চাপিয়ে দেওয়া বন্ধুত্বের অসংখ্য নমুনা আমরা দেখেছি। আমাদের প্রতি অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের আচরণে যখন বন্ধুত্ব তো সুদূর পরাহত, নমনীয়তারও লেশমাত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি, তখন দেশের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষজন আমাদের শিখিয়েছেন পড়িয়েছেন যে সেই রাষ্ট্র আমাদের কত মহান মিত্র। সবার দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে যে জানতাম তা বলা যাবে না, অনেকেরই সেই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির খবর জেনেছি সেই বন্ধুত্বের জয়জয়কার করতে দেখার পর।

পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনকে বলতে শুনলাম, বাংলাদেশে বন্যাসহ অন্যান্য আভন্তরীণ সমস্যার জন্য ফারাক্কা বাঁধ বা ভারত কোন ভাবেই দায়ী নয়; আমাদের নিজস্ব ত্রুটি ও বিগত বিএনপি সরকারের সৃষ্ট সমস্যার কারণেই অন্যান্য বৃহৎ সমস্যাগুলো দেখা দিয়েছে। রমেশ চন্দ্র সেন টিপাইমুখ বাঁধের প্রসঙ্গেও দুটি ইন্টারেস্টিং মন্তব্য করেছিলেন। বাঁধটি নির্মাণে ভারতীয় উদ্যোগের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে বাঁধ তৈরি হোক, তারপর বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে দেখা গেলে তিনি ভারত সরকারের সাথে যোগাযোগ করবেন। পরে তিনি বলেন, ভারত আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী ও বন্ধুরাষ্ট্র, অতএব কিছু ক্ষয়ক্ষতি কবুল করে হলেও তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাটা জরুরী।

“…তবুও আশা করা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা… তার জানুয়ারি ২০১০-এর ভারত সফরের পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হবে।…”

তো চাপিয়ে দেওয়া বন্ধুত্বের প্রসঙ্গে যা বলছিলাম। আপনি যদি কারও সাথে আপনার বন্ধুত্বের বিষয়টিকে ফলাও ভাবে প্রচার করতে চান, তাহলে আপনাকে সেই ‘বন্ধু’-র তরফ থেকেও কিছু সহযোগীতা পেতে হবে। কেননা এরকমটি যদি হয় যে একদিকে আপনি সেই বন্ধুত্বের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন আর অন্যদিকে সেই বন্ধু বিভিন্ন উপায় নানান গোলমাল পাকিয়ে তুলছে, তাহলে আপনার প্রচারের প্রতি মানুষের আস্থা এবং সাধারণ মানুষের কাছে সেই বন্ধুত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা, দুটোই বেশ ভিত্তিহীন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রনীতি বিগত বেশ কয়েক বছর যাবতই বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশী নাগরিকদের মৃত্যু তো এতদিনে সাধারণ বা প্রায় নগণ্য হয়ে গিয়েছে; গত এক বছরে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছে সাতশোর বেশী বাংলাদেশী নাগরিক। এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রগুলো যেমন সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণে ঔদ্ধত্য, ভারতে বাংলাদেশী পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধা, বাংলাদেশী টিভি চ্যানেল প্রচারের ক্ষেত্রে বাধা, ভারত থেকে চাল আমদানীর ক্ষেত্রে সীমান্তে বাধা, বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতীয় কূটনীতিকদের নগ্ন হস্তক্ষেপ, কূটনীতিকদের অভব্য আচরণ ইত্যাদি নানা কারণে ভারতকে বন্ধু হিসেবে ভাবা যাচ্ছিল না। বিশেষ একজন কূটনীতিকের অভব্য আচরণই যে তার দেশের ঔদ্ধত্যের পরিচায়ক তা নয়। তবে ঐ আচরণের ব্যাপারে দু’দেশের গণমাধ্যমেই একাধিকবার সমালোচনা হওয়া সত্ত্বেও এবং এ ব্যাপারে সেদেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও যখন কোন ইতিবাচক পরিবর্তন নজরে পড়ে না, তখন সুসম্পর্ক রক্ষায় সেই দেশের অনীহা সম্পর্কে আর সন্দেহের অবকাশ থাকেনা। তবুও আশা করা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যাকে ব্যাক্তিগত ও রাজনৈতিক দু’দিক থেকেই ভারতের ঐতিহ্যগত মিত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তার জানুয়ারি ২০১০-এর ভারত সফরের পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হবে। এমন কি তিনি সফর সেরে দেশে ফিরে বলেওছিলেন যে তার সফর শতকরা একশত ভাগ সফল হয়েছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্মশীল নেতৃবৃন্দ ও দেশের বিপুল সংখ্যক বুদ্ধিজীবিরাও সফরের সাফল্য নিয়ে এতটাই শোরগোল পাকিয়ে তুলেছিলেন যে সফরের ঠিক আগের সপ্তাহেও যে বাংলাদেশী নাগরিক বিএসএফ কর্তৃক অপহৃত হয়ে বর্বরতম নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর সীমান্তের এপারে ফেরত এসেছেন, তিনিও বোধ হয় ধন্ধে পড়ে যান যে তাহলে সম্পর্ক কি আসলেই ভালো, তার উপর ঘটা নির্যাতন কি শুধুই তার কল্পনা ও অলীক?

বিএসএফের হাতে নির্যাতিত সেই ব্যাক্তির অমন ধন্ধ ঘটলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কিছু পরিবর্তিত বৈদেশিক নীতি সেই ধন্ধ কাটিয়ে উঠবার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১০ তারিখে ভারতীয় সময় বিকাল ৪টা ১২ মিনিটে ভারতের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংস্থা প্রেস ইনফর্মেশন ব্যুরো (পিআইবি) প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “As per the revised procedure, while the Ministry of Home Affairs (Foreigners Division) grants in-principle approval for holding the event, security clearance for grant of Conference Visa is required from this Ministry only in respect of participants from Afghanistan, Bangladesh, China, Iran, Iraq, Pakistan, Sri Lanka & Sudan and in respect of foreigners of Pak origin and Stateless persons.”

পিআইবির প্রজ্ঞাপন

সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞপ্তিটি হচ্ছে, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন আছে এরকম কোন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সে দেশে যেতে চাইলে কনফারেন্স ভিসা অনুমোদনের ক্ষেত্রে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, চীন, ইরান, ইরাক, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও সুদানের নাগরিকগণ এবং কোন দেশের নাগরিক নন এমন ব্যাক্তিদের বিশেষ নিরাপত্তা ছাড়পত্র থাকা আবশ্যক যা যাচাই বাছাইর পর ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রদান করবে।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার সফর শেষে যে ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের জয়জয়কার করেছেন এবং সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার ব্যাপারে তার যে শতভাগ সাফল্য দাবী করেছেন, সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের এই পরিবর্তিত নীতিকে একটু খতিয়ে দেখা যাক।

বাংলাদেশের সাথে ঐ তালিকার বাকি যে সাতটি দেশের উল্লেখ আছে, তার কোনটির সাথেই ভারতের কোন সুসম্পর্কের কথা ইতিহাস বলে না। সুসম্পর্ক তো সুদূর পরাহত, ঐখানকার একাধিক দেশের সাথে তারা একাধিক বার যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে।

ধরা যাক চীনের কথা। চীনের সাথে ভারতের রয়েছে ঐতিহ্যগত বৈরী সম্পর্ক, যার শুরু মূলত ১৯৬২ সালের সিনো-ইন্ডিয়ান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে, মূলত দক্ষিণ তিব্বত ও অরুণাচল প্রদেশের অধিকার বিষয়ক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। পাকিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্কও সবার জানা। ওদিকে ইরানের সাথে ভারতের বর্তমান পরম মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের তিক্ততম সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে, এবং ভারতের মত অন্যান্য বন্ধুরাও সেই তিক্ততা বজায় রাখছে বা রাখতে যুক্তরাষ্ট্র প্রভাবিত করছে। আফগানিস্তান, ইরাক, বিশেষ করে সুদানের ক্ষেত্রে একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। আশির দশকে ‘র’-এর পৃষ্ঠপোষকতায় ও ভারতীয় সেনা বাহিনীর প্রশিক্ষণে গড়ে ওঠা এলটিটিইকে নিশ্চিহ্ন করে নিজেদের সার্বভৌমত্বকে সমুন্নত রেখেছে শ্রীলংকা, তাও আবার চীনের পরোক্ষ বাণিজ্যিক ও সামরিক সহায়তা নিয়ে, অতএব শ্রীলংকাকেও ভারত কেন বন্ধু ভাবছেনা সেটাও কম বেশী স্পষ্ট; অন্তত মাহিন্দা রাজাপাকসের শাসনামলে তো নয়ই।

কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো বলছিলেন ভারতের সাথে আমাদের আর কোন সমস্যা নেই, তাই না? যদি ধরেও নেয়া হয় যে পূর্ববর্তী কোন ভারত-বিমূখ সরকারের দৌরাত্ন্যে ভারত বাংলাদেশের ব্যাপারে বৈরী মনোভাব পোষণ করেছে, তাও তো সেসব বৈরীতা চুকেবুকে যাওয়ার কথা যদি আমরা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর শতভাগ সাফল্যের দাবীকে অর্ধভাগ সত্য বলেও ধরে নেই। তাহলে আর সমস্যা কি রইল? আমরা ভারত সরকারের সেই বিশেষ তালিকায় কেন যে তালিকার বাকি সব দেশের সাথেই তাদের ঐতিহ্যগত বা কূটনৈতিক বৈরীতা রয়েছে?

আমি যখন এই নিবন্ধটি লিখছি, ঠিক সেই মুহুর্তে সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্তে বিএসএফের একটি ইউনিট বাংলাদেশী অংশে অনুপ্রবেশ করেছে বলে খবর পাওয়া গেল। পরে জানা যায় ঐ বিএসএফ ইউনিটটি একটি বিল দখলের উদ্দেশ্যে হানা দিয়েছিল। ঐ ধরণের হানা ঐ অঞ্চলে তারা আগেও দিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই একাধিকবার দিয়েছে। তো, গুলি করে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা ও অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশী অংশে অনুপ্রবেশ করা, বিএসএফের এই কুকর্মগুলোকে সোজা ভাষায় আগ্রাসন হিসেবে চিহ্নিত করলে আশা করি তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভারতবিরোধী অপপ্রচার হিসেবে গণ্য হবে না। তো, এই আগ্রাসনই বা কেন দেখতে হচ্ছে? আমাদের প্রশ্ন তো খুব বেশী নয়, খুব দীর্ঘও নয়। আমরা শুধু জানতে চাইছি, প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের গণ্যমান্য অনেকেই যে বন্ধুত্বের ব্যাপারে আমাদের সবক দিয়ে যাচ্ছেন, বিএসএফের আচরণ, সদ্য পরিবর্তিত ভিসা অনুমোদন নীতিমালা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সেই বন্ধুত্বের অস্তিত্ব কোথায়? আদৌ আছে কি?

“…আমি যখন এই নিবন্ধটি লিখছি, ঠিক সেই মুহুর্তে সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্তে বিএসএফের একটি ইউনিট বাংলাদেশী অংশে অনুপ্রবেশ করেছে বলে খবর পাওয়া গেল …”। সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্ত বিএসএফের অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে এক বিএসএফ সদস্যের সাথে তর্কে লিপ্ত বিডিআরের জওয়ান।

প্রধানমন্ত্রী জানুয়ারি ২০১০-এর ভারত সফর সেরে দেশে ফিরবার পর অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই হামলে পড়েছিলেন এই বলে যে, অন্ধ ভাবে ভারতকে দুষে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার দিন শেষ হয়ে গিয়েছে; ভারতের সাথে আওয়ামী লীগের সম্পর্কের বিষয় চাঁছাছোলা মন্তব্য করে আওয়ামী লীগকে কোণঠাসা করার কৌশল পুরোন হয়ে গিয়েছে। ভারতের ব্যাপারে যেকোন নেতিবাচক মন্তব্য মানে দেশবিরোধী অপপ্রচার, এমন কথাও বলা হয়েছে। এখন এমন একটি প্রশ্ন যদি তোলা হয়, যে, ভারতের সাথে বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও উভয়পক্ষের জন্য কল্যাণকর যে সম্পর্কের কথা তারা বলছেন, সেই সম্পর্ক যদি এতই সত্য হয়ে থাকে, তবে কনফারেন্স ভিসার পথে কাঁটা বিছিয়ে বাংলাদেশের কোন নাগরিকের জন্য সে দেশে গিয়ে স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে ভারত বাধা সৃষ্টি করছে কেন, এই প্রশ্নের জবাব কী হবে? বিশেষ নিরাপত্তা ছাড়পত্রের নেপথ্য অর্থ কী তা কি আমাদের বোধগম্য নয়? যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গাটছড়া বেঁধে ভারত যে যুক্তরাষ্ট্রের নব্য সংরক্ষণবাদীদের উদ্ভাবন ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি’, ‘টেরোরিজ্‌ম’ ইত্যাদি শব্দের অপসংজ্ঞাগুলো হৃদয়ঙ্গম করেছে ও অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রতর প্রতিবেশী বাংলাদেশের উপর সেসব কৌশল প্রয়োগ করছে, তা কি প্রতীয়মান হয় না?

আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীর জয়জয়কারের পাঁচ সপ্তাহ না পেরুতেই এই যে ভারত তাদের ঐতিহ্যগত ও জিওপলিটিকাল প্রতিদ্বন্দ্বীদের তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করল, প্রধানমন্ত্রীর কাছে বা এর কী ব্যাখ্যা আছে? তার এত জল্পনাময় কল্পনাময় সফরে তিনি বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশী নাগরিকদের মৃত্যুর প্রসঙ্গটিই বা একবারও তুললেন না কেন, এই জবাবই বা কে দিবে?

Advertisements