মুহম্মদ তাওসিফ সালাম
১৬ এপ্রিল, ২০১১

বাংলাদেশে চাঞ্চল্যকর অর্থ কেলেঙ্কারিগুলোর সমালোচনায় রাজনীতির বেশ দৃশ্যমান উপস্থিতি থাকার ফলে ঠিক কি পরিমাণ টাকার জালিয়াতি হয়েছে, তা মুহুর্মুহ রাজনৈতিক বক্তব্য-পাল্টাবক্তব্যে হারিয়ে যায়। পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক কেলেংকারিতে প্রচারিত অর্থের পরিমাণ হাজার থেকে লক্ষ কোটির মাঝে ঘোরাফেরা করেছে। সম্প্রতি বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থর সংসদীয় বক্তব্যের ফলে ‘তিরিশ থেকে চল্লিশ হাজার কোটি’ সংখ্যাটি জাতীয় সংসদের রেকর্ডভুক্ত হয়েছে।

এটা বলা অপেক্ষা রাখে না যে যে অর্থ কেলেংকারিতে হাজার হাজার কোটি টাকা জড়িত, সেই কেলেংকারির নায়করাই হচ্ছে সে টাকাগুলোর প্রকৃত দখলকারী, যারা রাজনীতির সব হিসেব-নিকেষ বাদ দিলেও শুধু ঐ অর্থের জোরেই প্রচন্ড ক্ষমতাবান।

পুঁজিবাজারের কেলেংকারি তদন্তের আগপর্যন্ত বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সাবেক সরকারী ব্যাংকার ইব্রাহিম খালেদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোন প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু তদন্তের পর সেই প্রতিবেদন জমা দেয়া, প্রকাশ ও তাতে উল্লেখিত তথ্যকে ঘিরে একটি তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত হঠাৎ ঘোষণা দেন যে সেখানে দায়ী ব্যাক্তি হিসেবে কয়েকজনের নাম দেয়া আছে, যেগুলো এই সরকার প্রকাশ করবে না। প্রকাশ না করার কারণ হিসেবে অর্থমন্ত্রী, তিনি একটি গণতান্ত্রিক সরকারের ‘কারও প্রতি অনুরাগ বা ভয়ের বশবর্তী হয়ে কিছু না করা’-র শপথ নেয়া মন্ত্রী, তিনি দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে জানান, ঐ নামের লোকজন অনেক ক্ষমতাবান, তাই তাদের নাম বলা যাবে না।

এই প্রকাশ করা না করার প্রসঙ্গেই জন্ম নেয় বিতর্কের, যার ফলে দেশের সংবাদমাধ্যমের বেশ জবরদস্ত কিছু অংশীদার ইব্রাহিম খালেদের প্রতি সেই আচরণ করা শুরু করলেন, যেই আচরণ তারা কিছুদিন আগেই করেছিলেন ডক্টর ইউনুসের প্রতি।

সংবাদমাধ্যম এখন শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না। সংবাদমাধ্যম এখন কাগজ, টেলিভিশন, রেডিও ও কম্পিউটারের স্ক্রিন পর্যন্ত বিস্তৃত। এই উল্লেখিত মাধ্যমগুলোর প্রত্যেকটিই বাংলাদেশের কয়েকটি বহুল প্রচারিত সংবাদমাধ্যম রয়েছে। এই মাধ্যমগুলোতে যারা ডক্টর ইউনুসের প্রতি কিছুদিন আগে করা আচরণের ধরণগুলো মনে রেখেছেন, সেগুলোকে চোখের সামনে ভাসালে তারা বোধ করি সেই বিচারে তখনকার ইউনুস সাহেবের চেয়ারে এখনকার ইব্রাহিম খালেদ সাহেবকে বসাতে পারবেন। বেখাপ্পা লাগবে না।

পুঁজি বাজারে বিপুল পরিমাণ অর্থ জালিয়াতি হওয়ার পর এবং তার অংশীদার তেত্রিশ লক্ষ ব্যবসায়ীর প্রায় পথে বসবার দশা হওয়ার পর অনেক ঘটনা ঘটেছে ও ঘটছে। তবে মূল বা বেসিক ঘটনাটি ক্রমানুসারে হচ্ছে,

– একটি মহাপ্রতারণা করা হয়েছে। বহু মানুষ বহু বহু অর্থ বাজারে টেনে এনে সেগুলো গাপ করা হয়েছে। গাপ করেছে কয়েকজন মানুষ, যারা অর্থমন্ত্রীর ভাষ্যমতে এতই ক্ষমতাবান যে তাদের নাম নাকি তিনিই নিতে পারছেন না।

– সেগুলো তদন্ত করতে একজনকে বলা হয়েছিল, যেই তিনি তদন্ত প্রতিবেদনে কয়েকটি নাম ও কয়েকটি লাইন লিখলেন, ওমনি তার উপর শব্দবাণ নিক্ষিপ্ত হতে লাগল। যে নাইমুল ইসলাম খানকে কখনও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে অন্তত আমি দেখিনি, তিনিও এসে বললেন ইব্রাহিম খালেদের নাকি নীতির স্খলণ হয়েছে, ইব্রাহিম খালেদ নাকি দুর্নীতিবাজ। এই নাইমুল ইসলাম কিছুদিন আগে ডক্টর ইউনুসেরও একজন হঠাৎ গজিয়ে ওঠা সমালোচক ছিলেন।

– যে অর্থমন্ত্রী বললেন ক্ষমতাবানের নাম নেয়া যায় না, যে এমপি বললেন বিনিয়োগকারীরা সব ফটকা, যে অর্থ উপদেষ্টা বললেন বিনিয়োগকারীরা নাকি আদৌ সরকারের মাথাব্যাথাই না, তাদের বক্তব্য নিয়ে মিডিয়াকে বিন্দুমাত্র ভাবিত দেখা গেল না।

বাস্তবতা হচ্ছে, কোন বহুল আলোচিত ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ফলাও ভাবে যা প্রচারিত হয়, তা কোন কোন ক্ষেত্রে শুধু সেই ঘটনাটিরই ব্যাখ্যা নয়, বরং সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট হাজারটা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতার নির্যাস। বিশেষ করে কোন কোন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত কোন খবরের কয়েকটি লাইন পড়েই স্মরণ করতে হয় কে সেটির মালিক।

এই পরিস্থিতিতে একদল সংবাদ বিশ্লেষক সারাদিন মাথা কুটলেও কেউ বিশ্বাস করবেন না যে ইব্রাহিম খালেদ দুর্নীতি করে এখানে জলঘোলা করেছেন। বিশ্বাস করবেন না এই কারণে নয় যে সবাই ইব্রাহিম খালেদকে খুব ভালো জানেন। বিশ্বাস করবেন না এই কারণে যে- হঠাৎ করেই একজন নির্দ্দিষ্ট ব্যাক্তির, সে ইউনুসই হোক আর ইব্রাহিম খালেদই হোক আর শেখ হাসিনার যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগত আইনজীবি পায়াম আখাভানই হোক, চরিত্রহননে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সমবেত ও অন্তহীন চেষ্টার মাঝে যে কোথাও এতটুকু সৎ সাংবাদিকতা নেই, সেটি বোঝেন বাংলাদেশে এমন মানুষের সংখ্যা এখন অনেক। এই সংবাদমাধ্যমগুলোই রাজনীতি আর ব্যবসার দলাদলি করতে গিয়ে মানুষকে চালাক বানিয়ে ফেলেছে।

বোকা মানুষ ঠেকে শিখে চালাক হয়, চালাক মানুষ কিন্তু আর বোকা হয় না। যে পাঠক বা দর্শক বা ইন্টারনেট ব্যবহারকারী খবর পড়ে তার দিকে ঝুঁকে গিয়ে গন্ধ শোঁকার অভ্যেস একবার রপ্ত করে ফেলেছে, তার আর সেই অভ্যেস থেকে নিষ্কৃতি নেই, নিষ্কৃতি নেই আমাদের সংবাদমাধ্যমেরও।

অতএব ইব্রাহিম খালেদকে নিয়ে নষ্ট খেলা বন্ধ হোক। শেয়ার কেলেংকারিতে জড়িত মহাদস্যুদের বাঁচাবার চেষ্টা বন্ধ হোক।

Advertisements