You are currently browsing writersclubeditor’s articles.

মুহম্মদ তাওসিফ সালাম

২৯ এপ্রিল, ২০১১

http://starazzobd.files.wordpress.com/2011/04/sahara-khatun-450px.jpg

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন

গত বছরের শেষে একটি লেখায় গণধোলাইয়ের পুনর্বিস্তার প্রসঙ্গে আশংকা প্রকাশ করেছিলাম। হতে পারে কাকতালীয়, তবে ২০১০-এর নভেম্বার-ডিসেম্বারে সারা দেশে গণধোলাইয়ে অপরাধী বা অভিযুক্তের মৃত্যুর এতগুলো ঘটনা ঘটেছিল যে আশংকা প্রকাশ না করে উপায় ছিল না।

সম্প্রতি কক্সবাজারে গণধোলাইয়ের শিকার হয়েছে ডাকাত হিসেবে অভিযুক্ত ১০ ব্যাক্তি। ডাকাতির বেশ বড় আয়োজনের জবাবে এলাকাবাসী আর পুলিশের আক্রমণ যৌথ ভাবে হলেও শেষমেষ সংঘর্ষটি ত্রিমুখী হয়ে পড়ে, যার শিকার ঐ দশজন ছাড়াও হয়েছে গ্রামের একটি নিরীহ যুবক। আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক গ্রামবাসী, অর্ধশতাধিক পুলিশ।

পত্রিকার ভেতরের পাতায় ছাপা হওয়া বিশ্লেষণগুলো বাদ দিলে, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় মূলত দুই ধরণের খবর চোখে পড়ে। প্রথম ধরণটি মৌলিক, এতে শুধু রয়েছে সারা দেশে ঘটা রোমহর্ষক সব অপরাধের ঘটনা। এর বিশ্লেষণ বা উদাহরণে যাব না, কারণ লক্ষ্য করেছি নৃশংসতার খবর পত্রিকায় গুরুত্বের সাথে প্রথম পাতাতে আসলেও বিভিন্ন বয়সের অনেকেই সেসব পড়তে বা এ সংক্রান্ত ছবি দেখতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। ইদানিং অবশ্য দেখি কয়েকটি পত্রিকা, যেগুলো কয়েক বছর আগেও অপরাধের বিস্তারের খবরগুলোকে প্রাধান্য দিতে, তারা এখন আর সেসব খবরকে সর্বাগ্রে তুলে ধরার আগ্রহ বোধ করে না। কেন কে জানে।

দ্বিতীয় যে ধরণের খবর আসে, সেগুলোই মূলত হচ্ছে নৈরাশ্যজনক এবং ক্ষতিকারক। এ খবরগুলোতে থাকে আমাদের মন্ত্রী ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতনদের বক্তব্য, যারা বিভিন্ন সভা-সমিতিতে অংশ নিয়ে নিরন্তর বলে যান দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি ওমুক বছরের চেয়ে ভালো, তমুক আমলের তুলনায় মানুষ কম মরছে ইত্যাদি।

এসব দায়িত্মজ্ঞানহীন বক্তব্যের প্রচুর নিন্দা পথেঘাটে হয়ে থাকে। ঢালাও নিন্দায় তা যাচ্ছি না। কয়েকটি ফলাফল ও পরিণতির কথা বলতে চাই।

দেশের সাধারণ মানুষ জানেন আর না-ই জানেন, কিংবা যা-ই জানেন, সরকার নিয়ন্ত্রিত যে কয়েকটি দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা তুলনামূলক ভাবে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম ও ঝুঁকির কাজ করেন, তার মাঝে অন্যতম হচ্ছে আইন-শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী, অর্থাৎ পুলিশ ও র‌্যাব। অপরাধ বিষয়ক অনেক সিনেমা-নাটক আমরা দেখি। বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী একাধিক উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে অপরাধ জগত। আমাদের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী কাঠামোয় প্রতিনিয়তি নিয়মতান্ত্রিক ভাবে যেসব অপরাধের রহস্য উদঘাটিত হয়, তার প্রক্রিয়া নিয়ে সেরকম অনেক সিনেমা, নাটক ও উপন্যাস তৈরি করা সম্ভব।

পুলিশ ও র‌্যাবকে কাজের পুরো প্রক্রিয়াটিই ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের শত্রু মানেই হচ্ছে অস্ত্রধারী ভয়ংকর অপরাধী। র‌্যাব-পুলিশকে প্রতিনিয়ত এই অপরাধীদের মুখোমুখি হতে হয়। অপরাধের খবর পেতে ও অপরাধীকে ধরতে তাদেরকে বিপজ্জনক জগতে প্রবেশ করতে হয়, প্রত্যক্ষ পরোক্ষ ভাবে যোগাযোগ করতে হয় বিপজ্জনক মানুষদের সাথে। সেখানে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে প্রয়োগ করতে হয় নানান কৌশল, চাতুর্য ও বুদ্ধিমত্তা। পত্রিকায় অপরাধের খবরগুলো আসে এবং এটা স্বাভাবিক যে পুলিশ এগুলোকে সংঘটিত হওয়া থেকে আটকাতে পারেনি বলেই অপরাধগুলো হয়েছে। কিন্তু কত শত-হাজার অপরাধ সংঘটন যে তারা প্রতিদিন প্রতিরোধ করছে, তা আমরা জানি না, কেননা তার অনেকটুকুই পত্রিকায় ছাপা হয় না। কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়া হয়তো কেউ জানেনই না অনেক ঘটনার ব্যাপারে।

প্রচন্ড ঝুঁকির মাঝে সরকারী দায়িত্ম পালনের ফলে র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরা তাদের জীবনযাত্রাকেও ঝামেলামুক্ত রাখতে পারেন না। তীব্র মানসিক পরিশ্রমের খুব সুস্পষ্ট প্রভাব পড়ে তাদের পরিবারের উপরেও। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী কাঠামোর বিভিন্ন পর্যায়ে যারা নিয়োগ পান, তারা আর দশটি সাধারণ পরিবার থেকেই এসেছেন। বিভিন্ন পরীক্ষায় পাস করে তারা বাহিনীতে যোগ দেন। কিন্তু যোগ দেয়ার পর সেই জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক বলার আর কোন সুযোগ থাকে না। আর দায়িত্ম পালন করতে গিয়ে ঝুটঝামেলার শিকার হওয়া তো আছেই। কক্সবাজারের ঐ ঘটনাতেই আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক পুলিশ, যার মধ্যে ২৬ জন ডাকাতদের এলোপাতাড়ি ফায়ারিং-এর ফলে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থতা ও অন্যান্য কারণে সরকারের প্রতি তীব্র জনবিক্ষোভের প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলান পুলিশ সদস্যরা। যেমন মুন্সীগঞ্জের বিস্তীর্ণ জলাভূমি অধিগ্রহণ করে বিমানবন্দর নির্মাণের যে সিদ্ধান্ত বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার গ্রহণ করেছিল, তার দ্বারা ক্ষুদ্ধ মুন্সীগঞ্জবাসীর প্রায় পুরোটা রাগই মিটেছিল পুলিশের উপর। স্থানীয় থানার একজন উপপরিদর্শক গণধোলাইয়ে মারা যান, আহত হন প্রায় দুইশতাধিক পুলিশ, যাদের কেউ কেউ এখনও রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যেসব কষ্টসাধনের কথা বলা হল, তার জবাবে বিতর্কে উৎসাহী কেউ এ কথা বলতে পারেন যে তারা সুবিধাও পাচ্ছে অনেক। কর্মকর্তারা পরিবারসহ সরকারী বাসভবনে থাকতে পারছেন, সাধারণ সদস্যদের জন্যও রয়েছে ব্যারাক। এ সকল সুবিধা সত্ত্বেও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত জনসংখ্যার ফলে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যে তাদের নিজেদের কর্মক্ষমতার বেশি শ্রম দিতে হয়, সে বিষয়ে কোন তর্ক চলে না। এই সেদিনও দেখলাম রাজারবাগ পুলিশ লাইনে মহিলা পুলিশদের হোস্টেলের একটি পুরো ফ্লোরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে। এমনিতেই লোডশেডিং-এর যন্ত্রণায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কঠিন, তার উপর সেখানে বিদ্যুৎ থেকেও নেই। সেই হোস্টেলের বাসিন্দা মহিলা পুলিশ সদস্যরা নিশ্চয়ই আরামে দিন কাটান না। পরিশ্রমের ডিউটির পর নির্দ্দিষ্ট সময়ে অপ্রতুল বিশ্রামের জন্য যে হোস্টেলে তারা ফিরে আসেন, সেখানেও তারা শান্তি পাচ্ছেন না।

এই পরিস্থিতিতে, অপরাধ হচ্ছে না বা আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি ভালো, এসব বক্তব্য দিয়ে আমাদের মন্ত্রীরা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিশ্রমী সদস্যদেরই অবমাননা করেন। দেশের মানুষ যখন দেখে মহামারীর আকারে সর্বত্র খুন-খারাপি হচ্ছে, তখন মন্ত্রীদের এসব বক্তব্যের ফলে মানুষের ক্ষোভ শুধু মন্ত্রীদের উপর নয়, পুরো ব্যবস্থার উপর গিয়ে জমা হয়, যার ফল মন্ত্রীদের চেয়ে ঐ সদস্যদেরকেই বেশি ভোগ করতে হয়। কেননা মন্ত্রীদের এসব পাতি বক্তব্যের ফলে মানুষ আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপর আস্থা হারায়, যার ফলে ওসব গণধোলাইয়ের ঘটনা বেড়ে যায়। এমন কি ক্রসফায়ারে হত্যাকান্ড ঘটলেও তাতে বাহবা দেয়ার লোকের অভাব হয় না, কেননা তাদের উপায় নেই।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী গত মার্চ মাসে একটি সভায় বক্তৃতার সময়ে আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, যে বাড়ির লোক খুন হয়েছে সে বাড়িতে গিয়ে এনারা বলেন দেশে নাকি অপরাধ নাই। মানসিক সুস্থতার ব্যাপারটিতে কোন মতামত বা সমর্থন জানাতে যাব না, কেননা এটি নির্ধারণ করবেন ডাক্তাররা, যা কাদের সিদ্দিকী নন বা নই আমিও। তবে এটা বুঝতে পারি যে মন্ত্রীদের ঐসব কথাবার্তা স্বাভাবিক নয়। কেউ কেউ বলেন, এসব হচ্ছে রাজনৈতিক বক্তব্য। রাজনৈতিক বক্তব্য মানে কি? যে বাড়ির লোক খুন হয়, সে বাড়িতে গিয়ে অপরাধ নেই দাবী করার মানে তো মিথ্যাচার। রাজনৈতিক বক্তব্য মানে কি শুধুই মিথ্যাচার?

সেদিন কয়েকজন সাংবাদিক হালকা মেজাজে একজন আরেকজনকে বলছিলেন, পত্রিকায় যেসব জনমত জরিপ হয়, সেখানে একদিনন ‘চিহ্নিত সন্ত্রাসীর ক্রসফায়ারে মৃত্যু বা গ্রামবাসীর হাতে গণধোলাইয়ে ডাকাতের মৃত্যু সমর্থন করেন কি’, এ জাতীয় প্রশ্ন রেখে দেখা যেতে পারে। কোন সন্দেহ নাই যে ফলাফল দেখে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চোখ কপালে উঠবে।

কথাটি ভুল নয়। চিহ্নিত সন্ত্রাসীর ক্রসফায়ারে মৃত্যু হলে প্রকৃতপক্ষেই সেই সন্ত্রাসীর বিচরণক্ষেত্র এলাকার বাসিন্দারা মোটেই কোন আক্ষেপ করেন না, বরং ক্রসফায়ারকে বাহবা দেন। গ্রামবাসীর হাতে ডাকাতে মৃত্যুর ক্ষেত্রেও বাস্তবতা অনুরূপ। কক্সবাজারে রবিবারের ঐ ঘটনায় গ্রামবাসী ডাকাতদের মেরেছে সারা দিন ব্যাপী। প্রথম দফায় দু’জনকে পেয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। বাকিরা পালিয়ে গিয়েছিল পাহাড়ের দিকে। গ্রামবাসী রীতিমত সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে সে পাহাড়কে প্রথম ঘেরাও করেছে, তারপর একেক দফায় অভিযান চালিয়ে দুই দফায় ৪ জন করে আরও ৮ জনকে মেরেছে। দিনশেষে তাদের হাতে নিহত ডাকাতদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০-এ। এরকম কেন হল? হয়েছে কারণ আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপর থেকে মানুষ আস্থা হারাচ্ছে।

আস্থার এই বিলুপ্তির কারণ শুধু বাহিনীর ব্যর্থতা নয়। এর জন্য মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতনদের দায়িত্মজ্ঞানহীনতাও দায়ী। যখন দেখা যায় ১৯৯৯ সালের মালিবাগ হত্যাকান্ড ও যুবলীগ নেতা ইব্রাহীম হত্যাকান্ড থেকে অপর যুবলীগ নেতা ও এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন ভোজবাজির মত অব্যাহতি পেয়ে যান, নাটোরে ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত ১৯ আসামী খালাস পাওয়া মাত্র ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী তাদেরকে উজ্জ্বলবর্ণ গাঁদাফুলের মালা পড়িয়ে বরণ করেন, তখন মানুষের মনে হয় অপরাধীকে হাতে পেলে আর ছাড়াছাড়ি নেই। এর ফলে বিচার ব্যবস্থা ঘটনার নাগাল পাবার আগেই শেষ হয়ে যায় অনেক মানুষের প্রাণ, যাদের সংশ্লিষ্টতা বা দায়িত্ম আদৌ কদ্দূর ছিল, তা আর জানা যায় না।

দুঃখের সাথে বলতে হয়, বড় দায়িত্ম পাবার পর আমাদের কর্তাব্যাক্তিরা ক্রমশ জনবিচ্ছিন্ন হতে থাকেন বলেই ওভাবে বলতে পারেন। এখনকার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে একটি বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা যখন মাইক্রোফোনের সামনে বলেন যে আইন-শৃংখলার অবস্থা ভালো, তখন তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কনিষ্ঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার সাথে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে তারা কতটা একমত।

লিমনের প্রসঙ্গ দিয়ে শেষ করব। এই লিমনের ঘটনাটি মিডিয়ার মনযোগ পেয়েছে। কিন্তু মনযোগ পায়নি এমন দুটো ঘটনাও এর আগে ঘটেছে। একটির শিকার ছিল তরুণ মডেল কায়সার মাহমুদ বাপ্পি, আরেকটির শিকার ছিল অ্যাপোলো হসপিটালের তরুণ কর্মী মহিউদ্দীন আরিফ। বাপ্পি মারা গিয়েছে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে চালানো অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে। আর আরিফ মারা গিয়েছে র‌্যাব সদস্যদের নির্যাতনে। লিমনের ঘটনাটি এখনও পরিণতির অপেক্ষায় আছে। তবে বাকি দুটো ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্তই বলছে র‌্যাব সদস্যরা দোষী।

তিনটি ক্ষেত্রেই র‌্যাব বা পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের সদস্যদের পক্ষে সাফাই গাওয়া হয়েছে। এই সাফাই গাওয়া বন্ধ হোক। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রই হচ্ছে ভালো ও মন্দের সংমিশ্রণ। ভাবার কোন কারণ নাই যে পুলিশ বা র‌্যাবে কোন মন্দ থাকবে না। সেই মন্দরা থাকবে, তারা অপকর্ম করবে। সবগুলো অভিযোগকে আমরা অপকর্ম হিসেবেই বা ধরব কেন? দক্ষ লোকদেরও কি তো ভুল হতে পারে না? এটা অনাকাংখিত ঠিকই, কিন্তু অবাস্তব বা অসম্ভব নয়। এই মন্দদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার কোন কারণ থাকতে পারে না। অতএব প্রত্যেকটি বাহিনীতে দুষ্টুকর্ম সাধনকারীদেরকে চিহ্নিত করে তাদের কৃতকর্মকে তদন্তের আওতায় আনা হোক। একটি বা দুটি মানুষের ভুলকে কোন কর্মকর্তা অস্বীকার করলে তার পুরো বাহিনীটি কলংকিত হয়। সেই বাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতা কমে এবং এতে কাজ করতে থাকা সৎ ও পরিশ্রমী কর্মীদের মর্যাদা হানি হয়। সাধারণ মানুষের মাঝে র‌্যাবের যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা অবশিষ্ট আছে। লিমনের ঘটনার সুষ্ঠু সুরাহা না হলে এমন ঘটনা আরও ঘটবে, যার ফলে র‌্যাবের গ্রহণযোগ্যতা কমবে, আর সেটা যে দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির জন্য কত ভয়াবহ একটা সংকেত হয়ে দাঁড়াবে, তা আমাদের কেউ কেউ হয়তো উপলব্ধি করছি না।

২৯ এপ্রিল তারিখে বাংলাদেশ ফার্স্টে প্রকাশিত

Advertisements

মুহম্মদ তাওসিফ সালাম

২৬ এপ্রিল, ২০১১

http://shatil.files.wordpress.com/2011/04/mufti-amini-and-maulana-abul-hasnat.jpg

হরতালে একপক্ষ বা দুটো পক্ষের জন্য না হলেও, গত ৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির হরতালটিতে সাধারণ মানুষের জন্য বেশ কয়েকটি চমক ছিল। হরতালের আহবানকারী দল বা গোষ্ঠী দেশের প্রধান দুটো দলের একটি না হলেও (একটির সাথে জোটবদ্ধ), হরতাল দেখে অনেক ক্ষেত্রেই তা বোঝার উপায় ছিল না।

হরতাল হয়ে যাবার পর স্বাভাবিক ভাবে যা হয়- সরকার দাবী করেছে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক ছিল, হরতাল পালনকারীরা দাবী করেছে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়েছে। কিন্তু দেশের প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমগুলো হরতালের সফলতা-ব্যার্থতার পাশাপাশি একটি ভিন্ন বিষয়ের উপর আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল। ভিন্ন বিষয়টি ছিল- মাদ্রাসার কোমলমতি ছাত্রদের হরতালের পক্ষে পথে নামতে বাধ্য করা।

প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক, উভয় মিডিয়াতেই হরতালের বেশ কয়েকটি দৃশ্যপট তুলে এনে সেখানে কিশোরদের উপস্থিতির বিষয়টি স্পষ্ট করে দেখাবার চেষ্টা করা হয়। একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেল আটককৃত কয়েকজন মাদ্রাসা ছাত্রের বক্তব্যও প্রচার করে, যেখানে তারা বলছে যে শিক্ষকরা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদেরকে পথে নামিয়েছে।

যেকোন ধরণের সাধারণ কর্মসূচী, সেটি রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক, আন্দোলনভিত্তিক বা সংবর্ধনামূলক যাই হোক না কেন, শুধু শিশুদেরই নয়, কাউকেই সেখানে যোগ দিতে বাধ্য করার বিষয়টিকে সমর্থন করা যায় না। সব সরকারের আমলেই কোন উচ্চপদস্থ মন্ত্রী বা রাজনীতিকের আগমন উপলক্ষে স্কুল কলেজের শতশত ছাত্রছাত্রীকে রোদ-বৃষ্টির মাঝে রাস্তার দু’ধারে দাঁড় করিয়ে রাখার সংস্কৃতিটি দেখা যায়, যা খুবই দরিদ্র মানসিকতার পরিচায়ক।

এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতিতে জড়িত বৃহত্তর ব্যাক্তিবর্গের মানসিক গঠনের একটি আভাস পাওয়া যেতে পারে। যদিও কোন মন্ত্রী নিশ্চয়ই ফোন করে বলেন না যে আমি আসব, হাজার হাজার ছেলেমেয়ে জোগাড় কর, সাধারণত অতি উৎসাহী সরকারী কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনীতিকদের উদ্যোগেই এ কাজগুলো হয়ে থাকে, তবুও মূল উপলক্ষ ব্যাক্তিটি, তিনি কোন মন্ত্রী কিংবা আমিনী যেই হোন না কেন, দায়িত্ম এড়াতে পারেন না। তিনি যদি নিজে উদ্যোগ নিয়ে সেই শিশুসমাগম না থামান, তবে বুঝতে হবে মুখ ফুটে না বললেও তিনি বিষয়টি সমর্থন করছেন, যা দুঃখজনক।

মাদ্রাসা ছাত্রদেরকে লাঠি তুলতে বাধ্য করার ফলে যারা ব্যাথিত হয়েছেন ও এর প্রমাণ দেখাবার জন্য সচেষ্ট হয়েছেন, তারা গণমাধ্যমের দায়িত্মশীল অংশবিশেষ, সন্দেহ নেই।

কিন্তু বাংলাদেশে, এটা কি শুধু ইদানিংই ঘটছে নাকি আগে থেকেই ছিল স্পষ্ট করে বলতে পারছি না, একটা খুবই ন্যাক্কারজনক ব্যাপার হল, কোন বিষয়ে আমরা উদ্বিগ্ন হব আর কোন বিষয়ে হব না, এই বিষয়গুলো নির্বাচনের ব্যাপারে আমরা অতি সূক্ষ্ম বাঁছবিচারের আশ্রয় নেই। যেমন, জোরপূর্বক শিশুসমাগম যাকে ব্যাথিত করেছে, অন্তত যে গণমাধ্যমগুলো এ ব্যাপারে সরব হয়েছে, তাদের কর্মকান্ডের উপর গভীর মনোনিবেশ করে দেখা গেল, ঐ কর্মসূচীর সাথে সম্পৃক্ত একজন ব্যাক্তি, মাওলানা ফজলুল হক আমিনী, তার একটি জলজ্যান্ত পুত্রসন্তান, নাম মাওলানা হাসনাত, হরতালের কয়েকদিন পরেই সে গায়েব হয়ে গেল কিন্তু সেই গণমাধ্যমগুলো এই প্রসঙ্গে কোন বিশ্লেষণের ধারই ধারছে না।’

এ মাসের ১০ তারিখ গত রোববার, ব্যবহার্য গাড়ি মেরামতের উদ্দেশ্যে আমিনীপুত্র মাওলানা হাসনাত দু’জন সহযোগীকে নিয়ে ধোলাইখালে যান। বেলা এগারোটার দিকে তারা টিপু সুলতান রোডে দিল্লী সুইটমিটস নামক দোকানে দাঁড়িয়ে হালকা খাবার খাচ্ছিলেন। এ সময়ে একটি মাইক্রোবাস দোকানের সামনে এসে থামলে তা থেকে অন্তত ছয়জন সশস্ত্র ব্যাক্তি নেমে এসে মাওলানা হাসনাতের কাছে নিজেদেরকে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোক বলে পরিচয় দেন এবং তাকে মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। এ সময়ে সঙ্গে থাকা দু’জন হাসনাতকে কোথায় ও কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনগুলো কেড়ে নেয়া হয় এবং সশস্ত্র ব্যাক্তিবর্গ মাইক্রোবাসে করে মাওলানা হাসনাতকে নিয়ে স্থানত্যাগ করেন।

ঘটনার ১২ দিন পর গত ২৩ এপ্রিল শনিবার মাওলানা হাসনাতকে রাজধানীর বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের পাশ থেকে হাত, মুখ ও চোখ বাঁধা ও অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। ভোরে ঐ অঞ্চলের স্থানীয়রা তাকে দেখে তার হাত, মুখ ও চোখ খুলে দিলে তিনি পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেন। উল্লেখ্য তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি অন্তর্ধানের মুহুর্ত থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছিল। মুক্ত হওয়ার পর নিজের ক্যাপ্টরদের সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট ভাবে কিছু জানাতে পারেননি, কেননা আটকের পর থেকেই তার চোখ বাঁধা ছিল। তবে ক্যাপ্টরদের সাথে তার কথাবার্তা হয়েছে। ক্যাপ্টররাই বলেছেন বেশি। বারবার বলা হয়েছে যেন তার বাবা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচী বর্জন করেন। আন্দোলন থেকে সরে না দাঁড়ালে মেরে ফেলার ভয়ও দেখানো হয়।

হাসনাত জানিয়েছেন তিনি নিশ্চিত তার ক্যাপ্টররা ছিল সরকারের কোন বাহিনীর লোক। এর পালটা বক্তব্যও আছে অবশ্য। হাসনাতের অন্তর্ধানের পর যখন তার পরিবার সহ বহু মানুষ ও সংগঠন দাবী করছিল অতীতের একাধিক ঘটনার মত হাসনাতকেও এই সরকারই আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে গুম করেছে, তখন ঢাকায় আইন-শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত একাধিক বাহিনীর কর্তাব্যাক্তিরা বিষয়টি মুহুর্মুহ অস্বীকার করেছেন।

বর্তমান সরকার দায়িত্ম গ্রহণের পর জলজ্যান্ত মানুষের গায়েব যাওয়ার ঘটনা এটা প্রথম তো নয়ই, এটা যে আসলে কততম ঘটনা তা নিরূপণ করা এই পরিস্থিতিতে বেশ কঠিন। তবে আলোচিত ঘটনাগুলোর মাঝে রয়েছে ঢাকার নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলার ও বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম অন্তর্ধান রহস্য। এই চৌধুরী আলমকে গত বছর বিএনপির ডাকা একটি হরতালের আগের দিন রাজধানীর বেইলী রোড থেকে একই ভাবে মাইক্রোবাস যোগে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তারও কোন খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি। সরকারের হাতে আটক বিএনপি নেতা সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরী জানান যে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে তারও চৌধুরী আলমের মত পরিণতি হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। ঐ জিজ্ঞাসাবাদে চৌধুরী আলমের পরিণতি সম্পর্কে তাকে জানানো হয়, হত্যার পর পেট কেটে নাড়িভুড়ি বের করে তাকে নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের পর সাক্ষাতকালে সালাহউদ্দীন তার আইনজীবি, সাংবাদিক ও আত্মীয়স্বজনদের এই তথ্য দেন।

আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার বিষয় বাঁছাবিচার প্রসঙ্গে যা বলছিলাম, জলজ্যান্ত এই মানুষগুলো উধাও হয়ে যাচ্ছে, আলোচিত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে তাদেরকে পাওয়াই যাচ্ছে না, অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত ঘটনাগুলোতে তাদেরকে পাওয়া যাচ্ছে তুরাগ নদীর পাড়ে বালিতে পোতা অবস্থায় কিংবা নারায়ণগঞ্জের কোন এক ডোবায় হাত পেছনে বাঁধা ও গলা কাটা অবস্থায় আর হাসনাতের মত কতিপয় অত্যন্ত সৌভাগ্যবানদের হাত, মুখ, চোখ বাঁধা অবস্থায় এখানে সেখানে ফেলে যাওয়া হচ্ছে, এই ঘটনাগুলো ঐ সংবাদমাধ্যমগুলোতে কর্মরতদের ছুঁয়ে যাচ্ছে না, তা হতে পারে না। সেসব সংবাদমাধ্যম, সেগুলোর রাজনৈতিক বিশ্বাস বা নীতিমালা যাই হোক না কেন, সেখানে তো আর নিশ্চয়ই কসাই ধরে এনে কলম মাইক্রোফোন হাতে ধরিয়ে বসিয়ে দেয়া হয় নি, অতএব যা ঘটছে সেগুলো তাদেরকে স্পর্শ করছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের জেনেও না জানা কারণে তারা সেগুলো নিয়ে কিছু বলছেন না, বা অন্যান্য অনেক কিছু বলে সেগুলো ধামাচাপা দিতে চাইছেন।

উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাঠক-দর্শক-অনুরাগী জুটিয়ে নেবার পর সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে জনমত গঠনে প্রভাব সৃষ্টি করার যে বহুলপ্রচলিত পদ্ধতিটি রয়েছে, সেই পদ্ধতিটি বহুলব্যবহারের ফলে দেশের গণমাধ্যম ও সাধারণ জনসাধারণের মাঝে খুব ধীরে হলেও একটি দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। যেভাবে সব চলছে, তাতে এই দূরত্ব কমবে না, বরং বাড়তে থাকবে।

সংবাদমাধ্যমের কর্তাব্যাক্তিরা নিজেদের ব্যাক্তিগত মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস বা দর্শনের প্রভাব বজায় রাখুন, তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু চারপাশে যা ঘটছে, সেগুলো তুলে ধরার ব্যাপারেও যদি রাজনৈতিক দর্শনের প্রয়োগ করে কোন ঘটনার প্রচারকে অতিরঞ্জন আবার কোন ঘটনার প্রচারকে বিবর্জন করা হয়, তাহলে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা যে ক্ষতির শিকার হবে, তা আখেরে গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর আঘাত হানবার পথকে সুগম করতে পারে।

প্রবন্ধটি ৪ নভেম্বার, ২০১০ তারিখে দৈনিক আমার দেশ-এ এবং একই দিনে বাংলাদেশ ফার্স্ট ওয়েব ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।

 

শওকত মাহমুদ ও মুহম্মদ তাওসিফ সালাম

 

এই সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ক্যাথলিক খ্রীস্টানদের ধর্মগুরু পোপ বেনেডিক্ট ব্রিটেন কাঁপানো সফরে গিয়েছিলেন। তখন কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির মধ্যে ধর্মবিশ্বাস নিয়ে বিতর্কটা ভালই জমে উঠেছিল। রক্ষণশীল দলের চেয়ারপার্সন পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত এমপি লেডি ওয়ারসি শ্রমিক দলের ধর্মনিরপেক্ষতা তথা ধর্মহীনতার নীতিকে তুলোধুনো করে বলেছিলেন (১৫ সেপ্টেম্বর অক্সফোর্ডে ইংল্যান্ডের ধর্মাযাজকের সম্মেলনে):

 

They were too suspicious for faith’s potential for contributing to society- behind every faith-based charity… the fact is that our world is more religious than ever. Faith is here to stay. It is part of human experience.

লেডি ওয়ারসির এই মন্তব্যকে টেনে আনার কারণ হল, পরের মাস অক্টোবারে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের নির্বাচনে মৌলবাদের জিগির তুলে লুৎফুর রহমানকে মনোনয়ন না দিয়ে লেবার পার্টি বিরাট ভুল করে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে লুৎফুর রহমান অবিস্মরণীয় বিজয় ছিনিয়ে আনেন। যেমনি করে রেসপেক্ট পার্টির জর্জ গ্যালওয়ে ইরাক যুদ্ধের প্রতিবাদ করে ইস্ট লন্ডনে লেবারকে হটিয়ে ঐতিহাসিক বিজয় এনেছিলেন।

 

এবারই প্রথম এই কাউন্সিলে সরাসরি ভোটে বিপুল নির্বাহী ক্ষমতাসম্পন্ন মেয়রের ভোট হল। এই কাউন্সিলে শ্বেতাঙ্গদের পাশাপাশি বহু এশীয়রা থাকে, যাদের মধ্যে বাংলাদেশিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। পূর্ব লন্ডনের এই কাউন্সিল বরাবরই লেবারদের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি। এখানে প্রায় সব দল-মতের ইমিগ্র্যান্টরা লেবারকে সমর্থন করে মূলত দলটির প্রো-ইমিগ্রেশান ও সামাজিক সুরক্ষা নীতির জন্য। আওয়ামী লীগ ঘরানার লোকজন এতদিন লেবার পার্টিতে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল যার দ্বিতীয় পতন হল লুৎফুরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। স্থানীয় বাংলাদেশি এমপি রুশনারা আলীও প্রচন্ড রাজনৈতিক ঝাঁকুনি খেলেন লুৎফুরের বিরোধিতা করে। লেবারের আচরণে বাংলাদেশিরা প্রচণ্ড ক্ষুদ্ধ হয়ে প্রতিবাদী ভোট দিয়ে লুৎফুরকে এমন কর্তৃত্বে বসিয়েছে যে, ২০১২ সালে এই এলাকায় তাঁর হাত দিয়েই বসবে অলিম্পিকের জমজমাট আসর।

 

বিলাতের বাংলাভাষীদের বড় একটা অংশের সন্দেহ, মনোনয়ন নিয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটিকে দ্বিধাভিবক্ত করে এর ফাঁকে কোন শ্বেতাঙ্গকে এই প্রাণবন্ত কাউন্সিলের মাথায় বসানোর কোন চক্রান্ত থেকে থাকলে বাংলাদেশিরা তাকে উল্টে দিয়েছে। এও সত্য যে, লুৎফুরকে লেবার দলের ক্ষুদ্ধ এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমর্থকেরাও ভোট দিয়েছে। বৃহত্তর লন্ডনের সাবেক মেয়র এবং আগামী নির্বাচনে লেবারের মেয়র প্রার্থী কেনেথ লিভিংস্টোন লুৎফুরের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন।

 

লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে সরাসরি ভোটে মেয়র নির্বাচনে লেবার পার্টির যাত্রা যে গণতন্ত্রের মুন্ডুপাত দিয়ে শুরু হয়েছে, তাতে সম্ভবত সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। কোন নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক প্রস্তুতির মৌলিক দিকগুলো কী কী, তা বুঝতে উচ্চভুরু রাজনৈতিক বিশ্লেষক হওয়ার দরকার হয় না। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট এলাকার নেতাকর্মীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের প্রতিফলন ঘটছে, এটা নিশ্চিত করাই হচ্ছে গণতন্ত্রভিত্তিক নির্বাচনী প্রস্তুতি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে টাওয়ার হ্যামলেটসের সদ্যসমাপ্ত মেয়র নির্বাচনে লেবার পার্টির আসল লড়াইটা হয়েছে গণতন্ত্রের সাথে। দলটির স্থানীয় প্রতিনিধিরা যে লুৎফুর রহমানকে প্রার্থীতার জন্য মনোনীত করেছিলেন, সে লুৎফুর রহমানকে মনোয়ন না দিয়ে লেবার পার্টি প্রাথমিক ভাবে গণতন্ত্রের উপর চড়াও হয়েছিল। আখেরে গণতন্ত্রই লেবার পার্টির উপর চড়াও হয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসে যে ঘটনার জন্ম দিল, তা অবশ্যই লেবার পার্টির প্রতি গণতন্ত্রের একটি স্মরণীয় চপেটাঘাত, যার কালসিঁটে দলটিকে অনেক কাল ধরে বয়ে বেড়াতে হতে পারে। নির্বাচনী ফলাফল সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, এলাকাটিতে লেবারের এই বিপর্যয় ২০০৫ সালে ব্যাক্তি জর্জ গ্যালওয়ের কাছে দল লেবারের পরাজয়ের চেয়েও বেশি মারাত্মক।

 

লেবারের টিকেট নিয়ে পরপর দুইবার সরাসরি ভোটে কাউন্সিলার নির্বাচিত হওয়া লুৎফুর রহমানকে টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়র নির্বাচনের জন্য মনোয়ন দিয়েও অতি ঠুনকো কারণ দেখিয়ে সেই মনোয়ন কেড়ে নেয় লেবার পার্টি। এই কেড়ে নেয়ার পেছনে কারণ হিসেবে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটি (এনইসি)-র কাছে লুৎফুর রহমান প্রসঙ্গে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত অপর লেবার নেতা ও আওয়ামী লীগ সমর্থক হেলাল উদ্দীন আব্বাসের মিথ্যা বিষোদগারকেই দায়ী করা হয়। লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেলে বিশাল ইস্ট লন্ডন মসজিদকে কেন্দ্র করে যে পরিচালনা,তাতে ধর্মপ্রাণ লুৎফুর রহমান সংশ্লিষ্ট ছিলেন। মক্কার হেরেম শরীফের ইমাম আব্দুর রহমান আস-সুদাইসকে যেখানে দাওয়াত দিয়ে আবার পেছনে লুৎফুর সক্রিয় ছিলেন, ইমাম সাহেবের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন, লুৎফুর উগ্রবাদী মুসলিমদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে ইত্যাকার অভিযোগ করে লেবার পার্টির নেতৃত্বের একাংশকে বিভ্রান্ত করেন স্থানীয় মূল ধারার আওয়ামী লীগাররা, যাদের মাঝে কলামিস্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরীও ছিলেন। এতে পূর্ব লন্ডনের ব্যাপক মানুষ প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিল, “পোপ লন্ডনে এলে মৌলবাদ হয় না, কাবা শরীফের ইমামকে আনলে মৌলবাদ কেন হবে?” এই প্রতিবাদ জানানো মানুষদের মধ্যে সচেতন ধর্মপ্রাণ আওয়ামী লীগরারও রয়েছেন। অমূলক ঐ অভিযোগের ভিত্তিতে লুৎফুর রহমানের মনোনয়ন কেড়ে নেয়াই সার নয়, তার পরিবর্তে দল ঐ হেলাল উদ্দীন আব্বাসকেই মনোয়ন দেয়, যার পক্ষে প্রচারণায় সক্রিয় ভাবে অংশ নিয়েছেন লেবার নেত্রী ও সদ্য নির্বাচিত হাউজ অব কমনস সদস্য রুশনারা আলী এমপি। অথচ চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবার পর ১৪ সেপ্টেম্বারে লুৎফুর যখন আনুষ্ঠানিক ভাবে তার ক্যাম্পেইন উদ্বোধন করেন তখন রুশনারা আলী সেখানে যাননি। বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রায় সবার চোখেই এটা দৃষ্টিকটু ঠেকেছে।

 

http://firstcache.files.wordpress.com/2010/11/rushanara-ali-and-helal-uddin-abbas-600px.jpg

রুশনারা আলী এবং হেলাল উদ্দীন আব্বাস

 

লেবার পার্টির নেতা নির্বাচনে রুশনারা ডেভিড মিলিব্যান্ডকে সমর্থন করেছিলেন। ইস্ট লন্ডনে এনে ডেভিড মিলিব্যান্ডকে হাইলাইটও করা হয়েছে। যার ফলে ছোট ভাই এড মিলিব্যান্ডের কাছে তাঁর পরাজয়ের ঘটনাটি ছিল রুশনারার জন্য এক বড় আঘাত। অবশ্য আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার মেয়ে কাউন্সিলার টিউলিপ সিদ্দিকি এসব ঘটনা থেকে নিজের ইমেজকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তবে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের জন্য লুৎফুরের এই বিজয়ই শুধু নয়, দুর্নীতির অভিযোগে তাদের সমর্থক লর্ড সভার বাংলাদেশি সদস্য ব্যারনেস পলা মঞ্জিলা উদ্দীনের লর্ডশীপের দীর্ঘমেয়াদী সাসপেনশানও আরেক চপেটাঘাত। ব্যারনেস পলা মঞ্জিলা উদ্দীন বাংলাদেশ নিয়ে এক সেমিনারে গত জুলাই মাসে আওয়ামী লীগের প্রতি নগ্ন পক্ষপাত দেখিয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে সমালোচিত হয়েছিলেন।

 

কিন্তু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে টাওয়ার হ্যামলেটসের অধিবাসীগণ দলীয় ইমেজকে নয়, ব্যাক্তি ইমেজকে গুরুত্ব দিয়েছেন, ধর্মের প্রশ্নে কাউকে অপবাদ দেওয়ার প্রতিবাদ করেছেন। সংখ্যার হিসাব তাই বলছে। দলীয় পরিচয়বিহীন প্রার্থী লুৎফুর রহমান পেয়েছেন অর্ধেকেরও বেশি ভোট। আর দলীয় ইমেজের বন্দনাকারী লেবার প্রার্থী হেলাল উদ্দীন আব্বাস পেয়েছেন এক চতুর্থাংশ ভোট। তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা লুৎফুর রহমানের প্রাপ্ত ভোটের অর্ধেকেরও কম। বাকি এক চতুর্থাংশ ভোট ভাগাভাগি করেছেন টরি, গ্রিন আর লিবারাল ডেমোক্রেট প্রার্থীগণ। ২০০৫ সালে বেথনাল গ্রিন এবং বো আসনে জর্জ গ্যালওয়ের কাছে উনা কিং-এর পরাজয়, যার মধ্য দিয়ে স্থানীয় লেবারের মূলধারায় শোকের মাতম পড়ে গিয়েছিল, সেই পরাজয়ও কিন্তু এত মারাত্মক ছিল না, গ্যালওয়ে মাত্র ৮২৩ ভোটে জিতেছিলেন। লুৎফুর সেটিকে ছাপিয়ে চলে গেছেন বহুদূর। বাংলাদেশি হিসেবে সুবিধা পেয়েছেন তাই বা বলি কী করে। ১২ হাজারেরও বেশি ভোটে যে লেবার প্রার্থীকে তিনি হারিয়েছেন, তিনি হচ্ছেন অপর বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত ও আওয়ামী লীগ সসমর্থক হেলাল উদ্দীন আব্বাস।

 

 

‘শেক্সপিয়ারীয়’ নির্বাচনের নেপথ্যে…

 

স্থানীয় লেবার পার্টির একটি অংশ যে লুৎফুর রহমানকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে খুবই আগ্রহী, তা প্রথম বোঝা গিয়েছিল আগস্ট মাসে, সম্ভাব্য মনোয়ন-প্রত্যাশীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে দুই বার লুৎফুর রহমানের নাম বাদ দেয়ার মধ্য দিয়ে। লুৎফুর রহমান বিষয়টি হাইকোর্টে নিয়ে গেলে সেখান থেকে তার নাম সংযোজন করার নির্দেশ দিয়ে রায় দেয়া হয় এবং লুৎফুর রহমান সংক্ষিপ্ত তালিকায় তার অবস্থান ফিরে পান। কিন্তু এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে টাওয়ার হ্যামলেটসে ইতিহাসের প্রথম সরাসরি মেয়র নির্বাচনে লুৎফুর রহমানের যাত্রা সহজ হবে না, কেননা তার শত্রুরা অবস্থান করছিল তা নিজ (বর্তমানে প্রাক্তন) দলের মধ্যেই।

 

সংক্ষিপ্ত তালিকার ৭ জনের মধ্য থেকে একজনকে নির্বাচিত করার লক্ষ্যে ৪ সেপ্টেম্বার, ২০১০ তারিখে দলের টাওয়ার হ্যামলেটস কার্যালয়ে সর্বোচ্চ ৮৬৮ জন এবং সর্বনিম্ন ৮৪১ জন প্রতিনিধি পাঁচ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত এক ভোটাভুটিতে অংশ নেন। পূর্বে সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে বাদ পড়া লুৎফুর রহমান প্রাথমিক পর্যায়ের এই ভোটাভুটিতে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন। নীচের ছকটিতে এই ভোটাভুটির তথ্য দেয়া আছে:

 

http://firstcache.files.wordpress.com/2010/11/tower-hamlets-labour-primary.jpg

সূত্রঃ LabourBriefing.org.uk

 

মাঠপর্যায়ের এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল লেবার নেতা কেনেথ ক্লার্কের তত্ত্বাবধানে। ৬ সেপ্টেম্বারে এই কেনেথ ক্লার্কই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন এবং উপস্থিত শতশত লেবার কর্মী ও সংবাদকর্মীর সামনে লুৎফুর রহমানকে টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়র নির্বাচনের লেবার প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন।

 

১৪ সেপ্টেম্বার তারিখে এই কার্যালয়েই লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিক ভাবে লুৎফুর রহমানের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়। লেবার নেতা জেমস ফিটজপ্যাট্রিক এমপি এক ভিডিও অ্যাড্রেসের মাধ্যমে লুৎফুর রহমানের প্রতি তার সমর্থনের কথা জানান এবং উপস্থিত সমর্থকদের নিশ্চিত করেন যে লুৎফুর রহমানই হবেন টাওয়ার হ্যামলেটসের সর্বোত্তম মেয়র। পরে অবশ্য এই জেমস ফ্রিটজপ্যাট্রিকের পরিচয় বদলে যায়।

 

মাঠ পর্যায়ের ভোটে ভরাডুবির শিকার এবং অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী হেলাল উদ্দীন আব্বাস ২০ সেপ্টেম্বারে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটি (এনইসি)-র কাছে ৯ পৃষ্ঠাবিশিষ্ট একটি অভিযোগপত্র পেশ করেন। পত্রে আব্বাস লুৎফুরের বিরুদ্ধে অনিয়ম, কথিত ইসলামী উগ্রবাদীদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন, অনুগত রাজনৈতিক কর্মীদের পদ প্রদান ও নিয়মবহির্ভূত রাজনৈতিক আচরণের অভিযোগ আনেন।

 

এক্ষেত্রে উগ্রবাদীদের সমর্থন প্রসঙ্গে আনীত অভিযোগের বিষয়টি বিশ্লেষণ না করে পারছি না। হেলাল আব্বাসের এই বিশেষ অভিযোগের ভিত্তি প্রসঙ্গে জানলে সব পাঠকই আশ্চর্য যে হবেন এমনটা হলফ করে বলতে পারি না। কেননা বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার চলমান হুজুগে হেলাল আব্বাসের সাথে একাত্মতা ঘোষণাকারীও জুটে যাবেন কিছু, সন্দেহ নেই। তবে আমরা লজ্জাবোধ করছি এটা জেনে যে, লুৎফুর রহমানকে উগ্রপন্থী আখ্যা দেয়ার পেছনে হেলাল আব্বাসের তুলে ধরা প্রধান একটি যুক্তি ছিল মক্কা শরীফ (মসজিদে হারাম)-এর ইমাম শেখ আব্দুর রহমান আস-সুদাইসের সাথে লুৎফুরের সম্পর্ক ও সাক্ষ্যাতের বিষয়টি!

 

ক্রিশ্চানদের নেতা পোপের সাথে বারংবার সাক্ষ্যাৎ করা রাষ্ট্রনায়কগণ কেন উগ্রপন্থী নন এবং কেন মসজিদে হারামের ইমামের সাথে সাক্ষ্যাৎ করার অপরাধে লুৎফুর রহমান উগ্রপন্থী, এই প্রশ্নটি হেলাল আব্বাসকে করার সুযোগ এখনও আমাদের হয়নি। বাড়িতে নামাজ শিক্ষা, ইসলামী ইতিহাস, হাদিস শরীফ ইত্যাদি বিষয়ের উপর বই রাখলেও মিডিয়া কোন বিলম্ব না করে ইসলামী উগ্রপন্থী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দিবে, ইদানিং তাই দিচ্ছে, হয়তো এই বিশ্বাস থেকেই হেলাল আব্বাসরা এনইসির কাছে লুৎফুর রহমানের ‘উগ্রপন্থী’ পরিচয়টি ফলাও করে প্রচার করেছিলেন।

 

শুধুমাত্র হেলাল আব্বাসের ঐ অভিযোগের ভিত্তিতেই ২১ সেপ্টেম্বারে লেবার পার্টির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক এই এনইসি মাঠপর্যায় থেকে নিরংকুশ বিজয়লাভ করা লুৎফুর রহমানের মনোনয়ন বাতিল করে দেয়। ব্যাখ্যা স্বরূপ লেবার পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়, “মনোনয়ন-নির্ধারণী প্রাথমিক ভোটে অংশ নেয়া দলীয় প্রতিনিধিগণের যোগ্যতা এবং প্রার্থী হিসেবে লুৎফুর রহমানের আচরণ, উভয় প্রসঙ্গেই প্রাপ্ত কিছু মারাত্মক অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়গুলোর তদন্তের জন্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে… প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যেহেতু লেবার প্রার্থী হিসেবে লুৎফুর রহমানের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে, এই পরস্থিতিতে নির্বাচনের জন্য অপর একজন মনোনয়ন প্রত্যাশীকে লেবার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া ছাড়া এনইসির আর কোন উপায় নেই।”

 

হেলাল আব্বাসের অভিযোগ, তার সূত্র ধরে লুৎফুর রহমানের প্রার্থীতা বাতিল ইত্যাদি বিষয়ে এনইসি সংক্রান্ত তথ্যাবলী লেবার পার্টি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ওয়েবসাইট লেবারব্রিফিং (LabourBriefing.org.uk) থেকে জানা যায়। ওয়েবসাইটটিতে প্রকাশ করা হয়, যে বিশেষ অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়ে এনইসি লুৎফুর রহমানের প্রার্থীতা বাতিল করেছে, তার লেখক হচ্ছেন হেলাল উদ্দীন আব্বাস। লেবারব্রিফিং জানাচ্ছে, অভিযোগকারীর অভিযোগ শুধু আমলেই নেয়া হয়নি, সেই অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যাক্তিকে নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করার কোন সুযোগ দেয়া হয় নি, বরং তার সাথে অভিযোগকারীর রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়টি জেনেও অভিযোগকারীকে উদ্ভুত পরিস্থিতি থেকে সুবিধা গ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। লেবারব্রিফিং এক পর্যায়ে এনইসির ঐ বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মৃদু সমালোচনা করে উল্লেখ করেছে, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে হয়তো এটা প্রতিষ্ঠা পেল যে প্রাথমিক ভোটাভুটিতে নির্বাচিত ব্যাক্তির বিরুদ্ধে কোন প্রকারের অভিযোগ আনতে পারলেই দ্বিতীয় এমনকি তৃতীয়স্থানের অধিকারীরাও তাকে সরিয়ে নিজেরা মনোয়ন পেতে পারেন।

 

লেবার পার্টির প্রার্থী মনোনয়নে এই সমস্ত নাটকীয়তা দেখে প্রতিপক্ষ টরি প্রার্থী নিল কিং নির্বাচনটিকে এক ‘শেক্সপিয়ারীয় নির্বাচন’ (Shakespearean Election) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। নাটকের কিন্তু এখানেই শেষ নয়।

 

লুৎফুরকে অপসারণের পেছনে এনইসি প্রদর্শিত যুক্তি যে সম্পুর্ণ অগ্রহণযোগ্য ছিল তা নির্বাচনের মাধ্যমে পরে চূড়ান্তরূপে প্রমাণিত হলেও, তাৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়ায়ও সেখানকার রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ এনইসির ঐ সিদ্ধান্তের মুন্ডুপাত করেন। লুৎফুর রহমানের বিরুদ্ধে হেলাল আব্বাসের আনা এবং এনইসির মেনে নেওয়া অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা, কোন বিশ্লেষকই সেই বিতর্কের ধার মাড়াননি। তাদের প্রত্যাখ্যানের পেছনে মূলত যুক্তি ছিল এই যে, লুৎফুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ একান্তই গুরুতর হলে এনইসি তাকে তলব করে তার ব্যাখ্যা চাইতে পারত। তা না করে তারা তাদের এমন একজন সদস্যের অভিযোগকে আমলে নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে সদস্য মাঠপর্যায়ের ভোটাভুটিতে পাঁচটি রাউন্ডের চারটিতেই শতকরা ১৫ ভাগেরও কম এবং শেষবার ২০ ভাগেরও কম ভোট পেয়েছেন এবং একবারের জন্যও প্রথম তো সুদূর পরাহত, দ্বিতীয় স্থানটিও অধিকার করার যোগ্যতা জুগিয়ে উঠতে পারেন নি। সবচেয়ে বড় কথা, এই ব্যাক্তি টাওয়ার হ্যামলেটসে লেবার পার্টির মাঠপর্যায়ের ভোটাভুটিতে লুৎফুর রহমানের পরাজিত প্রতিযোগী। পরে লুৎফুরকে অপসারণ করে এই হেলাল আব্বাসকেই লেবার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়ে এনইসি তাদের নীতিবিসর্জনের ষোলকলা পূর্ণ করে। শুধু তাই নয়, ২৬ সেপ্টেম্বারে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার প্রাসাদে লেবার নেতৃবৃন্দ মিলিত হয়ে লুৎফুর রহমানসহ তার সমর্থক লেবার নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেন। বহিষ্কৃত বাংলাদেশি নেতৃবৃন্দের মাঝে আটজনই ছিলেন সরাসরি ভোটে নির্বাচিত কাউন্সিলার। তারা হলেন অহিদ আহমেদ, ওলিউর রহমান, লুতফা বেগম, রানিয়া খান, আমিনুর খান, রাবিনা খান, সেলিনা খাতুন এবং আলিবর রহমান।

 

 

 

২৬ সেপ্টেম্বারে ওয়েস্টমিনস্টার প্রাসাদে অনুষ্ঠিত লেবার নেতৃবৃন্দের এই বৈঠকটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বিশেষ একটি এলাকায় দলের আভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে আলোচনার স্থান হিসেবে ওয়েস্টমিনস্টারকে বেছে নেয়ার মধ্য দিয়ে মধ্য দিয়ে একাধিক লেবার এমপির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে এই বিশ্লষকরা মনে করেন। এদের মাঝে প্রবীণ লেবার নেতা, সাবেক কাউন্সিলার এবং বর্তমানে সক্রিয় রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকার পিটার কেনিয়ন মত দিয়েছেন, লুৎফুর রহমানকে বহিষ্কারের মূল ভিত্তি ঐ অভিযোগগুলোর জবাব দেয়ার কোন সুযোগ তো লুৎফুরকে দেওয়া হয়ইনি, উপরন্তু তাকে সহ তার সমর্থকদের হেনস্থা করতে ওয়েস্টমিনস্টারে বৈঠক করে দুইজন লেবার এমপি তাদের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এই দুইজন লেবার এমপি হচ্ছেন রুশনারা আলী এবং জেমস ফিটজপ্যাট্রিক। পিটার কেনিয়ন তার ব্লগে সরাসরি লিখেছেন, ওয়েস্টমিনস্টারে বৈঠক করতে চাইলে হলরুমের বুকিং কেবল এমপিরাই করতে পারেন। এক্ষেত্রে এই দুই এমপির কোন একজন বা উভয়ই ওয়েস্টমিনস্টারের ঐ বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন, যার মধ্য দিয়ে তারা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।

 

উল্লেখ্য, এই জেমস ফিটজপ্যাট্রিকই কিন্তু ১৪ সেপ্টেম্বারে ঘোষণা করেছিলেন যে লুৎফুরই হতে পারেন টাওয়ার হ্যামলেটসের সর্বোত্তম মেয়র। কিন্তু স্থানীয় আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিবিদদের সৃষ্ট বিভ্রান্তির ফলে টাওয়ার হ্যামলেটসকে নিয়ে লেবার পার্টিতে যে ক্ষমতার খেলা চলছিল, তার জের ধরে লুৎফুরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন হাউজ অব কমন্সের এই সদস্য। লুৎফুর রহমানের মনোনয়ন বাতিলসহ তাকে ও তার সমর্থক কাউন্সিলারদের দল থেকে বহিষ্কারের অগণতান্ত্রিক সব সিদ্ধান্ত ছিল ক্ষমতার এই খেলারই ফলাফল। এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে লন্ডনের সাবেক মেয়র কেনেথ লিভিংস্টোন, যিনি ২০১২ সালে অনুষ্ঠিতব্য লন্ডনের মেয়র নির্বাচনে লেবারের একজন সম্ভাব্য প্রার্থী, বলেছেন যে এড মিলিব্যান্ডের মত একজন দলনেতা সেসময়ে উপস্থিত থাকলে লেবার পার্টির এনইসি কখনওই এসব অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের জন্মস্থান হত না। উল্লেখ্য, বড় ভাই ও সাবেক মন্ত্রী ডেভিড মিলিব্যান্ডের বিরুদ্ধে লড়ে লেবার পার্টির নেতা নির্বাচিত হন এড মিলিব্যান্ড এবং রুশনারা আলী ঐ নির্বাচনে ডেভিড মিলিব্যান্ডের প্রতি প্রত্যক্ষ সমর্থন জানিয়েছিলেন। টাওয়ার হ্যামলেটসে মনোনয়ন সংক্রান্ত সেসব ঘটনা লেবার নেতা নির্বাচনের কয়েকটি মাত্র দিন আগের ঘটনা।

 

http://firstcache.files.wordpress.com/2010/11/tower-hamlets-election-results.jpg

 

টাওয়ার হ্যামলেটসে বাংলাদেশি কমিউনিটির ঐক্যের মাঝে ফাটল ধরিয়ে নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক অভিলাষ পুরণ করতে যারা তৎপর ছিলেন, তাদের প্রতি টাওয়ার হ্যামলেটস অধিবাসীদের জবাব উপরের ছকটিতে ফুটে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সামাজিক কাঠামো জাহান্নামে যায় যাক, ক্ষমতা কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না বা যেকোন মূল্যে প্রতিপক্ষের জিত ঠেকাতে হবে, এই মনোভাব থেকে সেই বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীটি সুদূর টাওয়ার হ্যামলেটসে লেবার পার্টির ছত্রচ্ছায়ায় থেকেও যে পরিত্যাগ করতে পারেনি, লুৎফুরের নির্বাচনী যাত্রার প্রতিটি স্তরে রয়েছে তার প্রমাণ। তবে, তাদের প্রতি ভাগ্যের পরিহাসই হবে হয়তো, এই একই নির্বাচনের ফলাফল আবার এটাও প্রমাণ করে দিয়েছে যে মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে মৌলবাদ হিসেবে চিহ্নিত করে রাজনৈতিক ফায়দার অন্বেষণকারীরা সর্বত্রই সাধারণ মানুষদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হবে।

http://shatil.files.wordpress.com/2010/09/chhatro-league-atrocities-prime-minister-and-2-ministers.jpg

(উপরে) বরিশাল পলিটেকনিক ইন্সটিউটে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। (নীচে) ৩১ আগস্ট, ২০১০ তারিখে জাতীয় শোক দিবস প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভার শেষ দিনে ছাত্রলীগের প্রতি সীমাহীন বিরক্তি প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। (ইনসেট) পাট মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি ও পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন

ছাত্রলীগের কার্যকলাপে প্রধানমন্ত্রীর বিরক্তি খুব স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পেল গতকাল ৩১ আগস্ট, ২০১০ তারিখে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত জাতীয় শোক দিবস বিষয়ক আলোচনায়। বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি মূলত ছাত্রলীগের উদ্দেশ্যে ও এই প্রসঙ্গে যা যা বললেন,

কোন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত হলে আইনমাফিক তার শাস্তি পেতে হবে।

সংগঠনে ছাত্রদল ও শিবিরের লোকজনদের ঢুকতে দেয়া যাবে না।

শৃংখলা ভঙ্গকারীদের বহিষ্কার করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আরও বহিষ্কার করা হবে, আইনভঙ্গকারীকে কোন ছাড় দেয়া হবে না।

একটি স্বল্পশিক্ষিত নেতৃত্ব জাতিকে ভালো কিছু এনে দিতে পারবে না দেশবাসীর সে অভিজ্ঞতা হয়েছ। অতএব পড়াশুনায় আরও বেশি মনযোগী হতে হবে।

ছাত্ররাজনীতিতে বিলাসিতার কোন স্থান নেই। ছাত্ররাজনীতি করতে হলে তা করতে হবে মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্য নিয়ে।

আদর্শবিবর্জিত রাজনীতি কোন ভাল ফল বয়ে আনতে পারবে না।

ছাত্রলীগের কেউ অপরাধ করলে তাকে ছাড় দেয়া হবে না, প্রধানমন্ত্রী এই বিশেষ সতর্কবার্তাটির উপর বিশষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। কথা হচ্ছে, এই ছাড় না দেয়ার ব্যাপারটি কি ওনার এই বক্তব্যের সময় থেকে বলবত হল, অর্থাৎ এর আগে কি ছাড় দেয়া হচ্ছিল কি না, সে ব্যাপারে দেশের মানুষ নিশ্চিত ভাবে কিছু বলতে পারে না। কারন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের হল দখলের সময় ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেন নিহত হওয়ার পর প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া, আর এফ. রহমান হল দখলে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আবু বকর সিদ্দিকি নিহত হওয়ার পর প্রশাসনের প্রতিক্রিয়ার তফাত ছিল খুবই দৃষ্টিকটু ভাবে বেশি। যাই হোক, সেই বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে আমরা বরং ছাত্রলীগের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বিরক্তি ও সতর্কবার্তার উৎকৃষ্টতা অন্বেষণ করি, কিছুটা আশ্বস্ত বোধ করি।

এটা মোটামুটি হলফ করে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল যেভাবে ছাত্রলীগকে সতর্ক করেছেন, আমাদের দেশের আর কোন প্রধানমন্ত্রীকে এর আগে নিজের দলের কোন অঙ্গসংগঠনের প্রসঙ্গে কখনও এ ধরণের অবস্থান নিতে হয় নি। এর আগেও ২০০৯ সালে ছাত্রলীগের অভূতপূর্ব অবাধ্যতা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বার পর তার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক প্রধান-এর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এ ধরণের ঘটনাও সম্ভবত দেশের প্রধান কোন রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে ঘটেনি। ছাত্রলীগকে তবুও কেউ দমতে দেখেনি। অব্যাহত থেকেছে দোতলা-তিনতলা থেকে ছুঁড়ে ফেলা, নসরুল্লাহ্‌ ও আবু বকর সিদ্দিকিরা কেউ ভাঙ্গা মেরুদন্ড নিয়ে বা কেউ মাথার পেছনে দেড় ইঞ্চি ব্যাসের ছিদ্র নিয়ে আমাদের ছেড়ে না ফেরার জগতে চলে গেছে।

আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার প্রতি আশা করি দেশের কিয়দাংশ মানুষেরই এই বিশ্বাসটা আছে যে, তিনি যদি সত্যিই চান ছাত্রলীগের রাশ টেনে ধরে যাবতীয় অপকর্ম সাধন থেকে থামাতে, তিনি পারবেন। সেক্ষেত্রে তিনি হয়তো ইতমধ্যেই উপলব্ধি করেছেন যে ছাত্রলীগের মূল্যবোধ সংস্কারের যে প্রক্রিয়াটি এখন একটি অবশ্যকরণীয়, সে প্রক্রিয়াটি সফল করতে হলে ওনাকে ছাত্রলীগের বাইরে এসে মূল সংগঠনটিতেও কিছুটা সময় দিতে হবে, বিশেষ করে তার মন্ত্রীসভায়।

আরেকটু আলোকপাত করি।

অবশ্য বেশি আলোকপাত করার দরকার হবে না। দুটি ইউটিউব ভিডিও এখানে এমবেড করা আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেই দুজনকে তার পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ম দিয়েছিলেন, ভিডিও দুটিতে সেই দুইজন আওয়ামী লীগ নেতাকে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে। আলোকপাত যা করার তারাই করবেন।

আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি

নীচের ভিডিও ক্লিপটি একুশে সংবাদের একটি ফুটেজ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জাতীয় উন্নয়ন বিরোধী কর্মকান্ড শীর্ষক একটি আলোচনায় বক্তব্য রেখেছিলেন পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি। তার এই বক্তব্যটি ইতমধ্যেই ইন্টারনেটে যথেষ্ট প্রচার পেয়েছে, যেখানে তিনি সাংবাদিক ও আইনজীবিদের উদ্দেশ্য করে বেশ কিছু অশ্লীল ও লেখার অযোগ্য মন্তব্য করেছেন। সেগুলো আপনারা ভিডিওটিতেই দেখে নিবেন। এখানে শুধু ছাত্রলীগের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক অংশটুকু লিখছি। নীচের কথাগুলো আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি বলেছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে,

“কোরআন তেলাওয়াত করে সাপের ছোবল থেকে বাঁচা যাবে না। ওর জন্য যা দরকার তাই করতে হবে। নিজেরা নিজেরা মারামারি কর, অদের দুই চাইরটার সাথে মারামারি কর না ক্যান?”

রমেশ চন্দ্র সেন

নীচের ক্লিপটিতে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনকে। গত ১২ মে, ২০১০ তারিখে ঠাকুরগাঁও জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল জেলার শিল্পকলা অ্যাকাডেমি মিলনায়তনে। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিয়ে রমেশ চন্দ্র সেন নীচের বক্তব্যটি এন। লতিফ সিদ্দিকির পুরো বক্তব্যের একটা অংশ ছাত্রলীগের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হলেও, রমেশ সেনের প্রায় পুরো বক্তব্যটাই প্রাসঙ্গিক। ঠাকুরগাঁও জেলার ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন,

“নিয়োগ… এই সবগুলি আমাদের, একআধটা হয়তো স্লিপ হইতে পারে, জানি না ঠিক, ভুলক্রমে, কিন্তু আমাদের। পুলিশের চাকরিতেও তেমনি আমরা দিয়েছি, চেষ্টা করেছি আমাদের ছেলেদের দেওয়ার। আরও, এই যে এই ২০ তারিখে (২০ মে, ২০১০) পুলিশের চাকরির নিয়োগ হবে, অবশ্যই আমরা আমাদের নিজেদের ছেলেদের দেওয়ার ব্যবস্থা করব। তাছাড়া এই সামনে, এই ১৮ তারিখ থেকে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ হবে, আবার হেডমাস্টার নিয়োগ হবে। এ ব্যাপারে আমরা তথ্য নিচ্ছি। এই তথ্যগুলো নেয়ার পরে, অবশ্যই, আমরা আমাদের ছেলেদের প্রাধান্য দিয়ে কাজ করব।”

আমার এই লেখা ইহজগতে কখনও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গোচরে আসবে কিনা জানিনা, তাও বলি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি ছাত্রলীগকে নিয়ে যত ভাল পরিকল্পনাই করুন না কেন, আপনার সেই পরিকল্পনাগুলো ভেস্তে দেয়ার জন্য আপনার ভাষ্যমতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির যতটা ভূমিকা রাখতে পারত, তার চেয়ে বহু গুণে বেশি ভূমিকা ইতমধ্যেই রেখে ফেলেছেন আপনারই দলের দুজন শীর্ষ নেতা, যাদের উপরের আপনার ভরসা শুধু দলভিত্তিক নয়, এদের উপর ভরসা করে আপনি এদেরকে দুটো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ম দিয়েছেন।

এদের একজন আপনার অনুগত ছাত্রদের বলছে অন্য দলের ছেলেদের সাথে মারপিট করতে, আরেকজন বলছে তারা যাই করুক না করুক না কেন সরকারি সব চাকরি তাদের জন্য রেখে দেওয়া হচ্ছে।

রাজনীতি ও অপরাধ নিয়ে নির্মিত সিনেমা নাটকগুলোতে আমরা দেখি খল চরিত্রগুলো টগবগে তরুণদের অপরাধের জগতে আরও গভীরে তলিয়ে যাবার জন্য এগিয়ে দেয়। তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়, তাদেরকে উত্তপ্ত করে তুলে শত্রু নিধনের জন্য। টগবগে তরুণদের ব্যবহার করে শত্রু নিধনের ঘটনা বাস্তবেও ঘটে বেশি, সিনেমা নাটকগুলোতে সেগুলোরই প্রতিফলন হয়। সিনেমা নাটকে সেসব খল চরিত্রগুলোকে যতটা সহজে দেখিয়ে দেয়া হয়, বাস্তবে তাদের নাগাল পাওয়া সহজ হয় না। গোপন স্থানে বসে বাস্তব জীবনের সেসব খল চরিত্র কীভাবে একটি নিষ্পাপ তরুণকে অপরাধ করার জন্য উৎসাহ দিচ্ছে, সেসব দেখবার সুযোগ একজন সাধারণ নাগরিকের হয় না।

আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি সাধারণ নাগরিকদের জন্য সেই চিত্রটি সর্বসমক্ষে এনে দিলেন।

ভিডিও ক্লিপটিতে দেখুন কীভাবে একজন বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা তার দলের তরুণদের প্রতি অন্যকে হামলা করার পরামর্শ দিচ্ছেন। পশ্চিমা বিশ্বে যে ধরণে্র দৃশ্য গোপনে ধারণ করে জনসমক্ষে এনে দিলে সেই রাজনীতিকের রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটত চোখের পলকে, সে রকম একটি দৃশ্য আমাদের দেশে সবকটি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা একযোগে ধারণ করে সবার সামনে তুলে ধরল, কিন্তু এখনও “নিজেরা নিজেরা মারামারি কর, অদের দুই চাইরটার সাথে মারামারি কর না ক্যান?” বক্তব্য দেয়া রাজনীতিকের কিছু হয়নি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ছাত্রলীগের কর্মীদের বলেছেন, লেখাপড়ায় আরও মনযোগী হতে। ঐ কথা মা-বাবা ও শুভানুধ্যায়ী নিকটাত্মীয় অভিভাবক ছাড়া তাদের আর কেউ বলে না। দোতালা, তিনতালা থেকে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য দেখে হয়তো মা-বাবাও সেকথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু আপনি বলেছেন। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, তারা যে ইতমধ্যেই জেনে গিয়েছে যে পড়াশুনো না করলেও তাদের জন্য পুলিশে, প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক এমনকি প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকরির ব্যবস্থা করা আছে, তাদের কি আর লেখাপড়ায় ফেরানো সহজ হবে?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি তো তাদের বলেছেন অপরাধ করলে আইনমাফিক ব্যবস্থা থেকে তাদের আর কেউ বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার মন্ত্রীসভার সদস্য রমেশ চন্দ্র সেনের কাছ থেকে তো তারা ইতমধ্যে জেনেছে যে তাদের অপকর্ম নিয়ে বেশী আলোচনা করলে চ্যানেল ওয়ানের মত আরও কিছু চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাবে। রমেশ চন্দ্র সেন তো আপনার সরকারের ব্যাপারেই বললেন, সরকার নাকি এরকম আরও কিছু চ্যানেল বন্ধ করার জন্য চেষ্টা করছে। পাশাপাশি লতিফ সিদ্দিকি তাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন, নিষ্কর্ম বসে থেকে কোন লাভ নেই, যার জন্য যেটা প্রযোজ্য তার সাথে সেটাই করতে হবে। নিজে নিজে মারামারি বন্ধ করার কথাই তিনি বলেননি, তিনি বলেছেন তারা যেন অন্যান্য দলের ছেলেদের সাথেও মারপিট করে। তো, ছাত্রলীগের যারা ঐ দুই মন্ত্রীর কথা শুনে একটু হলেও উজ্জীবনের সন্ধান পেয়েছে, তাদের ফেরানো কি সহজ হবে? তাদের ফেরাতে হলে আগে আপনার এই মন্ত্রী দুজনের সাথে আপনার একটা বিহিত হওয়ার দরকার নয় কি?

আসিফ নজরুল

১২ মার্চ, ২০১০, ঢাকা

সাবধানে কথা বলো! দরজা দিয়ে বের হতে হতে স্ত্রীর উদ্বিগ্ন গলা শুনি। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভাবি, সাবধানেই বলা উচিত। যারা প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছে, তাদের দুরবস্থা জানি। যারা সরকারের বিভিন্ন সংস্থার নজরদারিতে আছে, তাদের ভোগান্তি জানি। তবুও কেন চড়া গলায় বলে ফেলি এত কিছু!

সাবধানে থাকার আসল উপায় হচ্ছে, কথা-ই না বলা। মাঝেমধ্যে তা-ই করি। পঞ্চম সংশোধনী মামলার লিভ টু আপিল খারিজ হওয়ার দিন ফোন আসে কিছু চ্যানেল থেকে। এই লিভ খারিজ হওয়ার কোনো কারণ আমি বুঝতে পারি না। হাইকোর্টের বিচারক কেন চতুর্থ সংশোধনীর পক্ষে কিছুটা হলেও সাফাই গাইলেন রায়ে, তাও বুঝতে অক্ষম আমি। আরও নানা অসংগতিপূর্ণ (কিন্তু সামরিক শাসনের বিরোধিতা, অসাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি কিছু ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রশংসনীয়) এ রায়কে বাইবেলের মর্যাদা দিয়ে লেখালেখি শুরু হয়ে গেছে চারদিকে। অথচ আমার মনে নানা প্রশ্ন। এত প্রশ্ন প্রকাশ্যে করে টিকে থাকা যাবে না দেশে। সব চ্যানেলকে যাব না বলে দিয়ে বসে থাকি বাসায়। দেখি, অন্যরা কী বলেন।
অন্যরা বলেন। কিন্তু আমার মনের প্রশ্ন অনেকাংশে নেই সেখানে। হয়তো সবাই সাবধানী হয়ে গেছেন আজকাল। হয়তো এ দেশে সত্যিই অনেক কিছু বলতে মানা। কিছু বিষয়ে আদালত অবমাননার খড়্গ আছে, কিছু বিষয়ে মানহানি মামলা খাওয়ার ভয় আছে।

এগুলো সব দেশে আছে, বাংলাদেশে আছে আরও বেশি। কিছু বিষয়ে টেলিফোনে হুমকি শোনার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। পাকিস্তান, জিম্বাবুয়ে ও কলম্বিয়ার মতো দেশে এমন হুমকি থাকবেই। কিন্তু গণতন্ত্রের দেশ বাংলাদেশেও তা আছে—আছে ভয়ংকরভাবে।

বাংলাদেশে আরও আছে অতি ‘প্রগতিশীল’ বা ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ নাগরিক সমাজের আক্রমণ। পশ্চাত্পদ বা সাম্প্রদায়িক শক্তি ভয়ংকর একপেশে ও নির্মম। কখনো কখনো শারীরিকভাবে আক্রমণ বা জীবনের ওপর হামলাকে উত্সাহিত করে বসে এরা। এরা এক আমলে সোচ্চার থাকে, আরেক আমলের অনাচার নীরব থেকে সমর্থন করে।

প্রতিক্রিয়াশীল ও পশ্চাত্পদ গোষ্ঠী অযৌক্তিক বা অসহিষ্ণু হবে, কিংবা অন্যদের প্রতি আক্রমণাত্মক হবে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু বেদনাদায়ক হচ্ছে, অতি প্রগতিশীলদের আচরণ। এরা বাকস্বাধীনতার কথা বলে, মুক্তচিন্তার কথা বলে, অন্য পক্ষদের ঝেড়ে বিষ নামিয়ে ফেলে। কিন্তু এদের কোনো সমালোচনা করলে, এমনকি এদের মতো ভাষায় কথা না বললেই বিপদ। হয় তাদের মতো ভাষায় কথা বলতে হবে, না হয় প্রতিক্রিয়াশীল বা পশ্চাত্পদ হিসেবে চিহ্নিত হতে হবে। মাঝামাঝি কিছু নেই।

এই অতি প্রগতিশীলেরাও বিশেষ সময়ে, বিশেষ কারও পক্ষে সোচ্চার থাকেন, অন্য সময় নিশ্চুপ। পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে এরা আদিবাসী নামে অভিহিত করে, তাদের অধিকার রক্ষায় দিনরাত সোচ্চার থাকে। থাকাই উচিত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সেখানে বাঙালি কেউ হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে, বাঙালির গ্রাম পুড়লে এরা নীরব থাকে। তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার থাকে, কিন্তু ভারত বা ইসরাইলে সংখ্যালঘুরা চরম বর্বরতার শিকার হলে সে প্রসঙ্গে নীরব থাকে। এরা বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে যুদ্ধাপরাধের বিচার আর সুশাসনের আন্দোলনে দেশ গরম করে ফেলে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে এদের সুর নরম হয়, সুশাসনের রূপকল্প বাক্সবন্দী হয়ে যায়।

এদের ভাষায় কথা বললে টিক্কা খানের শপথ পরিচালনাকারী বিচারক, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় বিভিন্ন বাহিনীর সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তি কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী রাজার সাতখুন মাফ হয়ে যায়। অন্য ভাষায় কথা বললে, সেক্টর কমান্ডার বা বীর উত্তম পর্যন্ত হয়ে যান রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধী।

এদের চটালে জীবন শেষ। সুশীল আর কুশীলদের সম্মিলিত আক্রমণে জান শেষ হয়ে যাবে তখন।

২.
এ দেশে কী বলা যাবে, কী যাবে না, তা নির্ধারিত হয় অন্যদের সিদ্ধান্তে। রাষ্ট্র নয়, নাগরিকই এখানে প্রতিপক্ষ অন্য নাগরিকের। সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ দিই। একজন বড় সম্পাদক ফোন করতেন মাঝেমধ্যে। অন্তত একটি লেখা দিতেই হবে তাঁকে। তিনি বলেন, ‘যা খুশি লিখেন, যা আপনার ইচ্ছা হয়।’

আগের দিন টিভিতে দেখেছি, বিএনপি আমলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাবরের দুর্ভোগ। পুলিশের সাহায্য নিয়ে বিধ্বস্ত শরীরে হাঁফাতে হাঁফাতে চলছেন তিনি আদালতে। আদালত তবুও বারবার রিমান্ডে দিয়ে চলেছেন তাঁকে। বাবরের যা অবস্থা, তাঁর আর টেকার কথা নয় বেশি দিন। আমি সম্পাদককে বলি, বাবরের রিমান্ড নিয়ে লিখব। আঁতকে ওঠেন তিনি— এটা লিখবেন! লোকজন কী ভাববে? বোঝানোর চেষ্টা করি তাঁকে। বাবর অপরাধী হলে তাঁর অবশ্যই সমুচিত শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু প্রায় মুমূর্ষু একজন মানুষকে এতবার রিমান্ডে নেওয়া সংবিধানের লঙ্ঘন। তা ছাড়া রিমান্ডের বিষয়ে হাইকোর্টের যে নির্দেশনা আছে, সেটা পালন করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখাও আদালতের কর্তব্য। তিনি আমার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। কিন্তু অন্যরা কী ভাববে এ নিয়ে বিব্রত তিনি। ‘অন্যদের’ চটানোর সাহস নেই তাঁর। আমাকে আর লিখতে অনুরোধ করাও বন্ধ করে দেন এরপর। সেই পত্রিকায় আমার আর লেখা হয়নি।

অতএব, এ ধরনের পত্রিকায় বাবরের বিষয়ে বলতে মানা। অতি প্রগতিশীলেরা রুষ্ট হন—এ রকম আরও কিছু বিষয়ে লিখতে মানা। বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে সত্যিকারের ইতিহাস চর্চা মানা। শেখ হাসিনার মামলা কেন প্রত্যাহার হলো, সজীব ওয়াজেদ জয় কেন ক্ষমতাবান—এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে মানা। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধাপরাধ আইনটির আরও সংস্কার প্রয়োজন—এটি লিখতে মানা। ভারতীয় সীমান্তে বাংলাদেশিদের নির্বিচারে মেরেই চলেছে, তা বলতে মানা।
মানা আছে অন্য পক্ষেও। মনে আছে, টিভিতে একবার বলেছিলাম, ‘তারেক রহমানকে দেখে শহীদ জিয়ার সন্তান মনে হয় না, মনে হয়, মামুনের বন্ধু।’ বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত একজন সাংবাদিক ফোন করে জানান, বিএনপির লোকজন দারুণ খেপেছেন এতে। এসব কী বলি আমি! মনে মনে আরেকটা লিস্ট করি। তারেক রহমান বিএনপির এবং দেশের কী কী ক্ষতি করেছেন, তা কোথাও কোথাও বলতে মানা। খালেদা জিয়া কীভাবে জিয়ার রাজনীতি, আদর্শ ও ব্যক্তিত্ব থেকে বিচ্যুত্ হয়েছেন, তা লিখতে মানা। বিএনপির আমলে কেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন, তা নিয়ে অনুসন্ধান করা মানা, জামায়াতের বর্বরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানা। বিএনপি এখন ক্ষমতায় নেই। এখন হয়তো আপাতত বলা বা লেখা যাবে অ-বিএনপি পত্রিকা বা টিভিতে। কিন্তু ক্ষমতায় এলেই এসব লেখালেখির মাসুল দিতে হবে। জেলখানায় পচতে হবে কিংবা দেশ ছেড়ে পালাতে হবে।

মানা মানে যে সরাসরি মানা, সব সময় তা নয়। তবে এসব নিয়ে লিখলে বা বললে নানা রকম বিপদ হতে পারে। সবচেয়ে বড় ভয়, ভুল বোঝাবুঝির শিকার হওয়ার। আওয়ামী লীগের স্তাবক না হলে বিএনপি কিংবা রাজাকারের লেবেল দিয়ে দেওয়া হবে এক পক্ষ থেকে। বিএনপির স্তাবক না হলে ভারতের দালাল বলে গালি দেবে অন্য পক্ষ।
অতি প্রগতিশীল বা অতি প্রতিক্রিয়াশীলদের থেকে রক্ষা নেই। মাঝামাঝি কিছুতে বিশ্বাস নেই তাদের।

৩.
এই হানাহানিতে নানাভাবে উত্সাহ জোগায় গণমাধ্যমও। একদল পত্রিকা ‘অগ্রসর চিন্তার’। কিন্তু অন্য কিছু যারা বলে, তাদের সম্ভবত পছন্দ করে না এরাও। নিজেদের প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগবিরোধী লেখক-শিক্ষাবিদদের তারা উল্লেখ করে ‘বিএনপি-জামায়াতপন্থী’ হিসেবে, বিএনপিবিরোধীদের উল্লেখ করে ‘বিশিষ্ট’ বুদ্ধিজীবী বা লেখক হিসেবে। এই বিশিষ্টরা আওয়ামী লীগের এ আমলেও বিভিন্ন ব্যাংক, করপোরেশন বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পেয়ে পুরস্কৃত হয়েছেন। তবু তাঁরা নিরপেক্ষ বা বিশিষ্ট, আর বাকিরা ‘বিএনপিপন্থী’। এদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল দলের শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ বিশেষণ ‘মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি’, সাদা দলের পরিচয় ‘বিএনপি-জামায়াত ঘরানার শিক্ষক’।

অন্যদিকে বিএনপির সমর্থক কিছু পত্রিকায় ঠিক উল্টো চিত্র। সেখানে বিএনপিবিরোধী কাউকে ঘাদানি, নাস্তিক, মুরতাদ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা মামুলি বিষয় মাত্র। তাদের সাংবাদিকতায় ঘাদানি মানে আওয়ামী লীগ, নাস্তিক মানে আওয়ামী লীগ, মুরতাদ মানেও আওয়ামী লীগ। বিএনপির পক্ষে কথা বলা মানে স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বলা, অন্যকিছু বলা মানে ভারতের দালালি করা।

পিছিয়ে নেই আমাদের চ্যানেলগুলোও। যেকোনো সংবাদ প্রচারে নিজেদের দর্শনের বিশেষজ্ঞ খুঁজে পেতে এদের তুলনা নেই। তাদের দুয়ার বন্ধ অন্যদের জন্য—যা তারা বলতে চায় না, তা অন্যদের বলার সুযোগও দিতে চায় না।

৪.
এ দেশে বলতে মানা এমন বহু কিছু। কিন্তু সাধারণ মানুষ শুনতে চায় সব। দ্রব্যমূল্য বা দুর্নীতি আওয়ামী লীগের আমলে বাড়লে এরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কষ্ট পাওয়া থেকে বিরত থাকে না। বিএনপি আমলে দাম বাড়লে বিসমিল্লাহ বললে এদের কষ্ট দূর হয় না। বঙ্গবন্ধু বা জিয়াউর রহমানের হত্যার বিচার হলে এরা নিজেদের পরিজনদের হত্যার কষ্ট ভুলে যায় না। নদীতে পানি কম থাকলে ভারতের স্বার্থ ভেবে খুশি থাকে না, বিএনপি ক্ষমতায় এলে পাকিস্তানকে ভাই ভাবা শুরু করে না। সবার চলাচল থামিয়ে দিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি রাস্তায় চললে, কোন দলের তিনি—এটা ভেবে শাপ-শাপান্ত করা থেকে বিরত থাকে না।
মুশকিল হচ্ছে, ‘বলতে মানা’ কথা বলার সুযোগ নেই তাদের। মিডিয়ায় কথা বলি আমরা শিক্ষিত আর সম্পদশালীরা। জনগণের রায় কী, তাও অবলীলায় সার্টিফাই করি আমরা। জরিপ, গবেষণা আর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে জনগণ কারা কারা, তাও নির্ধারণ করি আমরাই।

ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয়। কিন্তু বলতে মানা কথাগুলো সবারই বলা উচিত ছিল। সেটি হয়নি বলেই এত দুর্ভোগ বাংলাদেশের।

* * * * *

আসিফ নজরুল একজন লেখক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

চাপিয়ে দেওয়া বন্ধুত্বের অসংখ্য নমুনা আমরা দেখেছি। আমাদের প্রতি অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের আচরণে যখন বন্ধুত্ব তো সুদূর পরাহত, নমনীয়তারও লেশমাত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি, তখন দেশের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষজন আমাদের শিখিয়েছেন পড়িয়েছেন যে সেই রাষ্ট্র আমাদের কত মহান মিত্র। সবার দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে যে জানতাম তা বলা যাবে না, অনেকেরই সেই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির খবর জেনেছি সেই বন্ধুত্বের জয়জয়কার করতে দেখার পর।

পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনকে বলতে শুনলাম, বাংলাদেশে বন্যাসহ অন্যান্য আভন্তরীণ সমস্যার জন্য ফারাক্কা বাঁধ বা ভারত কোন ভাবেই দায়ী নয়; আমাদের নিজস্ব ত্রুটি ও বিগত বিএনপি সরকারের সৃষ্ট সমস্যার কারণেই অন্যান্য বৃহৎ সমস্যাগুলো দেখা দিয়েছে। রমেশ চন্দ্র সেন টিপাইমুখ বাঁধের প্রসঙ্গেও দুটি ইন্টারেস্টিং মন্তব্য করেছিলেন। বাঁধটি নির্মাণে ভারতীয় উদ্যোগের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে বাঁধ তৈরি হোক, তারপর বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে দেখা গেলে তিনি ভারত সরকারের সাথে যোগাযোগ করবেন। পরে তিনি বলেন, ভারত আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী ও বন্ধুরাষ্ট্র, অতএব কিছু ক্ষয়ক্ষতি কবুল করে হলেও তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাটা জরুরী।

“…তবুও আশা করা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা… তার জানুয়ারি ২০১০-এর ভারত সফরের পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হবে।…”

তো চাপিয়ে দেওয়া বন্ধুত্বের প্রসঙ্গে যা বলছিলাম। আপনি যদি কারও সাথে আপনার বন্ধুত্বের বিষয়টিকে ফলাও ভাবে প্রচার করতে চান, তাহলে আপনাকে সেই ‘বন্ধু’-র তরফ থেকেও কিছু সহযোগীতা পেতে হবে। কেননা এরকমটি যদি হয় যে একদিকে আপনি সেই বন্ধুত্বের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন আর অন্যদিকে সেই বন্ধু বিভিন্ন উপায় নানান গোলমাল পাকিয়ে তুলছে, তাহলে আপনার প্রচারের প্রতি মানুষের আস্থা এবং সাধারণ মানুষের কাছে সেই বন্ধুত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা, দুটোই বেশ ভিত্তিহীন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রনীতি বিগত বেশ কয়েক বছর যাবতই বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশী নাগরিকদের মৃত্যু তো এতদিনে সাধারণ বা প্রায় নগণ্য হয়ে গিয়েছে; গত এক বছরে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছে সাতশোর বেশী বাংলাদেশী নাগরিক। এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রগুলো যেমন সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণে ঔদ্ধত্য, ভারতে বাংলাদেশী পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধা, বাংলাদেশী টিভি চ্যানেল প্রচারের ক্ষেত্রে বাধা, ভারত থেকে চাল আমদানীর ক্ষেত্রে সীমান্তে বাধা, বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতীয় কূটনীতিকদের নগ্ন হস্তক্ষেপ, কূটনীতিকদের অভব্য আচরণ ইত্যাদি নানা কারণে ভারতকে বন্ধু হিসেবে ভাবা যাচ্ছিল না। বিশেষ একজন কূটনীতিকের অভব্য আচরণই যে তার দেশের ঔদ্ধত্যের পরিচায়ক তা নয়। তবে ঐ আচরণের ব্যাপারে দু’দেশের গণমাধ্যমেই একাধিকবার সমালোচনা হওয়া সত্ত্বেও এবং এ ব্যাপারে সেদেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও যখন কোন ইতিবাচক পরিবর্তন নজরে পড়ে না, তখন সুসম্পর্ক রক্ষায় সেই দেশের অনীহা সম্পর্কে আর সন্দেহের অবকাশ থাকেনা। তবুও আশা করা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যাকে ব্যাক্তিগত ও রাজনৈতিক দু’দিক থেকেই ভারতের ঐতিহ্যগত মিত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তার জানুয়ারি ২০১০-এর ভারত সফরের পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হবে। এমন কি তিনি সফর সেরে দেশে ফিরে বলেওছিলেন যে তার সফর শতকরা একশত ভাগ সফল হয়েছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্মশীল নেতৃবৃন্দ ও দেশের বিপুল সংখ্যক বুদ্ধিজীবিরাও সফরের সাফল্য নিয়ে এতটাই শোরগোল পাকিয়ে তুলেছিলেন যে সফরের ঠিক আগের সপ্তাহেও যে বাংলাদেশী নাগরিক বিএসএফ কর্তৃক অপহৃত হয়ে বর্বরতম নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর সীমান্তের এপারে ফেরত এসেছেন, তিনিও বোধ হয় ধন্ধে পড়ে যান যে তাহলে সম্পর্ক কি আসলেই ভালো, তার উপর ঘটা নির্যাতন কি শুধুই তার কল্পনা ও অলীক?

বিএসএফের হাতে নির্যাতিত সেই ব্যাক্তির অমন ধন্ধ ঘটলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কিছু পরিবর্তিত বৈদেশিক নীতি সেই ধন্ধ কাটিয়ে উঠবার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১০ তারিখে ভারতীয় সময় বিকাল ৪টা ১২ মিনিটে ভারতের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংস্থা প্রেস ইনফর্মেশন ব্যুরো (পিআইবি) প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “As per the revised procedure, while the Ministry of Home Affairs (Foreigners Division) grants in-principle approval for holding the event, security clearance for grant of Conference Visa is required from this Ministry only in respect of participants from Afghanistan, Bangladesh, China, Iran, Iraq, Pakistan, Sri Lanka & Sudan and in respect of foreigners of Pak origin and Stateless persons.”

পিআইবির প্রজ্ঞাপন

সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞপ্তিটি হচ্ছে, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন আছে এরকম কোন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সে দেশে যেতে চাইলে কনফারেন্স ভিসা অনুমোদনের ক্ষেত্রে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, চীন, ইরান, ইরাক, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও সুদানের নাগরিকগণ এবং কোন দেশের নাগরিক নন এমন ব্যাক্তিদের বিশেষ নিরাপত্তা ছাড়পত্র থাকা আবশ্যক যা যাচাই বাছাইর পর ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রদান করবে।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার সফর শেষে যে ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের জয়জয়কার করেছেন এবং সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার ব্যাপারে তার যে শতভাগ সাফল্য দাবী করেছেন, সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের এই পরিবর্তিত নীতিকে একটু খতিয়ে দেখা যাক।

বাংলাদেশের সাথে ঐ তালিকার বাকি যে সাতটি দেশের উল্লেখ আছে, তার কোনটির সাথেই ভারতের কোন সুসম্পর্কের কথা ইতিহাস বলে না। সুসম্পর্ক তো সুদূর পরাহত, ঐখানকার একাধিক দেশের সাথে তারা একাধিক বার যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে।

ধরা যাক চীনের কথা। চীনের সাথে ভারতের রয়েছে ঐতিহ্যগত বৈরী সম্পর্ক, যার শুরু মূলত ১৯৬২ সালের সিনো-ইন্ডিয়ান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে, মূলত দক্ষিণ তিব্বত ও অরুণাচল প্রদেশের অধিকার বিষয়ক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। পাকিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্কও সবার জানা। ওদিকে ইরানের সাথে ভারতের বর্তমান পরম মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের তিক্ততম সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে, এবং ভারতের মত অন্যান্য বন্ধুরাও সেই তিক্ততা বজায় রাখছে বা রাখতে যুক্তরাষ্ট্র প্রভাবিত করছে। আফগানিস্তান, ইরাক, বিশেষ করে সুদানের ক্ষেত্রে একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। আশির দশকে ‘র’-এর পৃষ্ঠপোষকতায় ও ভারতীয় সেনা বাহিনীর প্রশিক্ষণে গড়ে ওঠা এলটিটিইকে নিশ্চিহ্ন করে নিজেদের সার্বভৌমত্বকে সমুন্নত রেখেছে শ্রীলংকা, তাও আবার চীনের পরোক্ষ বাণিজ্যিক ও সামরিক সহায়তা নিয়ে, অতএব শ্রীলংকাকেও ভারত কেন বন্ধু ভাবছেনা সেটাও কম বেশী স্পষ্ট; অন্তত মাহিন্দা রাজাপাকসের শাসনামলে তো নয়ই।

কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো বলছিলেন ভারতের সাথে আমাদের আর কোন সমস্যা নেই, তাই না? যদি ধরেও নেয়া হয় যে পূর্ববর্তী কোন ভারত-বিমূখ সরকারের দৌরাত্ন্যে ভারত বাংলাদেশের ব্যাপারে বৈরী মনোভাব পোষণ করেছে, তাও তো সেসব বৈরীতা চুকেবুকে যাওয়ার কথা যদি আমরা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর শতভাগ সাফল্যের দাবীকে অর্ধভাগ সত্য বলেও ধরে নেই। তাহলে আর সমস্যা কি রইল? আমরা ভারত সরকারের সেই বিশেষ তালিকায় কেন যে তালিকার বাকি সব দেশের সাথেই তাদের ঐতিহ্যগত বা কূটনৈতিক বৈরীতা রয়েছে?

আমি যখন এই নিবন্ধটি লিখছি, ঠিক সেই মুহুর্তে সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্তে বিএসএফের একটি ইউনিট বাংলাদেশী অংশে অনুপ্রবেশ করেছে বলে খবর পাওয়া গেল। পরে জানা যায় ঐ বিএসএফ ইউনিটটি একটি বিল দখলের উদ্দেশ্যে হানা দিয়েছিল। ঐ ধরণের হানা ঐ অঞ্চলে তারা আগেও দিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই একাধিকবার দিয়েছে। তো, গুলি করে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা ও অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশী অংশে অনুপ্রবেশ করা, বিএসএফের এই কুকর্মগুলোকে সোজা ভাষায় আগ্রাসন হিসেবে চিহ্নিত করলে আশা করি তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভারতবিরোধী অপপ্রচার হিসেবে গণ্য হবে না। তো, এই আগ্রাসনই বা কেন দেখতে হচ্ছে? আমাদের প্রশ্ন তো খুব বেশী নয়, খুব দীর্ঘও নয়। আমরা শুধু জানতে চাইছি, প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের গণ্যমান্য অনেকেই যে বন্ধুত্বের ব্যাপারে আমাদের সবক দিয়ে যাচ্ছেন, বিএসএফের আচরণ, সদ্য পরিবর্তিত ভিসা অনুমোদন নীতিমালা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সেই বন্ধুত্বের অস্তিত্ব কোথায়? আদৌ আছে কি?

“…আমি যখন এই নিবন্ধটি লিখছি, ঠিক সেই মুহুর্তে সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্তে বিএসএফের একটি ইউনিট বাংলাদেশী অংশে অনুপ্রবেশ করেছে বলে খবর পাওয়া গেল …”। সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্ত বিএসএফের অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে এক বিএসএফ সদস্যের সাথে তর্কে লিপ্ত বিডিআরের জওয়ান।

প্রধানমন্ত্রী জানুয়ারি ২০১০-এর ভারত সফর সেরে দেশে ফিরবার পর অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই হামলে পড়েছিলেন এই বলে যে, অন্ধ ভাবে ভারতকে দুষে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার দিন শেষ হয়ে গিয়েছে; ভারতের সাথে আওয়ামী লীগের সম্পর্কের বিষয় চাঁছাছোলা মন্তব্য করে আওয়ামী লীগকে কোণঠাসা করার কৌশল পুরোন হয়ে গিয়েছে। ভারতের ব্যাপারে যেকোন নেতিবাচক মন্তব্য মানে দেশবিরোধী অপপ্রচার, এমন কথাও বলা হয়েছে। এখন এমন একটি প্রশ্ন যদি তোলা হয়, যে, ভারতের সাথে বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও উভয়পক্ষের জন্য কল্যাণকর যে সম্পর্কের কথা তারা বলছেন, সেই সম্পর্ক যদি এতই সত্য হয়ে থাকে, তবে কনফারেন্স ভিসার পথে কাঁটা বিছিয়ে বাংলাদেশের কোন নাগরিকের জন্য সে দেশে গিয়ে স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে ভারত বাধা সৃষ্টি করছে কেন, এই প্রশ্নের জবাব কী হবে? বিশেষ নিরাপত্তা ছাড়পত্রের নেপথ্য অর্থ কী তা কি আমাদের বোধগম্য নয়? যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গাটছড়া বেঁধে ভারত যে যুক্তরাষ্ট্রের নব্য সংরক্ষণবাদীদের উদ্ভাবন ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি’, ‘টেরোরিজ্‌ম’ ইত্যাদি শব্দের অপসংজ্ঞাগুলো হৃদয়ঙ্গম করেছে ও অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রতর প্রতিবেশী বাংলাদেশের উপর সেসব কৌশল প্রয়োগ করছে, তা কি প্রতীয়মান হয় না?

আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীর জয়জয়কারের পাঁচ সপ্তাহ না পেরুতেই এই যে ভারত তাদের ঐতিহ্যগত ও জিওপলিটিকাল প্রতিদ্বন্দ্বীদের তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করল, প্রধানমন্ত্রীর কাছে বা এর কী ব্যাখ্যা আছে? তার এত জল্পনাময় কল্পনাময় সফরে তিনি বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশী নাগরিকদের মৃত্যুর প্রসঙ্গটিই বা একবারও তুললেন না কেন, এই জবাবই বা কে দিবে?

মুহম্মদ তাওসিফ সালাম
২৩ জানুয়ারি, ২০১০

তিনি বোর্ডের সভাপতি। আমি জানিনা বিসিবি সংবিধানে পদবী অনুযায়ী ঊর্দ্ধতন-নিম্নস্তন অবস্থানের ক্রমটি কি রকম, শীঘ্রই জানতে হবে। কিন্ত আপাতদৃষ্টিতে তিনি বোর্ডের সভাপতি, দীর্ঘকাল যাবৎ তার পরিচয় তিনি একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, বর্তমান সরকারী দলের একজন নেতা এবং হয়তোবা একজন দাতাও। বর্তমানে তার পরিচয়ে আরও মাত্রা যুক্ত হয়েছে – তিনি ক্ষমতাসীন দলের একজন প্রভাবশালী আইন প্রণেতা। অতএব বাইশ তেইশ বছর বয়সী বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্যাপ্টেন, সে যে-ই হোননা কেন, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির বিচারে অবশ্যই অনেক নীচের সারিতে অবস্থান করছেন।

লক্ষ্য করুন এখানে কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করিনি। উল্লেখ করিনি কেননা উল্লিখিত রাজনৈতিক অবস্থানের ব্যাক্তিবর্গ দেশের উভয় বড় দলেই বিদ্যমান এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গির উল্লেখযোগ্য পার্থক্য এখনও কারও গোচর হয়নি। অতএব এই লেখাটি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত কোন নিবন্ধ হিসেবে চিহ্নিত না হোক, সেটাই চাইছি।

বিসিবির সভাপতি এ.এইচ.এম মোস্তফা কামাল লোটাস সম্প্রতি জনসমক্ষে ন্যাশনাল টিমের বিরুদ্ধে যে উষ্মা প্রকাশ করেছেন, তা অবশ্যই পর্যালোচনার দাবিদার। তিনি কি বলেছেন সেটা ইতমধ্যেই সবার জেনে যাওয়ার কথা। তাও পুরো ঘটনাটা সংক্ষেপে নীচে একটা ছোট প্যারায় তুলে ধরা যাক।

হোটেল সোনারগাঁওয়ে ন্যাশনাল টিমকে সংবর্ধনা দেয়ার জন্যে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিসিবি সভাপতি লোটাস কামাল। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কামাল প্লেয়ারদের সম্পর্কে বলেন- তারা দায়িত্মজ্ঞানহীন; তাদের প্রয়োজনীয় কমিটমেন্ট নেই; খেলার মাঝে জেতার ষোলআনা ইচ্ছা নেই; এক রানের জন্য লিড নিতে পারেনা; ড্রেসিং রুম থেকে তাদের উদ্দেশ্যে কোন কাজের মেসেজ যায় বলে মনে হয়না; কোন কমিউনিকেশান নাই। এসব কথা চলতে থাকা অবস্থাতেই হতভম্ব প্লেয়ার, প্রেস ও অন্যান্যরা একে অন্যের দিকে তাকাতে থাকেন। তারা হতভম্ব হতেই পারেন, কারন তারা তো জানতেন এখানে পুরষ্কার, সংবর্ধনা, ফটোসেশন ইত্যাদি সুন্দর সুন্দর জিনিষপত্রের সাথে থাকবে সুন্দর সুন্দর কথা। গোলাগুলির আশংকা তাদের দূরতম কল্পনাতেও ছিল না। প্রতিরক্ষামূলক ব্যাবস্থা নেই উপলব্ধি করে এক পর্যায়ে ন্যাশনাল টিম ক্যাপ্টেন সাকিব আল হাসান প্রতিআক্রমণকে শ্রেয়জ্ঞান করেন, মাইক্রোফোন হাতে বলেন, “আমাদের দায়িত্মবোধ নিয়ে যারা কথা বলেন, আশা করি কথা বলার সময় তারা নিজেদের দায়িত্মজ্ঞান বজায় রাখবেন”। এই মন্তব্য শোনার পর নাকি লোটাস কামালের চেহারা হয়েছিল দেখার মত। বক্তব্যদান শেষ হওয়ার পর সাকিবকে কেউ একজন ডেকে নিয়ে যায় লোটাস সাহেবের কাছে। সম্ভবত অলি গলিতে বড়ভাইরা যেমন ‘চিপা’-এ নিয়ে যায় অনেকটা সেরকম ঘটনা। চিপা অবশ্য কারওরই দৃষ্টির অগোচর ছিলনা, সেখানে সাকিবকে দেখা গিয়েছে নত মস্তকে লোটাস কামালের দাপটাদাপটির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। সাকিব সেখানে লোটাস কামালের কাছে দুই হাত জোড় করেছেন, ক্ষমাই চেয়েছেন হয়তো। সেই ফটো আবার দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকায় ছাপাও হয়েছে। তেলেসমাতি আর কাকে বলে!

লোটাস কামাল অবশ্য কিছু ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। তিনি বলেছেন তিনি একজন প্রফেশনাল। তিনি চাইবেন পারফর্ম্যান্স। তার দাবি থাকবে জয় এবং তার কাছে প্লেয়ারদের কমিটমেন্টও হতে হবে জয়। ম্যাচ শেষে সেটা জয় না হয়ে যদি জয়ের কাছাকাছিও হয়, সেটা তিনি বিবেচনা করে দেখবেন। কিন্তু প্লেয়াররা খেলার আগে জেতার কথা না বলে বলবে ভালো খেলার জন্য খেলব, ওটি হবে না।

লোটাস কামালকে বাংলাদেশের আপামর ক্রিকেটপ্রেমী ও একনিষ্ঠ দর্শকদের একজন ধরে নিলে তার ক্ষোভের বিষয়বস্তু উপলব্ধি করা সহজ। তার তুলে ধরা বেশিরভাগ পয়েন্টকেই ক্রিকেটের সমঝদার ও না-সমঝদার, সবাই সমর্থন করবেন।

কিন্তু কয়েকটা ব্যাপার মেলানো যাচ্ছেনা। যেমন লোটাস কামালের স্থান-কাল-পাত্র জ্ঞান। তিনি বলেছেন তিনি প্রফেশনাল। সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছেন যে তিনি একজন নেতা যিনি প্রতিষ্ঠানের অর্গানগুলোর কাছ থেকে সর্বোচ্চ পারফর্ম্যান্স আশা করবেন, এবং সেটা সম্ভব করার জন্য নরম-গরম কোন পন্থা অবলম্বন করতেই দ্বিধাবোধ করবেন না।

কথা হচ্ছে, একজন প্রফেশনাল কি কখনও বিশ্ববাসীকে জানিয়ে সমস্ত মিডিয়াকে সামনে রেখে তার অধীনস্তদের গুষ্টি উদ্ধার করবেন? এরকম নজির কি আছে কোথাও? একজন প্রফেশনাল যিনি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে অবস্থান করেন তাকে অবশ্যই তার সাবঅর্ডিনেটদের প্রতি অম্ল ও মধুর দুই আচরণই করতে হবে, নেতৃত্বরক্ষা ও দক্ষতা বাড়ানো, উভয় উদ্দেশ্যেই। কিন্তু তিনি কি সেই প্রতিষ্ঠান আয়োজিত কোন সংবাদ সম্মেলনে কোনদিন তার কর্মীদের এক হাত নিবেন? এতে তার কর্মীদের মনোবল কোথায় যাবে? নেতা হিসেবে এ ধরণের পেটপাতলা লোক কি কখনও নিজেকে প্রফেশনাল দাবি করতে পারে?

একজন ফ্যান হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের প্রতি লোটাস কামালের সমর্থন নিয়ে কোন সন্দেহ নেই, এবং টিম জিততে না পারায় তিনি হতাশ। তো এ ধরণের সমর্থক তো দেশে আরো ১৬ কোটি আছেন। জিততে না পারলে তারাও হতাশ হন। অনেকে প্লেয়ারদের গ্যালারি থেকে দুয়ো দেন, কেউ কেউ মারতেও ধরেছিলেন। তো এদের সাথে আর বিসিবি প্রেসিডেন্ট লোটাস কামালের তফাত কি রইল? তিনি একজন ক্ষমতাবান এমপি, যার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে খোদ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকেই নাকানি চোবানি খেতে হতে পারে। এই অহংকারই কি লোটাস কামালের বোধবুদ্ধিকে হজম করে নিয়েছে? সাকিবকে দুটো কথা শোনালে কেউ কিছু বলার নেই, বরং প্রতিবাদ করলে সাকিবকেই হার মেনে ক্ষমা চেতে হবে, এটা জেনেই কি তিনি বিষ উগরে দিলেন?

মনে পড়ে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের একজন বিশিষ্ট নেতা জয়নাল হাজারী জামিনে মুক্ত হওয়ার পর জানিয়েছিলেন বাকি জীবন ক্রিকেট নিয়ে থাকতে চান, প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রিয় সভানেত্রীর কাছে আবেদন করবেন বিসিবির দায়িত্মটা তার হাতে দেওয়ার জন্যে। তখন আমরা বলেছিলাম, বাহ্! এবার তো আমাদের ব্যাটসম্যানরা আউট হলে আর ড্রেসিং রুমে যাবে না, মাঠ থেকে সোজা আত্মগোপনে যাবেন। প্রাণের ভয় কার নেই? বিশেষ করে টিপু সুলতানকেই বা কে চেনে না। তো সেটা ছিল জয়নাল হাজারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

লোটাস কামালকে যখন বিসিবির প্রেসিডেন্ট বানানো হল, তখন সত্যিই ভেবেছিলাম যে অন্তত এই অ্যাপয়েন্টমেন্টটা অ্যাটর্নি জেনারেল বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মত হয়নি। লোটাস কামাল, আরেফীন সিদ্দিকী বা মাহবুবে আলম এনারা সবাইই রাজনৈতিক লোক ও নিয়োগও পেয়েছেন একান্ত রাজনৈতিক বিবেচনায়, কিন্তু লোটাস কামালের বিসিবির প্রেসিডেন্ট হওয়াতে তেমন নিরাশ হইনি। তাকে একজন সফল ব্যবসায়ীও দক্ষ ব্যাবস্থাপনার লোক বলেই জানি। কিন্তু তিনি সম্প্রতি আমাদের নতুন করে ভাবতে বসিয়ে দিলেন।

ঘটনা অতিবাহিত হতে হতেই সাকিব সমর্থন পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রায় সব ক্রিকেটারের পক্ষ থেকেই। এককালের ক্যাপ্টেনগণ যেমরূরু নাইমুর রহমান দূর্জয়, খালেদ মাসুদ পাইলট এবং আমিনুল ইসলাম বুলবুল, এনারা সবাই বোর্ড সভাপতির আচরণকে ঔদ্ধত্য হিসেবে দেখছেন। সভাপতিও যে সমর্থন পাননি তাই বা বলি কি করে। দেশের স্বঘোষিত সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক যারা এই সভাপতির নিয়োগে উদ্বেল হয়ে উঠেছিল, তারা মোটামুটি চেপেই গিয়েছে এই পুরো ঘটনাটা।

তবে এটা ঠিক যে তাৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া দেখানোতে সাকিব আল হাসানেরও কিছুটা ছেলেমানুষি প্রকাশ পেল। লোটাস কামাল বিসিবির প্রেসিডেন্ট, আওয়ামী লীগের ক্ষমতাধর এমপি ও আবাহনী ক্রিকেটের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বলে বলছি না। সাকিব আল হাসান জাতীয় দলের ক্যাপ্টেন। এ ধরণের তাৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া দেখানো তার শোভা পায় না নিশ্চয়ই। এ কথা সত্য যে ক্যাপ্টেন হিসেবে তিনি বোর্ডের কাছ থেকে আরও সমর্থন আশা করেন, অন্তত পক্ষে লোটাস কামালের এই লোকসমক্ষে রূঢ় আচরণ আশা করেন না। কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে এসকল পরিস্থিতিতে নিঃশব্দে সামলে ওঠার গুণটা তার থাকা জরুরী। বোঝা গেল এখনও সেই গুণ পরিপক্ক ভাবে রপ্ত হয়নি। তাড়াতাড়ি রপ্ত হওয়া প্রয়োজন। আর লোটাস কামাল সাহেব, বেশ পরিণত বয়স্ক মানুষ, তাকে আর কি শেখার জন্য বলব, শুধু বলা যেতে পারে, স্থান-কাল-পাত্র জ্ঞানটা আরেকটু ঝালিয়ে নিলে সবারই মঙ্গল।

তবে সবশেষে এটা না বলে উপায় নেই, লোটাস কামালের মত মানসিকতার দিক থেকে পিছিয়ে থাকা কর্মকর্তাদের অভিভাবক হিসেবে পেয়ে আমাদের প্লেয়াররা এগিয়ে থেকেও সামগ্রিক ভাবে হয়তোবা পিছিয়েই থাকবেন। এদের কাছ থেকে প্লেয়াররা যখন স্বান্ত্বনা চান তখন পাবেন ধিক্কার, আর যখন সমর্থন চান তখন পাবেন আক্রমন। আর এক সময় যখন এই প্লেয়াররা সব কাটিয়ে উঠে সাফল্য পাবেন, তখন এই কর্মকর্তারাই লজ্জা বিসর্জন দিয়ে সাফল্যের ক্রেডিট তুলে নিবেন নিজের কাঁধে। এনারা কর্মকর্তা হিসেবে নন, বরং গ্যালারিতে বসে হৈচৈ করবার যোগ্য। অতএব এনাদের গ্যালারিতে পাঠিয়ে দেয়া হোক। এনারা বরং হসপিট্যালিটি বক্সে বসে সপরিবারে খেলা দেখুন আর বুঝে না বুঝে যা খুশি মন্তব্য করুন, যেগুলো কেউ শুনবে না। বোর্ড বরং ছেড়ে দেওয়া হোক তাদের হাতে যারা প্লেয়ারদের সাথে ব্যাক্তিগত আলোচনাকে গুরুত্ব দিয়ে আপত্তির কথা তখন জানাবেন, অন্তত সংবাদ সম্মেলনে উচ্ছৃংখলতার জন্ম দিবেননা, প্লেয়ারদের স্পিরিটের বারোটা বাজাবেননা।

* * * * *

মুহম্মদ তাওসিফ সালাম একজন বাংলাদেশী ব্লগার।

স্বাগতম

লেখক সংঘে আপনাকে স্বাগতম। এই ব্লগটির উপাদানসমূহ যদি আপনি পছন্দ করে থাকেন, তাহলে আশা করা যেতে পারে নিন্মোক্ত ব্লগগুলোও আপনার ভালো লাগবে।

আর ইংরেজী লেখক সংঘ তো থাকছেই।

সেপ্টেম্বর 2017
সোম বুধ বৃহ. শু. শনি রবি
« এপ্রিল    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

RSS বিবিসি বাংলা

  • An error has occurred; the feed is probably down. Try again later.