You are currently browsing the monthly archive for এপ্রিল 2011.

মুহম্মদ তাওসিফ সালাম

২৯ এপ্রিল, ২০১১

http://starazzobd.files.wordpress.com/2011/04/sahara-khatun-450px.jpg

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন

গত বছরের শেষে একটি লেখায় গণধোলাইয়ের পুনর্বিস্তার প্রসঙ্গে আশংকা প্রকাশ করেছিলাম। হতে পারে কাকতালীয়, তবে ২০১০-এর নভেম্বার-ডিসেম্বারে সারা দেশে গণধোলাইয়ে অপরাধী বা অভিযুক্তের মৃত্যুর এতগুলো ঘটনা ঘটেছিল যে আশংকা প্রকাশ না করে উপায় ছিল না।

সম্প্রতি কক্সবাজারে গণধোলাইয়ের শিকার হয়েছে ডাকাত হিসেবে অভিযুক্ত ১০ ব্যাক্তি। ডাকাতির বেশ বড় আয়োজনের জবাবে এলাকাবাসী আর পুলিশের আক্রমণ যৌথ ভাবে হলেও শেষমেষ সংঘর্ষটি ত্রিমুখী হয়ে পড়ে, যার শিকার ঐ দশজন ছাড়াও হয়েছে গ্রামের একটি নিরীহ যুবক। আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক গ্রামবাসী, অর্ধশতাধিক পুলিশ।

পত্রিকার ভেতরের পাতায় ছাপা হওয়া বিশ্লেষণগুলো বাদ দিলে, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় মূলত দুই ধরণের খবর চোখে পড়ে। প্রথম ধরণটি মৌলিক, এতে শুধু রয়েছে সারা দেশে ঘটা রোমহর্ষক সব অপরাধের ঘটনা। এর বিশ্লেষণ বা উদাহরণে যাব না, কারণ লক্ষ্য করেছি নৃশংসতার খবর পত্রিকায় গুরুত্বের সাথে প্রথম পাতাতে আসলেও বিভিন্ন বয়সের অনেকেই সেসব পড়তে বা এ সংক্রান্ত ছবি দেখতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। ইদানিং অবশ্য দেখি কয়েকটি পত্রিকা, যেগুলো কয়েক বছর আগেও অপরাধের বিস্তারের খবরগুলোকে প্রাধান্য দিতে, তারা এখন আর সেসব খবরকে সর্বাগ্রে তুলে ধরার আগ্রহ বোধ করে না। কেন কে জানে।

দ্বিতীয় যে ধরণের খবর আসে, সেগুলোই মূলত হচ্ছে নৈরাশ্যজনক এবং ক্ষতিকারক। এ খবরগুলোতে থাকে আমাদের মন্ত্রী ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতনদের বক্তব্য, যারা বিভিন্ন সভা-সমিতিতে অংশ নিয়ে নিরন্তর বলে যান দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি ওমুক বছরের চেয়ে ভালো, তমুক আমলের তুলনায় মানুষ কম মরছে ইত্যাদি।

এসব দায়িত্মজ্ঞানহীন বক্তব্যের প্রচুর নিন্দা পথেঘাটে হয়ে থাকে। ঢালাও নিন্দায় তা যাচ্ছি না। কয়েকটি ফলাফল ও পরিণতির কথা বলতে চাই।

দেশের সাধারণ মানুষ জানেন আর না-ই জানেন, কিংবা যা-ই জানেন, সরকার নিয়ন্ত্রিত যে কয়েকটি দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা তুলনামূলক ভাবে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম ও ঝুঁকির কাজ করেন, তার মাঝে অন্যতম হচ্ছে আইন-শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী, অর্থাৎ পুলিশ ও র‌্যাব। অপরাধ বিষয়ক অনেক সিনেমা-নাটক আমরা দেখি। বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী একাধিক উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে অপরাধ জগত। আমাদের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী কাঠামোয় প্রতিনিয়তি নিয়মতান্ত্রিক ভাবে যেসব অপরাধের রহস্য উদঘাটিত হয়, তার প্রক্রিয়া নিয়ে সেরকম অনেক সিনেমা, নাটক ও উপন্যাস তৈরি করা সম্ভব।

পুলিশ ও র‌্যাবকে কাজের পুরো প্রক্রিয়াটিই ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের শত্রু মানেই হচ্ছে অস্ত্রধারী ভয়ংকর অপরাধী। র‌্যাব-পুলিশকে প্রতিনিয়ত এই অপরাধীদের মুখোমুখি হতে হয়। অপরাধের খবর পেতে ও অপরাধীকে ধরতে তাদেরকে বিপজ্জনক জগতে প্রবেশ করতে হয়, প্রত্যক্ষ পরোক্ষ ভাবে যোগাযোগ করতে হয় বিপজ্জনক মানুষদের সাথে। সেখানে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে প্রয়োগ করতে হয় নানান কৌশল, চাতুর্য ও বুদ্ধিমত্তা। পত্রিকায় অপরাধের খবরগুলো আসে এবং এটা স্বাভাবিক যে পুলিশ এগুলোকে সংঘটিত হওয়া থেকে আটকাতে পারেনি বলেই অপরাধগুলো হয়েছে। কিন্তু কত শত-হাজার অপরাধ সংঘটন যে তারা প্রতিদিন প্রতিরোধ করছে, তা আমরা জানি না, কেননা তার অনেকটুকুই পত্রিকায় ছাপা হয় না। কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়া হয়তো কেউ জানেনই না অনেক ঘটনার ব্যাপারে।

প্রচন্ড ঝুঁকির মাঝে সরকারী দায়িত্ম পালনের ফলে র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরা তাদের জীবনযাত্রাকেও ঝামেলামুক্ত রাখতে পারেন না। তীব্র মানসিক পরিশ্রমের খুব সুস্পষ্ট প্রভাব পড়ে তাদের পরিবারের উপরেও। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী কাঠামোর বিভিন্ন পর্যায়ে যারা নিয়োগ পান, তারা আর দশটি সাধারণ পরিবার থেকেই এসেছেন। বিভিন্ন পরীক্ষায় পাস করে তারা বাহিনীতে যোগ দেন। কিন্তু যোগ দেয়ার পর সেই জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক বলার আর কোন সুযোগ থাকে না। আর দায়িত্ম পালন করতে গিয়ে ঝুটঝামেলার শিকার হওয়া তো আছেই। কক্সবাজারের ঐ ঘটনাতেই আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক পুলিশ, যার মধ্যে ২৬ জন ডাকাতদের এলোপাতাড়ি ফায়ারিং-এর ফলে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থতা ও অন্যান্য কারণে সরকারের প্রতি তীব্র জনবিক্ষোভের প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলান পুলিশ সদস্যরা। যেমন মুন্সীগঞ্জের বিস্তীর্ণ জলাভূমি অধিগ্রহণ করে বিমানবন্দর নির্মাণের যে সিদ্ধান্ত বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার গ্রহণ করেছিল, তার দ্বারা ক্ষুদ্ধ মুন্সীগঞ্জবাসীর প্রায় পুরোটা রাগই মিটেছিল পুলিশের উপর। স্থানীয় থানার একজন উপপরিদর্শক গণধোলাইয়ে মারা যান, আহত হন প্রায় দুইশতাধিক পুলিশ, যাদের কেউ কেউ এখনও রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যেসব কষ্টসাধনের কথা বলা হল, তার জবাবে বিতর্কে উৎসাহী কেউ এ কথা বলতে পারেন যে তারা সুবিধাও পাচ্ছে অনেক। কর্মকর্তারা পরিবারসহ সরকারী বাসভবনে থাকতে পারছেন, সাধারণ সদস্যদের জন্যও রয়েছে ব্যারাক। এ সকল সুবিধা সত্ত্বেও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত জনসংখ্যার ফলে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যে তাদের নিজেদের কর্মক্ষমতার বেশি শ্রম দিতে হয়, সে বিষয়ে কোন তর্ক চলে না। এই সেদিনও দেখলাম রাজারবাগ পুলিশ লাইনে মহিলা পুলিশদের হোস্টেলের একটি পুরো ফ্লোরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে। এমনিতেই লোডশেডিং-এর যন্ত্রণায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কঠিন, তার উপর সেখানে বিদ্যুৎ থেকেও নেই। সেই হোস্টেলের বাসিন্দা মহিলা পুলিশ সদস্যরা নিশ্চয়ই আরামে দিন কাটান না। পরিশ্রমের ডিউটির পর নির্দ্দিষ্ট সময়ে অপ্রতুল বিশ্রামের জন্য যে হোস্টেলে তারা ফিরে আসেন, সেখানেও তারা শান্তি পাচ্ছেন না।

এই পরিস্থিতিতে, অপরাধ হচ্ছে না বা আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি ভালো, এসব বক্তব্য দিয়ে আমাদের মন্ত্রীরা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিশ্রমী সদস্যদেরই অবমাননা করেন। দেশের মানুষ যখন দেখে মহামারীর আকারে সর্বত্র খুন-খারাপি হচ্ছে, তখন মন্ত্রীদের এসব বক্তব্যের ফলে মানুষের ক্ষোভ শুধু মন্ত্রীদের উপর নয়, পুরো ব্যবস্থার উপর গিয়ে জমা হয়, যার ফল মন্ত্রীদের চেয়ে ঐ সদস্যদেরকেই বেশি ভোগ করতে হয়। কেননা মন্ত্রীদের এসব পাতি বক্তব্যের ফলে মানুষ আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপর আস্থা হারায়, যার ফলে ওসব গণধোলাইয়ের ঘটনা বেড়ে যায়। এমন কি ক্রসফায়ারে হত্যাকান্ড ঘটলেও তাতে বাহবা দেয়ার লোকের অভাব হয় না, কেননা তাদের উপায় নেই।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী গত মার্চ মাসে একটি সভায় বক্তৃতার সময়ে আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, যে বাড়ির লোক খুন হয়েছে সে বাড়িতে গিয়ে এনারা বলেন দেশে নাকি অপরাধ নাই। মানসিক সুস্থতার ব্যাপারটিতে কোন মতামত বা সমর্থন জানাতে যাব না, কেননা এটি নির্ধারণ করবেন ডাক্তাররা, যা কাদের সিদ্দিকী নন বা নই আমিও। তবে এটা বুঝতে পারি যে মন্ত্রীদের ঐসব কথাবার্তা স্বাভাবিক নয়। কেউ কেউ বলেন, এসব হচ্ছে রাজনৈতিক বক্তব্য। রাজনৈতিক বক্তব্য মানে কি? যে বাড়ির লোক খুন হয়, সে বাড়িতে গিয়ে অপরাধ নেই দাবী করার মানে তো মিথ্যাচার। রাজনৈতিক বক্তব্য মানে কি শুধুই মিথ্যাচার?

সেদিন কয়েকজন সাংবাদিক হালকা মেজাজে একজন আরেকজনকে বলছিলেন, পত্রিকায় যেসব জনমত জরিপ হয়, সেখানে একদিনন ‘চিহ্নিত সন্ত্রাসীর ক্রসফায়ারে মৃত্যু বা গ্রামবাসীর হাতে গণধোলাইয়ে ডাকাতের মৃত্যু সমর্থন করেন কি’, এ জাতীয় প্রশ্ন রেখে দেখা যেতে পারে। কোন সন্দেহ নাই যে ফলাফল দেখে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চোখ কপালে উঠবে।

কথাটি ভুল নয়। চিহ্নিত সন্ত্রাসীর ক্রসফায়ারে মৃত্যু হলে প্রকৃতপক্ষেই সেই সন্ত্রাসীর বিচরণক্ষেত্র এলাকার বাসিন্দারা মোটেই কোন আক্ষেপ করেন না, বরং ক্রসফায়ারকে বাহবা দেন। গ্রামবাসীর হাতে ডাকাতে মৃত্যুর ক্ষেত্রেও বাস্তবতা অনুরূপ। কক্সবাজারে রবিবারের ঐ ঘটনায় গ্রামবাসী ডাকাতদের মেরেছে সারা দিন ব্যাপী। প্রথম দফায় দু’জনকে পেয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। বাকিরা পালিয়ে গিয়েছিল পাহাড়ের দিকে। গ্রামবাসী রীতিমত সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে সে পাহাড়কে প্রথম ঘেরাও করেছে, তারপর একেক দফায় অভিযান চালিয়ে দুই দফায় ৪ জন করে আরও ৮ জনকে মেরেছে। দিনশেষে তাদের হাতে নিহত ডাকাতদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০-এ। এরকম কেন হল? হয়েছে কারণ আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপর থেকে মানুষ আস্থা হারাচ্ছে।

আস্থার এই বিলুপ্তির কারণ শুধু বাহিনীর ব্যর্থতা নয়। এর জন্য মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতনদের দায়িত্মজ্ঞানহীনতাও দায়ী। যখন দেখা যায় ১৯৯৯ সালের মালিবাগ হত্যাকান্ড ও যুবলীগ নেতা ইব্রাহীম হত্যাকান্ড থেকে অপর যুবলীগ নেতা ও এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন ভোজবাজির মত অব্যাহতি পেয়ে যান, নাটোরে ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত ১৯ আসামী খালাস পাওয়া মাত্র ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী তাদেরকে উজ্জ্বলবর্ণ গাঁদাফুলের মালা পড়িয়ে বরণ করেন, তখন মানুষের মনে হয় অপরাধীকে হাতে পেলে আর ছাড়াছাড়ি নেই। এর ফলে বিচার ব্যবস্থা ঘটনার নাগাল পাবার আগেই শেষ হয়ে যায় অনেক মানুষের প্রাণ, যাদের সংশ্লিষ্টতা বা দায়িত্ম আদৌ কদ্দূর ছিল, তা আর জানা যায় না।

দুঃখের সাথে বলতে হয়, বড় দায়িত্ম পাবার পর আমাদের কর্তাব্যাক্তিরা ক্রমশ জনবিচ্ছিন্ন হতে থাকেন বলেই ওভাবে বলতে পারেন। এখনকার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে একটি বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা যখন মাইক্রোফোনের সামনে বলেন যে আইন-শৃংখলার অবস্থা ভালো, তখন তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কনিষ্ঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার সাথে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে তারা কতটা একমত।

লিমনের প্রসঙ্গ দিয়ে শেষ করব। এই লিমনের ঘটনাটি মিডিয়ার মনযোগ পেয়েছে। কিন্তু মনযোগ পায়নি এমন দুটো ঘটনাও এর আগে ঘটেছে। একটির শিকার ছিল তরুণ মডেল কায়সার মাহমুদ বাপ্পি, আরেকটির শিকার ছিল অ্যাপোলো হসপিটালের তরুণ কর্মী মহিউদ্দীন আরিফ। বাপ্পি মারা গিয়েছে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে চালানো অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে। আর আরিফ মারা গিয়েছে র‌্যাব সদস্যদের নির্যাতনে। লিমনের ঘটনাটি এখনও পরিণতির অপেক্ষায় আছে। তবে বাকি দুটো ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্তই বলছে র‌্যাব সদস্যরা দোষী।

তিনটি ক্ষেত্রেই র‌্যাব বা পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের সদস্যদের পক্ষে সাফাই গাওয়া হয়েছে। এই সাফাই গাওয়া বন্ধ হোক। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রই হচ্ছে ভালো ও মন্দের সংমিশ্রণ। ভাবার কোন কারণ নাই যে পুলিশ বা র‌্যাবে কোন মন্দ থাকবে না। সেই মন্দরা থাকবে, তারা অপকর্ম করবে। সবগুলো অভিযোগকে আমরা অপকর্ম হিসেবেই বা ধরব কেন? দক্ষ লোকদেরও কি তো ভুল হতে পারে না? এটা অনাকাংখিত ঠিকই, কিন্তু অবাস্তব বা অসম্ভব নয়। এই মন্দদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার কোন কারণ থাকতে পারে না। অতএব প্রত্যেকটি বাহিনীতে দুষ্টুকর্ম সাধনকারীদেরকে চিহ্নিত করে তাদের কৃতকর্মকে তদন্তের আওতায় আনা হোক। একটি বা দুটি মানুষের ভুলকে কোন কর্মকর্তা অস্বীকার করলে তার পুরো বাহিনীটি কলংকিত হয়। সেই বাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতা কমে এবং এতে কাজ করতে থাকা সৎ ও পরিশ্রমী কর্মীদের মর্যাদা হানি হয়। সাধারণ মানুষের মাঝে র‌্যাবের যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা অবশিষ্ট আছে। লিমনের ঘটনার সুষ্ঠু সুরাহা না হলে এমন ঘটনা আরও ঘটবে, যার ফলে র‌্যাবের গ্রহণযোগ্যতা কমবে, আর সেটা যে দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির জন্য কত ভয়াবহ একটা সংকেত হয়ে দাঁড়াবে, তা আমাদের কেউ কেউ হয়তো উপলব্ধি করছি না।

২৯ এপ্রিল তারিখে বাংলাদেশ ফার্স্টে প্রকাশিত

Advertisements

মুহম্মদ তাওসিফ সালাম

২৬ এপ্রিল, ২০১১

http://shatil.files.wordpress.com/2011/04/mufti-amini-and-maulana-abul-hasnat.jpg

হরতালে একপক্ষ বা দুটো পক্ষের জন্য না হলেও, গত ৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির হরতালটিতে সাধারণ মানুষের জন্য বেশ কয়েকটি চমক ছিল। হরতালের আহবানকারী দল বা গোষ্ঠী দেশের প্রধান দুটো দলের একটি না হলেও (একটির সাথে জোটবদ্ধ), হরতাল দেখে অনেক ক্ষেত্রেই তা বোঝার উপায় ছিল না।

হরতাল হয়ে যাবার পর স্বাভাবিক ভাবে যা হয়- সরকার দাবী করেছে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক ছিল, হরতাল পালনকারীরা দাবী করেছে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়েছে। কিন্তু দেশের প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমগুলো হরতালের সফলতা-ব্যার্থতার পাশাপাশি একটি ভিন্ন বিষয়ের উপর আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল। ভিন্ন বিষয়টি ছিল- মাদ্রাসার কোমলমতি ছাত্রদের হরতালের পক্ষে পথে নামতে বাধ্য করা।

প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক, উভয় মিডিয়াতেই হরতালের বেশ কয়েকটি দৃশ্যপট তুলে এনে সেখানে কিশোরদের উপস্থিতির বিষয়টি স্পষ্ট করে দেখাবার চেষ্টা করা হয়। একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেল আটককৃত কয়েকজন মাদ্রাসা ছাত্রের বক্তব্যও প্রচার করে, যেখানে তারা বলছে যে শিক্ষকরা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদেরকে পথে নামিয়েছে।

যেকোন ধরণের সাধারণ কর্মসূচী, সেটি রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক, আন্দোলনভিত্তিক বা সংবর্ধনামূলক যাই হোক না কেন, শুধু শিশুদেরই নয়, কাউকেই সেখানে যোগ দিতে বাধ্য করার বিষয়টিকে সমর্থন করা যায় না। সব সরকারের আমলেই কোন উচ্চপদস্থ মন্ত্রী বা রাজনীতিকের আগমন উপলক্ষে স্কুল কলেজের শতশত ছাত্রছাত্রীকে রোদ-বৃষ্টির মাঝে রাস্তার দু’ধারে দাঁড় করিয়ে রাখার সংস্কৃতিটি দেখা যায়, যা খুবই দরিদ্র মানসিকতার পরিচায়ক।

এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতিতে জড়িত বৃহত্তর ব্যাক্তিবর্গের মানসিক গঠনের একটি আভাস পাওয়া যেতে পারে। যদিও কোন মন্ত্রী নিশ্চয়ই ফোন করে বলেন না যে আমি আসব, হাজার হাজার ছেলেমেয়ে জোগাড় কর, সাধারণত অতি উৎসাহী সরকারী কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনীতিকদের উদ্যোগেই এ কাজগুলো হয়ে থাকে, তবুও মূল উপলক্ষ ব্যাক্তিটি, তিনি কোন মন্ত্রী কিংবা আমিনী যেই হোন না কেন, দায়িত্ম এড়াতে পারেন না। তিনি যদি নিজে উদ্যোগ নিয়ে সেই শিশুসমাগম না থামান, তবে বুঝতে হবে মুখ ফুটে না বললেও তিনি বিষয়টি সমর্থন করছেন, যা দুঃখজনক।

মাদ্রাসা ছাত্রদেরকে লাঠি তুলতে বাধ্য করার ফলে যারা ব্যাথিত হয়েছেন ও এর প্রমাণ দেখাবার জন্য সচেষ্ট হয়েছেন, তারা গণমাধ্যমের দায়িত্মশীল অংশবিশেষ, সন্দেহ নেই।

কিন্তু বাংলাদেশে, এটা কি শুধু ইদানিংই ঘটছে নাকি আগে থেকেই ছিল স্পষ্ট করে বলতে পারছি না, একটা খুবই ন্যাক্কারজনক ব্যাপার হল, কোন বিষয়ে আমরা উদ্বিগ্ন হব আর কোন বিষয়ে হব না, এই বিষয়গুলো নির্বাচনের ব্যাপারে আমরা অতি সূক্ষ্ম বাঁছবিচারের আশ্রয় নেই। যেমন, জোরপূর্বক শিশুসমাগম যাকে ব্যাথিত করেছে, অন্তত যে গণমাধ্যমগুলো এ ব্যাপারে সরব হয়েছে, তাদের কর্মকান্ডের উপর গভীর মনোনিবেশ করে দেখা গেল, ঐ কর্মসূচীর সাথে সম্পৃক্ত একজন ব্যাক্তি, মাওলানা ফজলুল হক আমিনী, তার একটি জলজ্যান্ত পুত্রসন্তান, নাম মাওলানা হাসনাত, হরতালের কয়েকদিন পরেই সে গায়েব হয়ে গেল কিন্তু সেই গণমাধ্যমগুলো এই প্রসঙ্গে কোন বিশ্লেষণের ধারই ধারছে না।’

এ মাসের ১০ তারিখ গত রোববার, ব্যবহার্য গাড়ি মেরামতের উদ্দেশ্যে আমিনীপুত্র মাওলানা হাসনাত দু’জন সহযোগীকে নিয়ে ধোলাইখালে যান। বেলা এগারোটার দিকে তারা টিপু সুলতান রোডে দিল্লী সুইটমিটস নামক দোকানে দাঁড়িয়ে হালকা খাবার খাচ্ছিলেন। এ সময়ে একটি মাইক্রোবাস দোকানের সামনে এসে থামলে তা থেকে অন্তত ছয়জন সশস্ত্র ব্যাক্তি নেমে এসে মাওলানা হাসনাতের কাছে নিজেদেরকে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোক বলে পরিচয় দেন এবং তাকে মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। এ সময়ে সঙ্গে থাকা দু’জন হাসনাতকে কোথায় ও কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনগুলো কেড়ে নেয়া হয় এবং সশস্ত্র ব্যাক্তিবর্গ মাইক্রোবাসে করে মাওলানা হাসনাতকে নিয়ে স্থানত্যাগ করেন।

ঘটনার ১২ দিন পর গত ২৩ এপ্রিল শনিবার মাওলানা হাসনাতকে রাজধানীর বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের পাশ থেকে হাত, মুখ ও চোখ বাঁধা ও অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। ভোরে ঐ অঞ্চলের স্থানীয়রা তাকে দেখে তার হাত, মুখ ও চোখ খুলে দিলে তিনি পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেন। উল্লেখ্য তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি অন্তর্ধানের মুহুর্ত থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছিল। মুক্ত হওয়ার পর নিজের ক্যাপ্টরদের সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট ভাবে কিছু জানাতে পারেননি, কেননা আটকের পর থেকেই তার চোখ বাঁধা ছিল। তবে ক্যাপ্টরদের সাথে তার কথাবার্তা হয়েছে। ক্যাপ্টররাই বলেছেন বেশি। বারবার বলা হয়েছে যেন তার বাবা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচী বর্জন করেন। আন্দোলন থেকে সরে না দাঁড়ালে মেরে ফেলার ভয়ও দেখানো হয়।

হাসনাত জানিয়েছেন তিনি নিশ্চিত তার ক্যাপ্টররা ছিল সরকারের কোন বাহিনীর লোক। এর পালটা বক্তব্যও আছে অবশ্য। হাসনাতের অন্তর্ধানের পর যখন তার পরিবার সহ বহু মানুষ ও সংগঠন দাবী করছিল অতীতের একাধিক ঘটনার মত হাসনাতকেও এই সরকারই আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে গুম করেছে, তখন ঢাকায় আইন-শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত একাধিক বাহিনীর কর্তাব্যাক্তিরা বিষয়টি মুহুর্মুহ অস্বীকার করেছেন।

বর্তমান সরকার দায়িত্ম গ্রহণের পর জলজ্যান্ত মানুষের গায়েব যাওয়ার ঘটনা এটা প্রথম তো নয়ই, এটা যে আসলে কততম ঘটনা তা নিরূপণ করা এই পরিস্থিতিতে বেশ কঠিন। তবে আলোচিত ঘটনাগুলোর মাঝে রয়েছে ঢাকার নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলার ও বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম অন্তর্ধান রহস্য। এই চৌধুরী আলমকে গত বছর বিএনপির ডাকা একটি হরতালের আগের দিন রাজধানীর বেইলী রোড থেকে একই ভাবে মাইক্রোবাস যোগে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তারও কোন খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি। সরকারের হাতে আটক বিএনপি নেতা সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরী জানান যে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে তারও চৌধুরী আলমের মত পরিণতি হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। ঐ জিজ্ঞাসাবাদে চৌধুরী আলমের পরিণতি সম্পর্কে তাকে জানানো হয়, হত্যার পর পেট কেটে নাড়িভুড়ি বের করে তাকে নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের পর সাক্ষাতকালে সালাহউদ্দীন তার আইনজীবি, সাংবাদিক ও আত্মীয়স্বজনদের এই তথ্য দেন।

আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার বিষয় বাঁছাবিচার প্রসঙ্গে যা বলছিলাম, জলজ্যান্ত এই মানুষগুলো উধাও হয়ে যাচ্ছে, আলোচিত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে তাদেরকে পাওয়াই যাচ্ছে না, অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত ঘটনাগুলোতে তাদেরকে পাওয়া যাচ্ছে তুরাগ নদীর পাড়ে বালিতে পোতা অবস্থায় কিংবা নারায়ণগঞ্জের কোন এক ডোবায় হাত পেছনে বাঁধা ও গলা কাটা অবস্থায় আর হাসনাতের মত কতিপয় অত্যন্ত সৌভাগ্যবানদের হাত, মুখ, চোখ বাঁধা অবস্থায় এখানে সেখানে ফেলে যাওয়া হচ্ছে, এই ঘটনাগুলো ঐ সংবাদমাধ্যমগুলোতে কর্মরতদের ছুঁয়ে যাচ্ছে না, তা হতে পারে না। সেসব সংবাদমাধ্যম, সেগুলোর রাজনৈতিক বিশ্বাস বা নীতিমালা যাই হোক না কেন, সেখানে তো আর নিশ্চয়ই কসাই ধরে এনে কলম মাইক্রোফোন হাতে ধরিয়ে বসিয়ে দেয়া হয় নি, অতএব যা ঘটছে সেগুলো তাদেরকে স্পর্শ করছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের জেনেও না জানা কারণে তারা সেগুলো নিয়ে কিছু বলছেন না, বা অন্যান্য অনেক কিছু বলে সেগুলো ধামাচাপা দিতে চাইছেন।

উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাঠক-দর্শক-অনুরাগী জুটিয়ে নেবার পর সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে জনমত গঠনে প্রভাব সৃষ্টি করার যে বহুলপ্রচলিত পদ্ধতিটি রয়েছে, সেই পদ্ধতিটি বহুলব্যবহারের ফলে দেশের গণমাধ্যম ও সাধারণ জনসাধারণের মাঝে খুব ধীরে হলেও একটি দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। যেভাবে সব চলছে, তাতে এই দূরত্ব কমবে না, বরং বাড়তে থাকবে।

সংবাদমাধ্যমের কর্তাব্যাক্তিরা নিজেদের ব্যাক্তিগত মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস বা দর্শনের প্রভাব বজায় রাখুন, তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু চারপাশে যা ঘটছে, সেগুলো তুলে ধরার ব্যাপারেও যদি রাজনৈতিক দর্শনের প্রয়োগ করে কোন ঘটনার প্রচারকে অতিরঞ্জন আবার কোন ঘটনার প্রচারকে বিবর্জন করা হয়, তাহলে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা যে ক্ষতির শিকার হবে, তা আখেরে গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর আঘাত হানবার পথকে সুগম করতে পারে।

মুহম্মদ তাওসিফ সালাম
১৬ এপ্রিল, ২০১১

বাংলাদেশে চাঞ্চল্যকর অর্থ কেলেঙ্কারিগুলোর সমালোচনায় রাজনীতির বেশ দৃশ্যমান উপস্থিতি থাকার ফলে ঠিক কি পরিমাণ টাকার জালিয়াতি হয়েছে, তা মুহুর্মুহ রাজনৈতিক বক্তব্য-পাল্টাবক্তব্যে হারিয়ে যায়। পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক কেলেংকারিতে প্রচারিত অর্থের পরিমাণ হাজার থেকে লক্ষ কোটির মাঝে ঘোরাফেরা করেছে। সম্প্রতি বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থর সংসদীয় বক্তব্যের ফলে ‘তিরিশ থেকে চল্লিশ হাজার কোটি’ সংখ্যাটি জাতীয় সংসদের রেকর্ডভুক্ত হয়েছে।

এটা বলা অপেক্ষা রাখে না যে যে অর্থ কেলেংকারিতে হাজার হাজার কোটি টাকা জড়িত, সেই কেলেংকারির নায়করাই হচ্ছে সে টাকাগুলোর প্রকৃত দখলকারী, যারা রাজনীতির সব হিসেব-নিকেষ বাদ দিলেও শুধু ঐ অর্থের জোরেই প্রচন্ড ক্ষমতাবান।

পুঁজিবাজারের কেলেংকারি তদন্তের আগপর্যন্ত বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সাবেক সরকারী ব্যাংকার ইব্রাহিম খালেদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোন প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু তদন্তের পর সেই প্রতিবেদন জমা দেয়া, প্রকাশ ও তাতে উল্লেখিত তথ্যকে ঘিরে একটি তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত হঠাৎ ঘোষণা দেন যে সেখানে দায়ী ব্যাক্তি হিসেবে কয়েকজনের নাম দেয়া আছে, যেগুলো এই সরকার প্রকাশ করবে না। প্রকাশ না করার কারণ হিসেবে অর্থমন্ত্রী, তিনি একটি গণতান্ত্রিক সরকারের ‘কারও প্রতি অনুরাগ বা ভয়ের বশবর্তী হয়ে কিছু না করা’-র শপথ নেয়া মন্ত্রী, তিনি দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে জানান, ঐ নামের লোকজন অনেক ক্ষমতাবান, তাই তাদের নাম বলা যাবে না।

এই প্রকাশ করা না করার প্রসঙ্গেই জন্ম নেয় বিতর্কের, যার ফলে দেশের সংবাদমাধ্যমের বেশ জবরদস্ত কিছু অংশীদার ইব্রাহিম খালেদের প্রতি সেই আচরণ করা শুরু করলেন, যেই আচরণ তারা কিছুদিন আগেই করেছিলেন ডক্টর ইউনুসের প্রতি।

সংবাদমাধ্যম এখন শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না। সংবাদমাধ্যম এখন কাগজ, টেলিভিশন, রেডিও ও কম্পিউটারের স্ক্রিন পর্যন্ত বিস্তৃত। এই উল্লেখিত মাধ্যমগুলোর প্রত্যেকটিই বাংলাদেশের কয়েকটি বহুল প্রচারিত সংবাদমাধ্যম রয়েছে। এই মাধ্যমগুলোতে যারা ডক্টর ইউনুসের প্রতি কিছুদিন আগে করা আচরণের ধরণগুলো মনে রেখেছেন, সেগুলোকে চোখের সামনে ভাসালে তারা বোধ করি সেই বিচারে তখনকার ইউনুস সাহেবের চেয়ারে এখনকার ইব্রাহিম খালেদ সাহেবকে বসাতে পারবেন। বেখাপ্পা লাগবে না।

পুঁজি বাজারে বিপুল পরিমাণ অর্থ জালিয়াতি হওয়ার পর এবং তার অংশীদার তেত্রিশ লক্ষ ব্যবসায়ীর প্রায় পথে বসবার দশা হওয়ার পর অনেক ঘটনা ঘটেছে ও ঘটছে। তবে মূল বা বেসিক ঘটনাটি ক্রমানুসারে হচ্ছে,

– একটি মহাপ্রতারণা করা হয়েছে। বহু মানুষ বহু বহু অর্থ বাজারে টেনে এনে সেগুলো গাপ করা হয়েছে। গাপ করেছে কয়েকজন মানুষ, যারা অর্থমন্ত্রীর ভাষ্যমতে এতই ক্ষমতাবান যে তাদের নাম নাকি তিনিই নিতে পারছেন না।

– সেগুলো তদন্ত করতে একজনকে বলা হয়েছিল, যেই তিনি তদন্ত প্রতিবেদনে কয়েকটি নাম ও কয়েকটি লাইন লিখলেন, ওমনি তার উপর শব্দবাণ নিক্ষিপ্ত হতে লাগল। যে নাইমুল ইসলাম খানকে কখনও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে অন্তত আমি দেখিনি, তিনিও এসে বললেন ইব্রাহিম খালেদের নাকি নীতির স্খলণ হয়েছে, ইব্রাহিম খালেদ নাকি দুর্নীতিবাজ। এই নাইমুল ইসলাম কিছুদিন আগে ডক্টর ইউনুসেরও একজন হঠাৎ গজিয়ে ওঠা সমালোচক ছিলেন।

– যে অর্থমন্ত্রী বললেন ক্ষমতাবানের নাম নেয়া যায় না, যে এমপি বললেন বিনিয়োগকারীরা সব ফটকা, যে অর্থ উপদেষ্টা বললেন বিনিয়োগকারীরা নাকি আদৌ সরকারের মাথাব্যাথাই না, তাদের বক্তব্য নিয়ে মিডিয়াকে বিন্দুমাত্র ভাবিত দেখা গেল না।

বাস্তবতা হচ্ছে, কোন বহুল আলোচিত ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ফলাও ভাবে যা প্রচারিত হয়, তা কোন কোন ক্ষেত্রে শুধু সেই ঘটনাটিরই ব্যাখ্যা নয়, বরং সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট হাজারটা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতার নির্যাস। বিশেষ করে কোন কোন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত কোন খবরের কয়েকটি লাইন পড়েই স্মরণ করতে হয় কে সেটির মালিক।

এই পরিস্থিতিতে একদল সংবাদ বিশ্লেষক সারাদিন মাথা কুটলেও কেউ বিশ্বাস করবেন না যে ইব্রাহিম খালেদ দুর্নীতি করে এখানে জলঘোলা করেছেন। বিশ্বাস করবেন না এই কারণে নয় যে সবাই ইব্রাহিম খালেদকে খুব ভালো জানেন। বিশ্বাস করবেন না এই কারণে যে- হঠাৎ করেই একজন নির্দ্দিষ্ট ব্যাক্তির, সে ইউনুসই হোক আর ইব্রাহিম খালেদই হোক আর শেখ হাসিনার যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগত আইনজীবি পায়াম আখাভানই হোক, চরিত্রহননে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সমবেত ও অন্তহীন চেষ্টার মাঝে যে কোথাও এতটুকু সৎ সাংবাদিকতা নেই, সেটি বোঝেন বাংলাদেশে এমন মানুষের সংখ্যা এখন অনেক। এই সংবাদমাধ্যমগুলোই রাজনীতি আর ব্যবসার দলাদলি করতে গিয়ে মানুষকে চালাক বানিয়ে ফেলেছে।

বোকা মানুষ ঠেকে শিখে চালাক হয়, চালাক মানুষ কিন্তু আর বোকা হয় না। যে পাঠক বা দর্শক বা ইন্টারনেট ব্যবহারকারী খবর পড়ে তার দিকে ঝুঁকে গিয়ে গন্ধ শোঁকার অভ্যেস একবার রপ্ত করে ফেলেছে, তার আর সেই অভ্যেস থেকে নিষ্কৃতি নেই, নিষ্কৃতি নেই আমাদের সংবাদমাধ্যমেরও।

অতএব ইব্রাহিম খালেদকে নিয়ে নষ্ট খেলা বন্ধ হোক। শেয়ার কেলেংকারিতে জড়িত মহাদস্যুদের বাঁচাবার চেষ্টা বন্ধ হোক।

স্বাগতম

লেখক সংঘে আপনাকে স্বাগতম। এই ব্লগটির উপাদানসমূহ যদি আপনি পছন্দ করে থাকেন, তাহলে আশা করা যেতে পারে নিন্মোক্ত ব্লগগুলোও আপনার ভালো লাগবে।

আর ইংরেজী লেখক সংঘ তো থাকছেই।

এপ্রিল 2011
সোম বুধ বৃহ. শু. শনি রবি
« জানু.    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

RSS বিবিসি বাংলা

  • An error has occurred; the feed is probably down. Try again later.
Advertisements