যারা রাজনীতির সব হিসেব-নিকেষ বাদ দিলেও শুধু ঐ অর্থের জোরেই প্রচন্ড ক্ষমতাবান।

পুঁজিবাজারের কেলেংকারি তদন্তের আগপর্যন্ত বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সাবেক সরকারী ব্যাংকার ইব্রাহিম খালেদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোন প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু তদন্তের পর সেই প্রতিবেদন জমা দেয়া, প্রকাশ ও তাতে উল্লেখিত তথ্যকে ঘিরে একটি তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত হঠাৎ ঘোষণা দেন যে সেখানে দায়ী ব্যাক্তি হিসেবে কয়েকজনের নাম দেয়া আছে, যেগুলো এই সরকার প্রকাশ করবে না। প্রকাশ না করার কারণ হিসেবে অর্থমন্ত্রী, তিনি একটি গণতান্ত্রিক সরকারের ‘কারও প্রতি অনুরাগ বা ভয়ের বশবর্তী হয়ে কিছু না করা’-র শপথ নেয়া মন্ত্রী, তিনি দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে জানান, ঐ নামের লোকজন অনেক ক্ষমতাবান, তাই তাদের নাম বলা যাবে না।

এই প্রকাশ করা না করার প্রসঙ্গেই জন্ম নেয় বিতর্কের, যার ফলে দেশের সংবাদমাধ্যমের বেশ জবরদস্ত কিছু অংশীদার ইব্রাহিম খালেদের প্রতি সেই আচরণ করা শুরু করলেন, যেই আচরণ তারা কিছুদিন আগেই করেছিলেন ডক্টর ইউনুসের প্রতি।

সংবাদমাধ্যম এখন শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না। সংবাদমাধ্যম এখন কাগজ, টেলিভিশন, রেডিও ও কম্পিউটারের স্ক্রিন পর্যন্ত বিস্তৃত। এই উল্লেখিত মাধ্যমগুলোর প্রত্যেকটিই বাংলাদেশের কয়েকটি বহুল প্রচারিত সংবাদমাধ্যম রয়েছে। এই মাধ্যমগুলোতে যারা ডক্টর ইউনুসের প্রতি কিছুদিন আগে করা আচরণের ধরণগুলো মনে রেখেছেন, সেগুলোকে চোখের সামনে ভাসালে তারা বোধ করি সেই বিচারে তখনকার ইউনুস সাহেবের চেয়ারে এখনকার ইব্রাহিম খালেদ সাহেবকে বসাতে পারবেন। বেখাপ্পা লাগবে না।

পুঁজি বাজারে বিপুল পরিমাণ অর্থ জালিয়াতি হওয়ার পর এবং তার অংশীদার তেত্রিশ লক্ষ ব্যবসায়ীর প্রায় পথে বসবার দশা হওয়ার পর অনেক ঘটনা ঘটেছে ও ঘটছে। তবে মূল বা বেসিক ঘটনাটি ক্রমানুসারে হচ্ছে,

– একটি মহাপ্রতারণা করা হয়েছে। বহু মানুষ বহু বহু অর্থ বাজারে টেনে এনে সেগুলো গাপ করা হয়েছে। গাপ করেছে কয়েকজন মানুষ, যারা অর্থমন্ত্রীর ভাষ্যমতে এতই ক্ষমতাবান যে তাদের নাম নাকি তিনিই নিতে পারছেন না।

– সেগুলো তদন্ত করতে একজনকে বলা হয়েছিল, যেই তিনি তদন্ত প্রতিবেদনে কয়েকটি নাম ও কয়েকটি লাইন লিখলেন, ওমনি তার উপর শব্দবাণ নিক্ষিপ্ত হতে লাগল। যে নাইমুল ইসলাম খানকে কখনও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে অন্তত আমি দেখিনি, তিনিও এসে বললেন ইব্রাহিম খালেদের নাকি নীতির স্খলণ হয়েছে, ইব্রাহিম খালেদ নাকি দুর্নীতিবাজ। এই নাইমুল ইসলাম কিছুদিন আগে ডক্টর ইউনুসেরও একজন হঠাৎ গজিয়ে ওঠা সমালোচক ছিলেন।

– যে অর্থমন্ত্রী বললেন ক্ষমতাবানের নাম নেয়া যায় না, যে এমপি বললেন বিনিয়োগকারীরা সব ফটকা, যে অর্থ উপদেষ্টা বললেন বিনিয়োগকারীরা নাকি আদৌ সরকারের মাথাব্যাথাই না, তাদের বক্তব্য নিয়ে মিডিয়াকে বিন্দুমাত্র ভাবিত দেখা গেল না।

বাস্তবতা হচ্ছে, কোন বহুল আলোচিত ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ফলাও ভাবে যা প্রচারিত হয়, তা কোন কোন ক্ষেত্রে শুধু সেই ঘটনাটিরই ব্যাখ্যা নয়, বরং সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট হাজারটা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতার নির্যাস। বিশেষ করে কোন কোন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত কোন খবরের কয়েকটি লাইন পড়েই স্মরণ করতে হয় কে সেটির মালিক।

এই পরিস্থিতিতে একদল সংবাদ বিশ্লেষক সারাদিন মাথা কুটলেও কেউ বিশ্বাস করবেন না যে ইব্রাহিম খালেদ দুর্নীতি করে এখানে জলঘোলা করেছেন। বিশ্বাস করবেন না এই কারণে নয় যে সবাই ইব্রাহিম খালেদকে খুব ভালো জানেন। বিশ্বাস করবেন না এই কারণে যে- হঠাৎ করেই একজন নির্দ্দিষ্ট ব্যাক্তির, সে ইউনুসই হোক আর ইব্রাহিম খালেদই হোক আর শেখ হাসিনার যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগত আইনজীবি পায়াম আখাভানই হোক, চরিত্রহননে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সমবেত ও অন্তহীন চেষ্টার মাঝে যে কোথাও এতটুকু সৎ সাংবাদিকতা নেই, সেটি বোঝেন বাংলাদেশে এমন মানুষের সংখ্যা এখন অনেক। এই সংবাদমাধ্যমগুলোই রাজনীতি আর ব্যবসার দলাদলি করতে গিয়ে মানুষকে চালাক বানিয়ে ফেলেছে।

বোকা মানুষ ঠেকে শিখে চালাক হয়, চালাক মানুষ কিন্তু আর বোকা হয় না। যে পাঠক বা দর্শক বা ইন্টারনেট ব্যবহারকারী খবর পড়ে তার দিকে ঝুঁকে গিয়ে গন্ধ শোঁকার অভ্যেস একবার রপ্ত করে ফেলেছে, তার আর সেই অভ্যেস থেকে নিষ্কৃতি নেই, নিষ্কৃতি নেই আমাদের সংবাদমাধ্যমেরও।

অতএব ইব্রাহিম খালেদকে নিয়ে নষ্ট খেলা বন্ধ হোক। শেয়ার কেলেংকারিতে জড়িত মহাদস্যুদের বাঁচাবার চেষ্টা বন্ধ হোক।

Advertisements

http://firstcache.files.wordpress.com/2011/01/daily-star-vs-salman-f-rahman-over-stock-collapse-500px.jpg

খবরটি গত সোমবার ডেইলি স্টার পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল প্রথম পাতায়। পুঁজিবাজারে সরকারদলীয় রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের দুর্নীতির আলোচনা তুঙ্গে থাকা বর্তমান সময়ে ডেইলি স্টারের ঐ বিশেষ খবরটিতে যেন ছিল চুম্বকার্ষণ। কিংবা তার চেয়েও বেশি কিছু। অবশেষে খবর প্রকাশের দিনের শেষ ভাগে সালমান এফ. রহমান এটিএন নিউজে এক সাক্ষাতকার দেয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতিতে একটি অন্য মাত্রা যোগ করেছেন।

 

কী ছিল ঐ রিপোর্টটিতে

রিপোর্টের শিরোনাম- All fingers pointed at one man. অত্যন্ত সতর্কতার সাথে লেখা রিপোর্টটিতে একটি বারের জন্যেও কোন বিশেষ প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে রিপোর্টের অর্ধেকের বেশি অংশ জুড়েই রয়েছে ঐ ব্যবসায়ীর পরিচয়। তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে ব্যবহৃত বিশেষণ ও উল্লেখগুলো হল- তিনি ক্ষমতাসীন দলের এমপি, দলে প্রভাবশালী, তার প্রতিষ্ঠান কয়েক বছর আগেও ঋণের ভারে জর্জরিত ছিল, কর্মীদের বেতন দিতে পারত না, কিন্তু ২০০৯-এর মাঝামাঝি থেকে তারা দেশের একটার পর একটা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিতে শুরু করে। পরিচয় পর্বে এও বলা হয়, ১৯৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারিতেও এই ব্যবসায়ী জড়িত ছিলেন, কিন্ত ‘পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব’-এর অজুহাত দেখিয়ে সরকার তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয় নি।

http://shatil.files.wordpress.com/2011/01/fm-meet-on-stock-collapse-2-600px.jpg

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচকের অস্বাভাবিক পতন বিষয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘পদ্মা’-তে অর্থ মন্ত্রী এ.এম.এ. মুহিতের সাথে কিছু অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীর ঐ বৈঠকে এই বিশেষ ব্যাক্তির ভূমিকা প্রসঙ্গে বলা হয়, বৈঠকে অংশ নেয়া একাধিক ব্যাক্তি স্টক এক্সচেঞ্জের ঐ বিপর্যয়ের জন্য ঐ ব্যবসায়ীকে দায়ী করেন। জবাবে ব্যবসায়ী জানান তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী এবং এহেন সম্বোধনে তিনি অপমানিত হয়েছেন। এতে বৈঠকে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে অর্থ মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তা স্বাভাবিক হয়।

 

এটিএন নিউজে সালমান এফ. রহমানের সাক্ষাতকার

সোমবার রাতে এটিএন নিউজের স্টুডিওতে এসে মুন্নি সাহাকে সালমান এফ. রহমান একটি সাক্ষাৎকার দেন। স্টক মার্কেট কলাপস নিয়ে বাতাসে উড়তে থাকা খবর যেগুলোর অধিকাংশের সাথে প্রধানমন্ত্রী পরিবারের একাধিক সদস্যের নামের পাশাপাশি সালমান এফ. রহমানের নামটিও জড়িয়ে আছে, সেই খবরগুলো প্রসঙ্গে মুন্নি সাহা সালমান এফ. রহমানের কাছে জানতে চান। নরমে-গরমে, হেসে কিংবা কখনও ক্ষেপে সালমান এফ. রহমান সেগুলোর জবাব দেন। তার বেক্সিমকো ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সাত বছর ধরে জমতে থাকা ঋণের বোঝার পুরোটা মিটিয়ে দিয়েছে, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের এমন খবরের প্রতিবাদ করে তিনি বলেন, তারা যখন ঐ খবরটি করে তখনও ঋণ পুরোটা মিটানো হয়নি। উল্লেখিত সময়ে তার প্রতিষ্ঠানের দূরবস্থার কথা স্বীকার করে তিনি যোগ করেন, এমনও হয়েছে যে ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে তিনি বাকি কর্মীদের বেতন দিয়েছেন। কীভাবে প্রতিষ্ঠানটি রাতারাতি এখনকার মত নধর আকৃতি পেয়ে গেল, মুন্নি সাহার এই প্রশ্নের জবাব তিনি এভাবে দেন- কোম্পানির ভিত্তি বরাবরই শক্ত ছিল, অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর তার পরিবারের সক্রিয় সদস্যরা বিদেশ থেকে ফিরে এসে ব্যবসার হাল ধরে, তিনিও জেল থেকে বেরিয়ে এসে সক্রিয় হন।

http://shatil.files.wordpress.com/2011/01/fm-meet-on-stock-collapse-1-600px.jpg

ঋণের ভারে জর্জরিত একটি প্রতিষ্ঠান রেকর্ড পরিমাণ ঋণ উৎরে শুধু মাত্র পারিবারিক পুনর্মিলনীর দিয়ে কয়েক বছরের মাঝে জিএমজি এয়ারলাইন্স, ওয়েস্টিন হোটেল, বিডিনিউজ২৪-এর মালিকানা কীভাবে পেতে পারে, মুন্নি সাহা সালমান এফ. রহমানকে এই প্রশ্ন করে বিব্রত করেননি।

ডেইলি স্টার প্রথম আলো-র সাথে সালমান এফ. রহমানের একটি ‘মেক্সিকান স্ট্যান্ডঅফ’ ঘটেছিল প্রায় এক বছর আগে। ঋণে জর্জরিত অবস্থা থেকে সালমান এফ. রহমানের প্রতিষ্ঠানের উত্তরোত্তর উত্তরণকে প্রশ্ন করে কয়েকটি রিপোর্ট ছাপে প্রথম আলো। তার জবাবে সালমান এফ. রহমান সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান প্রথম আলো ডেইলী স্টার বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্থ করার চেষ্টা করছে, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে চাইছে। তিনি ওয়ান-ইলেভেনওয়ালাদের সাথে প্রথম আলো ডেইলী স্টারের সুসম্পর্কের কথাটি উল্লেখ করেন, এবং মাইনাস-টু ফর্মুলার প্রণেতা হিসেবে তাদেরকে চিহ্নিত করেন। তার জবাবে ডেইলি স্টার সম্পাদক ও প্রথম আলো প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, “একজন বছরের পর বছর ঋণ খেলাপ করে যাবে, কেউ তা নিয়ে কিছু বলতে পারবে না? সালমান এফ. রহমান এমন কী মানুষ যার সমালোচনা করলে সরকার অস্থিতিশীল হয়ে যাবে?” মেক্সিকান স্ট্যান্ডঅফই বটে!

সেই দিকগুলো সাম্প্রতিক স্টক মার্কেট কোলাপসের মধ্য দিয়ে যেন আরেকটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ডেইলি স্টার তার গোটা রিপোর্টে কোথাও সালমান এফ. রহমান বা বেক্সিমকোর নাম উল্লেখ করে নি, তবে এটিএন নিউজের সাক্ষাৎকারে সালমান এফ. অম্লানবদনে ডেইলী স্টারের ‘ঐ বিশেষ ব্যবসায়ী’ হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করে রিপোর্টটির সমালোচনা করেছেন। তিনি রিপোর্টটির ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন করেন এবং কয়েকটি ঘটনা বিকৃত ভাবে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান। যেমন- ডেইলী স্টার বলছে বৈঠকের একজন অংশগ্রহণকারী কলাপসের জন্য সালমান এফ. রহমানকে দায়ী করলে কথা কাটাকাটি শুরু হয় ও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে, যা নিরসনে অর্থ মন্ত্রী এগিয়ে আসেন। সালমান এফ. রহমান জানান ওরকম কিছুই সেখানে ঘটেনি। বৈঠকের এক পর্যায়ে তাকে ও তার প্রতিষ্ঠানকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা হয় স্বীকার করে তিনি জানান, তিনি সেখানে তোলা প্রশ্নগুলোর এক এক করে জবাব দেন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে জবাব দিতে গিয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি ‘এক্সাইটেড’ হয়ে পড়েন। সম্ভবত চেঁচিয়ে উত্তর দেয়ার ব্যাপারটাকে তিনি ‘এক্সাইটেড’ দিয়ে প্রকাশ করেছেন। তিনি যোগ করেন যে বৈঠকের শেষে কয়েকজন ব্যাক্তি তাকে জানিয়েছেন যে তার জবাব খুব ভালো হয়েছে, তবে আরেকটু নিম্নস্বরে ঠান্ডা মাথায় জবাব দিলে ভালো করতেন।

 

‘ইয়োর রাইট টু ন্যো’ ও ঢাক ঢাক গূঢ় গূঢ়-এর সহাবস্থান

‘ইয়োর রাইট টু ন্যো’-কে ডেইলি স্টার তাদের শ্লোগান হিসেবে বেঁছে নিয়েছে, যেমন বেঁছে নিয়েছে নিউ এজ ‘বায়াসড ট্যুয়ার্ডস পিপল’-কে। শ্লোগানগুলো সৎ, সত্যনিষ্ঠ ও দায়িত্মশীল সাংবাদিকতার প্রতীক। পত্রিকা হিসেবে ডেইলি স্টার বহুলপঠিত। চলমান ঘটনা ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর উপর খবর জানতে পত্রিকাটি বহু মানুষের জন্যই প্রাথমিক ও একমাত্র উৎস। সেই বিচারে বহু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রভাব ফেলার ক্ষমতা ও যোগ্যতা, দুইই পত্রিকাটির আছে। এই ক্ষমতা অতীতে তারা ব্যবহারও করেছে। এই ব্যবহার তাদেরকে বহুলপ্রচারিত প্রশংসা ও বহুলপ্রচারিত তিরষ্কার, দুইই এনে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সত্য প্রকাশে তাদের অপারগতার বিষয়টি আপত্তিজনক তো বটেই, অত্যন্ত হতাশাজনকও। ‘All fingers pointed at one man’ শীর্ষক রিপোর্টটিতে তাদের শ্লোগানকে আংশিক ভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের ওয়েবসাইটে রিপোর্টটির নীচে পাঠক মন্তব্য পড়লে ব্যাপারটি আরও স্পষ্ঠ হয়ে উঠবে। প্রথম পাঠক মন্তব্যটিতেই এই ‘ঢাক ঢাক গূঢ় গূঢ়’ অবস্থানের সমালোচনা করে একে অগ্রহণযোগ্য আচরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কয়েক বছর আগে পত্রিকাটির সম্পাদক মাহফুজ আনাম একটি টিভি সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, “সালমান এফ. রহমান এমন কী মানুষ যার সমালোচনা করলে সরকার অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে?”। এই কথাটি মনে রেখে ডেইলি স্টারের ঐ রিপোর্টটি পড়লে একজন পাঠকের মনে হতেই পারে, অবশেষে ডেইলি স্টারের দৃষ্টিতে সালমান এফ. রহমান কি এমন কোন ব্যাক্তি হয়ে উঠেছেন যার সমালোচনা করলে তারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশংকা করছেন?

https://i0.wp.com/www.bangladeshfirst.com/images/uploaded_images/80.jpg

ঢাকার গুলিস্তানে দ্বিমুখী যানজট (ছবিঃ বাংলাদেশ ফার্স্ট)

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার একেএম শহীদুল হক আফসোস করেছেন এই বলে যে, তিন বা পাঁচ শতাংশ মানুষ আইন ভঙ্গ করতে পারে, কিন্তু ১০০ ভাগ লোক আইন ভঙ্গ করলে পুলিশ কী করবে?

অর্থাৎ কমিশনার সাহেব আইন-শৃংখলার ব্যাপারে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। এই বিশেষ সময়ে ওনার উদ্বেগের কিছু কারণ অনুমান করা কঠিন নয়। চলছে রমজান মাস। মুসলিম-প্রধান দেশের আর দশটা রাজধানীর মত ঢাকাতেও রমজান মাসে শহর-চরিত্রের বলতে গেলে একটা আমূল পরিবর্তন ঘটে। গুরত্বের বিচারে বাজারদর নিয়ন্ত্রণের ঠিক পরেই অবস্থান নেয় আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি। এমনকি কোন কোন ঘটনার পর এই রমজান মাসে বিশেষ করে ঢাকাতে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতিই হয়ে উঠে সরকারের প্রধান মাথা-ব্যাথা, ২০০৭ সালের রমজানে মলম পার্টির দৌরাত্মে যেমনটা ঘটেছিল।

তবে সাধারণ মানুষের আইন ভঙ্গের প্রবণতার ব্যাপারে ডিএমপি কমিশনার যে বক্তব্যটা দিলেন, তা খুব সম্ভবত তিনি দিয়েছেন ট্রাফিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে। প্রাত্যহিক জীবনে আর কোথাওর চেয়ে রাস্তাঘাটেই একজন নাগরিককে সবচেয়ে বেশী করে এবং প্রায় প্রতিটি মুহুর্তেই আইনের বেড়াজালের মধ্যে থাকতে হয় পথচারী, গাড়ীচালক বা যাত্রী- যে ভূমিকাতেই হোক না কেন। ছোট বা বড় আইন ভঙ্গের ঘটনার সরাসরি প্রভাবটা গিয়ে পড়ে শহরের যানচলাচল পরিস্থিতির উপর, এবং বলতে দ্বিধা নেই, আমরা অর্থাৎ সাধারণ মানুষদের কিছু আইন না মেনে চলাটা রাজধানী ঢাকার যানজটের জন্য বিশেষ ভাবে দায়ী।

ট্রাফিক আইন মেনে চলার প্রসঙ্গ আসলে, এবং সেখানে যদি ঢাকার সাধারণ নাগরিকদের কেউ দোষী করেন (কোন পুলিশ কর্মকর্তা করলে তো কথাই নেই), তাহলে সাধারণ নাগরিকদের অধিকাংশই একটা ব্যাপার অবশ্যই উল্লেখ করবেন। সেটি হচ্ছে, শহরে চলাচলকারী আমাদের রাজপুরুষরা ট্রাফিক আইন কতটা মেনে চলেন।

বর্তমানে আমাদের শাসনব্যবস্থার মধ্যে শুধু ‘রাজনীতি’ শব্দটিতে ছাড়া আর কোথাও ‘রাজ’ শব্দমূলটি পাওয়া যায় না। তাও লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মন্ত্রী-আমলাসহ প্রশাসনের ঊর্দ্ধতন চাঁইদের বোঝাতে প্রায়ই এই ‘রাজপুরুষ’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। এখন কথা হচ্ছে, আমাদের রাজপুরুষরা রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময়ে ট্রাফিক আইন কতটা মেনে চলেন।

যাওয়ার রাস্তায় যানজট থাকলে একটি পুলিশের জিপ বা অন্যকোন গাড়ী আইন ভেঙ্গে পাশের উলটো দিকে যাওয়ার প্রায় ফাঁকা রাস্তাটির ডান পাশ ঘেঁষে এগিয়ে যাচ্ছে, কিংবা একটি পতাকাবাহী গাড়ী (রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ব্যাতীত) যানজট ঠেলে কোনরকমে তার পুলিশ-এসকর্ট সমেত চৌরাস্তা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, যদিও তখনও ট্রাফিক সিগন্যাল এগোবার অনুমতি দেয়নি, ঢাকায় চলাফেরা করতে গেলে এসব দৃশ্য চোখ এড়িয়ে যাবার কোন কারণ নেই। উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ সমষ্টিগত ভাবে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে, রাস্তায় নামলে এদের অনেককেই ট্রাফিক আইনের প্রতি ওভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতে দেখা যায়।

তাহলে ঢাকার যানজটের তীব্রতার পেছনে ‘রাজপুরুষ’-দের ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করার ওসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভূমিকা কতটুকু। তারা কি আইন ভেঙ্গে ঘটনাস্থলেই একটা যানজটের সৃষ্টি করেন? হয়তো করেন, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের আইন মেনে না চলার ঐ ঘটনাগুলো ঘটনাস্থলে যতটা না প্রভাব ফেলে তার চেয়ে বেশী প্রভাব ফেলে সামগ্রিক বিচারে।

কোন কোন সূত্রমতে ঢাকার জনসংখ্যায় প্রতি বছর বাহির থেকে ১৪ লক্ষ লোক যুক্ত হয়। এই পরিস্থিতিতে ব্যবস্থা না নিলে ভেঙ্গে পড়বার অপেক্ষায় থাকা ছাড়া ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থার আর কিছুর করার থাকবে না।

একজন সাধারণ নাগরিক যিনি কোন বাসে বা প্রাইভেটকারে বা সিএনজি অটোরিকশাতে বসে আছেন এবং অসহনীয় যানজটে ত্যাক্ত-বিরক্ত হচ্ছেন, উলটো দিকে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে আইন ভেঙ্গে চলতে থাকা পুলিশের গাড়ীটি সেই নাগরিকের উপর প্রভাব ফেলে সবচেয়ে বেশী। এসব ঘটনার ফলে, আইনকে শ্রদ্ধা করার যতটুকু প্রবৃত্তি সেই নাগরিকের মধ্যে গড়ে উঠেছিল, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা সংস্কার যার বদৌলতেই হোক না কেন, সে প্রবৃত্তি ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। এই ঘটনার দেখাদেখি যদি তিনিও একটি ট্রাফিক আইন ভেঙ্গে বসেন এবং দ্বিতীয় কোন পুলিশ সদস্যের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে আইনভঙ্গের ব্যাখ্যা হিসেবে তার সেই পুলিশকে আইন ভাঙ্গতে দেখার অভিজ্ঞতার উল্লেখ করেন, তাহলে তার শাস্তি বিন্দুমাত্র লোপ তো পাবেই না, উপরন্তু তিনি দ্বিতীয় ঐ সদস্যের কাছ থেকে কিছু ভৎসর্না পাবেন, অপমানিতও হতে পারেন। এ পর্যায়ে আইনের প্রতি তার শ্রদ্ধা লোপ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুতলয়ে চলতে থাকে। এই শ্রদ্ধা কমতে থাকার ঘটনাটি মূলত যে কুপ্রভাবটি ফেলে, তা হচ্ছে- সেই ব্যাক্তি ও তার মতন অনেকেই ট্রাফিক আইন মেনে চলাটিকে আর অতীব গুরুত্বপূর্ণ কিছু হিসেবে গণ্য করেন না।

এখন, উপরের যত সহজ ও সরল ভাবে প্রক্রিয়াটির ব্যাখ্যা দেয়া হল, সবার ক্ষেত্রে তা ওভাবে নাও ঘটতে পারে। কারও ক্ষেত্রে তা প্রভাব কম ফেলবে, কারও ক্ষেত্রে হয়তোবা ফেলবে বেশী। কিন্তু দিনশেষে যেটা দাঁড়ায়, “আমি রং সাইড দিয়ে গেলে আমাকে কে কী করবে?”, আমাদের রাজপুরুষদের এই চিন্তাধারা ঢাকার ট্রাফিক পরিস্থিতির অবনতির পেছনে বেশ শক্তিশালী ভূমিকাই পালন করে।

তবে একটা ব্যাপার উল্লেখ করতে হয়, একটি গাড়ীর মালিক, জিম্মাদার বা ব্যবহারকারী যিনিই হোন না কেন, রাস্তা দিয়ে গাড়ীটি প্রকৃতপক্ষে চলে তার চালকের ইচ্ছা অনুসারেই। এক্ষেত্রে গাড়ীটিকে আইন ভাংতে দেখলেই নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না যে এটি যিনি ব্যবহার করেন তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। হয়তো সেই গাড়ীর মালিক বা ব্যবহারকারী রাজপুরুষ আইন ভঙ্গের প্রবণতাকে ঘৃণা করেন, কিন্তু গাড়ীচালক সেই ব্যবহারকারীর অনুপস্থিতিতে তার পেশা, পদ বা অবস্থানের সুযোগ নিয়ে রাস্তায় কোন ট্রাফিক আইন ভাংছে কিনা এবং তার ফলে সামগ্রিক ভাবে কী বিরূপ প্রভাব পড়ছে, সেসব ব্যাপারে যদি তারা একটু মনযোগ দেন,তাহলে হয়তো তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও যানজট নিরসনে কিছুটা ভূমিকা পালন করতে পারবেন।



১২ মে, ২০১০ তারিখে দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত রিপোর্ট,

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা
জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে মতিউর রহমানকে
নিজস্ব প্রতিবেদক


মতিউর রহমান, প্রথম আলোর সম্পাদক

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ও সাংবাদিক টিপু সুলতানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। এই মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামি সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর দেওয়া জবানবন্দির পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। সিআইডি সূত্র এ কথা জানায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিআইডির একাধিক কর্মকর্তা গতকাল মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে জানান, কালের কণ্ঠে গত সোমবার আবদুস সালাম পিন্টুর জবানবন্দি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় প্রথম আলো ক্ষুব্ধ। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে কয়েকজন সাংবাদিক তাঁদের দোষারোপ পর্যন্ত করছেন। ফলে তাঁরাও এখন বিব্রত অবস্থায় আছেন।

গত ২৭ এপ্রিল আবদুস সালাম পিন্টুকে হাজির করা হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শরিফুর রহমানের আদালতে। ২০০১ সালের ১৬ জুন চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে বোমা হামলা মামলায় (মামলা নম্বর ১০ (০৬) ২০০১) রিমান্ডের জন্য ওই দিন শুনানি হয়। এই মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী আনিসুর রহমান দীপু কালের কণ্ঠকে জানান, সিআইডি পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত পিন্টুর চার দিনের (গত ২৭ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত) রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ওই দিনই সিআইডি পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পিন্টুকে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় নেয়।

সিআইডি সূত্র মতে, পিন্টুকে রিমান্ডে এনে এই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করাকালে প্রসঙ্গক্রমে চলে আসে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিষয়টি। এ সময়ই আবদুস সালাম পিন্টু প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের সম্পৃক্ততার কথা বলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতেই ২৯ এপ্রিল তাঁর এই জবানবন্দি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় পুলিশ লিপিবদ্ধ করে। গত মঙ্গলবার কালের কণ্ঠে যে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে, পিন্টুর জবানবন্দিতে সে সবই উল্লেখ আছে বলে সূত্র জানায়।

সূত্র আরো জানায়, মামলাটির অধিকতর তদন্ত অনেকটাই চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে এসেছিল। তবে এ ধরনের কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য চলে আসায় মোড় অনেকটা ঘুরে গেছে। আর এ কারণেই আরো বেশ কিছু সময় প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তাই আদালত থেকে তিন মাসের সময় নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, তদন্তে জানা যাচ্ছে যেসব ব্যক্তি আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার পাশাপাশি অরাজনৈতিক ‘তৃতীয় শক্তি’র হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে চেয়েছিলেন, তাঁরা এ হামলার ঘটনায় সহায়তা করেছেন। এসব তথ্য বের হয়ে আসায় তাঁরা এখন অধিকতর তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার অজুহাত তুলে নতুন রহস্য উন্মোচনে বাধা সৃষ্টি করতে চাইছেন। গতকাল দৈনিক প্রথম আলোতে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্তবিষয়ক একটি রহস্যজনক প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ায় নানা প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। ‘বদলে দেওয়া’র স্লোগানে মুখর পত্রিকাটি কৌশলে তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।

ওই পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকতর তদন্তে মাওলানা তাজউদ্দিনসহ হামলায় জড়িত জঙ্গিদের সহযোগী হিসেবে তৎকালীন প্রভাবশালী অনেকের নাম বেরিয়ে আসছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়। কিন্তু এ প্রভাবশালীদের মধ্যে কারা সন্দেহভাজন, তা প্রকাশ করা হয়নি।

দৈনিক কালের কণ্ঠে ছাপা হওয়া এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনের পাল্টা প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর জবানবন্দির ব্যাপারে গতকাল প্রকাশিত প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘খোঁজ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোনো কিছুই জানাতে পারেননি। জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেন, এমন কোনো জবানবন্দির কথা তাঁরা জানেন না। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হকও একই রকম মন্তব্য করেন।’ প্রথম আলোর মতো পত্রিকায় এ ধরনের প্রতিবেদন হাস্যকর। সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের ভালো করেই জানা থাকার কথা, কোনো মামলার তদন্ত শেষ হওয়ার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী আসামিদের দেওয়া প্রাথমিক জবানবন্দির তথ্য সাধারণত অবগত থাকেন না। তদন্ত কর্মকর্তারা বিষয়গুলো সংরক্ষণ ও যাচাই করে থাকেন। সে ক্ষেত্রে দৈনিক প্রথম আলো তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রকাশ না করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, র‌্যাব ও ডিবি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি ছেপে ধোঁয়াশা তৈরি করে পাঠকদের বিভ্রান্তিতে ফেলেছে। কারণ তাঁরা কেউই সরাসরি তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন। বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তার বাইরে খুব বেশি কারো অবগত থাকার কথা নয়।

সিআইডি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিআইডি ২৯ এপ্রিল এ ধরনের কোনো জবানবন্দি নেয়নি। তা ছাড়া ওই দিন পিন্টু ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় রিমান্ডেও ছিলেন না। আংশিক সত্য এ তথ্যের আড়ালে পত্রিকাটির অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে বলেই সন্দেহ করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। আগের দিন দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে কোথাও বলা হয়নি আবদুস সালাম পিন্টু ২১ আগস্ট মামলায় রিমান্ডে ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, তিনি জবানবন্দি দিয়েছেন সিআইডি দপ্তরে। সেখানে তিনি অন্য বোমা হামলা মামলায় রিমান্ডে ছিলেন।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তদন্তে বেরিয়ে আসে, সমাবেশে হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে জঙ্গিদের আর্জেস গ্রেনেড সরবরাহ করেছিলেন মাওলানা তাজউদ্দিন। তাজউদ্দিন পিন্টুর ছোট ভাই। তাঁরা দুই ভাই এ মামলার অভিযুক্ত আসামি। পিন্টু এ মামলায় কারাগারে থাকলেও তাজউদ্দিন পলাতক।’ এ দুজনের সঙ্গে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ও প্রতিবেদক টিপু সুলতানের সম্পর্কের কথা প্রকাশ পেয়েছে জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ১৬১ ধারার জবানবন্দিতে।

এদিকে কালের কণ্ঠে আলোচিত জবানবন্দি প্রকাশের পর প্রথম আলোর সাবেক ও বর্তমান কর্মীদের অনেকে জানিয়েছেন, জঙ্গিনেতা তাজউদ্দিন একাধিকবার প্রথম আলো কার্যালয়ে মতিউর রহমানের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাঁরা দীর্ঘ সময় আলাপও করেছেন।

Bangladesh Updates says,

“Statements of former BNP minister Abdus Salam Pintu and HuJI leader Mufti Hannan were allowing the detectives to believe that radical leader and another HuJI kingpin Maulana Tajuddin has had somewhat links with the 21 August assassination attempt on Sheikh Hasina.”

“Recent CID quizzes over Abdus Salam Pintu and some other low-cap HuJI leaders have revealed that Maulana Tajuddin and Prothom Alo editor Matiur Rahman once have maintained a very active communication, particularly prior to the 21 August bombings at Bangabandhu Avenue. Some former employees of Prothom Alo who worked there in 2004 also have agreed that such communications existed. Even some of them have confirmed that Matiur Rahman with some other men from Prothom Alo held numerous long meetings with Tajuddin prior to the 21 August bombings.”

“Now, CID have decided to quiz Matiur Rahman over his relation with Maulana Tajuddin.”

“Notably, Prothom Alo has made precise cover-stories over operations of organizations like HuJI and other radical Islamic groups. But Maulana Tajuddin, who has always been a high profile HuJI leader, have never come to the focus of any single report made by Prothom Alo.”

রুহুল কুদ্দুস বাবু। ভাইসাহেবের দুটো পরিচয় আছে। আসলে আছে তিনটি, তো তৃতীয়টির জন্য সামান্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন, তাই সেটা পরে দেই। প্রথম পরিচয় হচ্ছে, তিনি খুব শীঘ্রই বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় একজন বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন। একেবারে হাইকোর্টের জাস্টিস। নিয়োগ দিবে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার। এই গেল প্রথম পরিচয়।

দ্বিতীয়টা হচ্ছে, তিনি একজন প্রাক্তন ছাত্রনেতা। আগে জাসদ করতেন। পরে ছাত্রলীগের নেতা হন। উনি কিন্তু ঐ ঢাকা ইউনিভার্সিটির দুই সাংবাদিক পিটানো সৈকতের মত এলেবেলে ছাত্রলীগ নন। ইনি ছাত্রলীগের টিকেট নিয়ে রাকসুর জিএস হয়েছেন, সালটা ঠিক খেয়াল নেই, তবে আশির দশকের একদম শেষের দিকে রাকসুর কোন একটা ইলেকশানে। জনপ্রিয় নেতাই বটে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবু বকর সিদ্দিকীর কথা নিশ্চয়ই ভুলিনি। এই আবু বকর সিদ্দিকীকে নিয়ে যখনই আলোচনা হবে, তখনই এটা উল্লিখিত হবে যে এই নিরীহ ও মেধাবী ছেলেটা ছাত্রলীগের দুটি গ্রুপের সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছিল। রাজশাহীর ফারুক হোসেনের মৃত্যুর পর প্রায় দেড় হাজার গ্রেপ্তার করা হলেও, এই আবু বকর সিদ্দিকী মারা যাওয়ার পর ঐ মামলায় এখনও কোন গ্রেপ্তার হয়নি। আঘাতের ফলে বকরের মাথার পেছনের ছিদ্রটির ব্যাস দেড় ইঞ্চির বেশী হওয়া স্বত্ত্বেও নয়। কারণ একটাই, ফারুক ছাত্রলীগ সদস্য ছিল, আর বকর জানত না যে মৃত্যুর আগে তার ছাত্রলীগে যোগ দেয়া উচিত ছিল। লীগ-দল-পার্টি-মৈত্রী-সমাজ ইত্যাদির কোনটার সদস্য না হয়েও বকরের মৃত্যু হয়ছে ‘রাজনৈতিক সহিংসতায়’। দুটো দলের মারপিটও নয়, হল দখলে ছাত্রলীগের দুটো গ্রুপের মারপিট ও পরে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে পুলিশের পদার্পণ।

আসলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আবাসিক পরিচয় আব্দুল লতিফ হল। আবু বকরের মতই মেধাবী। আবু বকর কিন্তু শুধু পত্রিকার ভাষার মেধাবী ছাত্র ছিল না, সে একেবারে রেজাল্ট শিটের মেধাবী ছাত্র। ঢাবিতে ইসলামিক হিস্ট্রি বিভাগে তার ব্যাচে সে-ই ছিল সবচেয়ে বেশী সিজিপিএ-অলা ছেলে। এমনকি খুন হওয়ার তিন সপ্তাহ পরে দেওয়া রেজাল্টেও দেখা গেল বকরই ফার্স্ট হয়েছে।

১৯৮৮ সালের ১৭ই নভেম্বার। ঐ আব্দুল লতিফ হল দখল বা অনুরূপ কোন একটা মহৎ উদ্দেশ্যে বিশিষ্ট ছাত্রনেতা রুহুল কুদ্দুস ভাইয়ের গ্রুপের সাথে তার প্রতিপক্ষ গ্রুপের একটা পানিপথের যুদ্ধ সেদিন হয়েছিল। এই পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহীম লোদী বা বাবরের পক্ষের কজন সৈন্য শহীদ বা গাজী হল দুর্জনেরা তা বলে যায়নি। তবে সেই যুদ্ধে আসলাম গেল মরে। একেবারে আবু বকর সিদ্দিকীর মত আচমকা, কিংবা তার চেয়ে বেশী বা কম।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছাত্রহত্যার যেকোন ঘটনার পরই অভিভাবক শ্রেণীর মানুষজন বলেন, “কেন যে তোরা যাস পলিটিক্স করতে, মা বাবা কত কষ্ট করে পড়ায়, পড়তে পাঠায়, আর তোরা এসব করে পরিবারটাকে ধ্বংস করিস”, ইত্যাদি। কিন্তু আবু বকর বা আসলাম কারও ক্ষেত্রেই একথা গুলো বলার সুযোগ নেই। কেননা তারা কেউ কোন দলের সক্রিয়-নিষ্ক্রিয় কোন সদস্যই ছিল না।

যাই হোক, পরের দিন, অর্থাৎ ১৮ই নভেম্বার, বোয়ালিয়া থানায় আসলামের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটা হত্যা মামলা দায়ের করা হল। মামলার নাম্বার, ১৯৮৯ সালের নভেম্বার মাসের ১৪নং মামলা। আসামী ৩০ জন। প্রধান আসামী রুহুল কুদ্দুস বাবু। মামলার এজহারে তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করলেন, “জাসদ ছাত্রলীগ নেতা রুহুল কুদ্দুস বাবু কিরিচ দিয়ে আসলামকে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে”।

তদন্ত শেষে ১৬ জনকে বাদ দিয়ে ১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী বাকি ১৪ জনের নামে পুলিশ চার্জ গঠন করে। রুহুল কুদ্দুস বাবু ১নং আসামী। চার্জ গঠনের শুনানি শেষে চার্জশিট থেকে কয়েকজনকে বাদ দেয়া হয়। কিন্তু হাইকোর্টে এই বাদ দেয়াকে চ্যালেঞ্জ করে রিভিশান দায়ের করা হলে হাইকোর্ট চার্জশীটের কাউকে বাদ না দেয়ার নির্দেশ দেন। এই শেষের রায়টি হয় ২০০৯ সালের ২রা জুলাই তারিখে, রায় দেয় হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ। অর্থাৎ মামলাটি আজও পুরোপুরি সচল ও জীবিত।

জনাব বা জনাবা পাঠক, কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে আসলামকে মারার অভিযোগে রুহুল কুদ্দুস বাবু-র বিরুদ্ধে মামলাটি আজও রাজশাহীর জেলা ও দায়রা জজ কোর্টে বিচারাধীন আছ, মামলা নং-২৫৯/২০০২। রুহুল কুদ্দুস বাবু ১নং আসামী, ভিক্টিমকে কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে মারার দায়ে অভিযুক্ত।

মাননীয়, শ্রদ্ধেয়, জাহাপনা, প্রিয় ইত্যাদি বিশেষণযুক্ত পাঠক, আপনাকে উদ্দেশ্য করে বলছি বা লিখছি, ইনশাল্লাহ এই সপ্তাহেরই কোন একটা দিনে এই রুহুল কুদ্দুস বাবু, এই রুহুল কুদ্দুস বাবু মানে সেই রুহুল কুদ্দুস বাবু, যার নামে মামলার এজহারে ভিক্টিমকে কুপিয়ে মারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু তাই না, হাইকোর্টে তা গৃহীতও হয়েছে, সেই রুহুল কুদ্দুস বাবু হাইকোর্টের একজন বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাবেন।
নিয়োগ লাভের জন্য অধীর অপেক্ষায় আরও কয়েকজন যারা আছেন, তারা রুহুল কুদ্দুস বাবুর তুলনায় রীতিমত বিনা বিচারে বেহেশ্ত নসিব হওয়ার যোগ্য। তারা হলেন-

খসরুজ্জামান সাহেব, যিনি বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষায় আছেন, ২০০৬ সালের ৩০শে নভেম্বারে প্রধান বিচারপতির এজলাসের দরজার কাঁচ লাত্থি দিয়ে ভাংছেন।

আবু জাফর সিদ্দিকী, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক (১৯৯৭-২০০১)
জাহাঙ্গির হোসেন সেলিম, বর্তমানে অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের জুনিয়ার
খসরুজ্জামান, বর্তমানে ডেপুটি এ্যটর্নি জেনারেল ও আওয়ামী প্যানেল থেকে নির্বাচিত সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবি সমিতির সাবেক সভাপতি
প্রমুখ

দলীয় বিবেচনায় বিচারপতি নিয়োগের ঘটনা এই প্রথম তো নয়ই, এমনকি দ্বিতীয়ও নয়। বিগত বিএনপি সরকারের সময়ই মার্কশীটের ফ্লুইড চালিয়ে রেজাল্ট বদলে নিয়োগ দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য পরে সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে বিষয়টি তোলার আগেই আলোচিত ফায়েজী সাহেবের বিচারপতি জীবনের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটে। সংক্ষিপ্ত বিচারক জীবনে তিনি দুই বিএনপি নেতাকে খালাস দিয়ে যে দুটি রায় দেন, সেগুলোও বাতিল হয়ে যায়।

কিন্তু একটি সচল, জীবিত মামলার এজহারে যার নামে ভিক্টিমকে কিরিচ দিয়ে মারার কথা উল্লেখ করা আছে, সেরকম কোন মানুষকে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের ঘটনা বাংলাদেশে প্রথম, এই বিষয়ে অনেক টাকা বাজি ধরা যেতে পারে।

একটি মামলার চার্জশীট থেকে বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা জয়নাল হাজারীর নাম বাদ দেয়াকে অনুমোদন না করার অপরাধে বর্তমান আইন প্রতিমন্ত্রী (যিনি বটতলার উকিল হিসেবে আখ্যায়িত হওয়ার পর বেজায় রেগে যান) কামরুল ইসলাম একজন বিচারপতির বিরুদ্ধে সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু এরকম হাস্যকর প্রস্তাবে নিতান্ত আনাড়ি আইনজীবিরাও মশকরা শুরু করে দেয়াতে কামরুল ইসলাম তা দ্বিতীয়বার উচ্চারণ থেকে বিরত থাকেন।

তো, কামরুল ইসলামের মত লোকেরা যেখানে আইন প্রতিমন্ত্রী, সেখানে কি রুহুল কুদ্দুস বাবুর মত লোকদের বিচারক হওয়া স্বাভাবিক না?

না, স্বাভাবিক না। খুনের মামলার ১নং আসামীর বিচারক হওয়া তার চেয়েও মারাত্মক ব্যাপার। তার চেয়ে কামরুল ইসলাম সাহেবের ঐসব মন্তব্যও অনেকটা সহ্য করে নেয়ার মত।

মুহম্মদ তাওসিফ সালাম
১৯ মার্চ, ২০১০

বর্তমান সরকার যে বিরোধী দল বিএনপিকে নিয়ে এক ধরণের অবসেশানে ভুগছে, তা এই মুহুর্তে সম্ভবত অনস্বীকার্য। সংসদে আসনের হিসেবে অপেক্ষাকৃত দূর্বল বিএনপির প্রতি সরকারী দল কিছুটা অমনযোগী হলে একটি অন্য আলোচনার সূত্রপাত হতে পারত। কিন্তু আসলে তা ঘটছে না, বরং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের কথাবার্তায় বিরোধী দল বারবার আসছে। কিন্তু এই মনযোগের মাত্রাটাই হচ্ছে দুশ্চিন্তার মূল কারণ।

বিরোধী দল কেন সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করে না, কেন সরকারকে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে উপযুক্ত পরামর্শ দিচ্ছে না, সরকারের দুশ্চিন্তাটা এই ধাচের হলেও না হয় আমরা কিছুটা স্বস্তি পেতাম। কিন্তু বিএনপিকে নিয়ে সরকারের অবসেশানের মূলে যে বিষয়বস্তুগুলো রয়েছে, তার সাথে ঐসব সুন্দর সুন্দর আলোচনার কোন সম্পর্ক নেই। বিএনপিকে কীভাবে শিক্ষা দেয়া যেতে পারে, বিএনপি কিছু করলে রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক কী কী উপায়ে জবাব দেওয়া হবে, মূলত এগুলো হচ্ছে আলোচ্য বিষয়। এখান থেকেই কোন না কোন একটা পয়েন্ট তুলে নিয়ে কখনও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, কখনও আইনমন্ত্রী, কখনও বা এলজিআরডি মন্ত্রী নানান বিএনপি-মুখর আলোচনায় মেতে উঠেন। এমনকি ‘নতুন’, ‘অনভিজ্ঞ’ বা ‘স্বল্পকালীন বিশেষ ক্ষমতাবানদের প্রিয়জন’ ইত্যাদি বিশেষণ যোগ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরই পদবঞ্চিতরা যাদের ব্যপারে মাঠে ঘাটে কুৎসা গেয়ে বেড়ান, মন্ত্রীসভার এমন কিছু সদস্যও অনেক সময় বিএনপি-মুখর আলোচনার লোভ সামলাতে পারেন না।

বাংলাদেশের মানুষ তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশী রাজনীতি সচেতন এ কথা কম বেশী অনেক আলোচনাতেই উঠে আসে। অতএব রাজনৈতিক কূটকচালি তাদের প্রাত্যহিক জীবনের একটা অঙ্গ হতে পারত। কিন্ত অধিকাংশেরই তা হয়ে ওঠে না। দেশের জ্বালানী পরিস্থিতির ভবিষ্যত, দ্রব্যমূল্যের ঊর্দ্ধগতি, শ্রমবাজারের করুণ অবস্থা, কৃষকদের ফসলের উপযুক্ত দাম না পাওয়া, বিদ্যুতের অভাবে সেচকাজ ব্যহত হওয়ার আশংকা প্রভৃতি নিয়ে একবার চিন্তিত হয়ে পড়লে তখন মানুষ আর কাঁদা ছোড়াছুড়ির সময় কোন পক্ষের প্রতিই বিশ্বাস স্থাপনে প্রবৃত্ত হয় না। চলতি সবগুলো সমস্যার জন্য বিগত সরকারকে দায়ী করার ঘটনাকে তখন মানুষ দেখে দায় এড়ানোর অজুহাত হিসবে।

ঢাকায় কর্মস্থলে যাবার সময় যানজটের কারণে যার দেরী হয়ে যাচ্ছে, তার কাছে মূখ্য হচ্ছে যে সরকার যানজট নিরসনে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সে বিষয়টি। বিএসএফের গুলিতে সীমান্তবর্তী গ্রামের যে নারী পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে বিধবা হয়েছেন, তার কাছে মূখ্য হচ্ছে সরকারের কথিত বন্ধুদের এরকম অমানুষিক আগ্রাসন নিরসনে গৃহীত ব্যবস্থা। ঐ সদ্য বিধবা বাংলাদেশী নারী আশ্চর্য হয়ে ভাবেন, তার স্বামীর মত ১৪ জন এ বছর বিএসএফের বলি হল, অথচ ডঃ দিপু মণি নামের ভদ্র, শিক্ষিত ও সুন্দর ব্যবহারের রাজনীতিবিদ যাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্ম দেয়া হয়েছে, তিনি একটি বিবৃতি পর্যন্ত দিলেননা, একটা প্রতিবাদ জানালেন না।

নিম্ন বা মধ্য আয়ের যে মানুষটি কাঁচাবাজার করতে গিয়ে প্রতিদিনই উচ্চমূল্যের কারণে একটু একটু করে তার প্রয়োজনীয় কেনাকাটার পরিমাণ সংকোচন করে আসছেন, তার কাছে মূখ্য হচ্ছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনে সরকারের ভূমিকা। নির্বাচনী সমাবেশে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর শ্লোগান “আওয়ামী লীগকে ভোট দেব, ১০ টাকা কেজির চাল খাব”, এই শ্লোগান তার কানে বাঁজে, এবং তিনি আশ্চর্য হয়ে দেখেন যে এলজিআরডি মন্ত্রী এই শ্লোগানকে অস্বীকার করেছেন। অনার্স পড়তে থাকা বা অনার্স-মাস্টার্স দুটোই শেষ করে চাকরি না পাওয়া যে ছেলে বা মেয়েটি টিউশানি করে বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে পার্স ও মোবাইল খুইয়েছে, তার কাছে মূখ্য হচ্ছে সন্ত্রাস দমনে সরকারের ভূমিকা। ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মসংস্থান বাজার প্রসারণ নিয়ে সুন্দর সুন্দর যে কথাগুলোর উল্লেখ ছিল, সেগুলো সে পড়েছে, এবং অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তার অন্তত একটা ভগ্নাংশেরও বাস্তবায়ন হওয়ার।

তো, সমস্যার মধ্যেই আমাদের বসবাস। এতটুকু একটা জায়গায় আমরা এতগুলো মানুষ বাস করছি। আজকে যে অনার্স পড়তে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, সে তার নিম্ন মাধ্যমিকের সমাজ বিজ্ঞান বইতে জেনেছিল বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১২ কোটির কিছু বেশী। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক হিসাব মতে সেই সংখ্যা এখন ১৬ কোটি ২২ লক্ষ। তো, এই দেশে আবার দুশ্চিন্তায় চুল ছিড়বার মত সমস্যা থাকে না কি করে? দেশের মানুষ হয় জানছে নয়তো একদম সরাসরি উপলব্ধি করছে যে একটা না, হাজারো সমস্যা রয়েছে যেগুলো সমাধানে ঝাঁপিয়ে পড়া দরকার। সমাধানের প্রচেষ্টা কতটুকু দেখছে সেটা ভিন্ন বিতর্ক, কিন্ত মানুষ ফলাও ভাবে এটাও দেখছে যে সরকারের ঊর্দ্ধতন দায়িত্মশীল ব্যক্তিবর্গের একটা প্রধান আলোচ্য বিষয় হচ্ছে বিরোধী দল। তাও আবার বিরোধী দলকে কিভাবে উন্নয়ন কর্মকান্ডে শামিল করা যায় তা নিয়ে মাথাব্যাথার চিহ্নও দেখা যাচ্ছে না, বরং প্রধানমন্ত্রী নিজ মুখে উচ্চারণ করছেন যে ওমুক সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়েছে বিএনপিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্যে।

তো, বিরোধী দলের প্রতি বেশী বেশী মনযোগের কিছুটা চিরায়ত সমস্যাগুলো সমাধানে ব্যায় করা হলে হয়তো আমরা একটু স্বস্তি পেতে পারতাম।

লেখক সংঘে আপনাকে স্বাগতম। দ্যা রাইটার্স ক্লাবের বাংলা ভার্সন হিসেবে লেখক সংঘ ব্লগটি শুরু করা হয়েছে।

স্বাগতম

লেখক সংঘে আপনাকে স্বাগতম। এই ব্লগটির উপাদানসমূহ যদি আপনি পছন্দ করে থাকেন, তাহলে আশা করা যেতে পারে নিন্মোক্ত ব্লগগুলোও আপনার ভালো লাগবে।

আর ইংরেজী লেখক সংঘ তো থাকছেই।

সেপ্টেম্বর 2017
সোম বুধ বৃহ. শু. শনি রবি
« এপ্রিল    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

RSS বিবিসি বাংলা

  • An error has occurred; the feed is probably down. Try again later.