মুহম্মদ তাওসিফ সালাম

২৯ এপ্রিল, ২০১১

http://starazzobd.files.wordpress.com/2011/04/sahara-khatun-450px.jpg

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন

গত বছরের শেষে একটি লেখায় গণধোলাইয়ের পুনর্বিস্তার প্রসঙ্গে আশংকা প্রকাশ করেছিলাম। হতে পারে কাকতালীয়, তবে ২০১০-এর নভেম্বার-ডিসেম্বারে সারা দেশে গণধোলাইয়ে অপরাধী বা অভিযুক্তের মৃত্যুর এতগুলো ঘটনা ঘটেছিল যে আশংকা প্রকাশ না করে উপায় ছিল না।

সম্প্রতি কক্সবাজারে গণধোলাইয়ের শিকার হয়েছে ডাকাত হিসেবে অভিযুক্ত ১০ ব্যাক্তি। ডাকাতির বেশ বড় আয়োজনের জবাবে এলাকাবাসী আর পুলিশের আক্রমণ যৌথ ভাবে হলেও শেষমেষ সংঘর্ষটি ত্রিমুখী হয়ে পড়ে, যার শিকার ঐ দশজন ছাড়াও হয়েছে গ্রামের একটি নিরীহ যুবক। আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক গ্রামবাসী, অর্ধশতাধিক পুলিশ।

পত্রিকার ভেতরের পাতায় ছাপা হওয়া বিশ্লেষণগুলো বাদ দিলে, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় মূলত দুই ধরণের খবর চোখে পড়ে। প্রথম ধরণটি মৌলিক, এতে শুধু রয়েছে সারা দেশে ঘটা রোমহর্ষক সব অপরাধের ঘটনা। এর বিশ্লেষণ বা উদাহরণে যাব না, কারণ লক্ষ্য করেছি নৃশংসতার খবর পত্রিকায় গুরুত্বের সাথে প্রথম পাতাতে আসলেও বিভিন্ন বয়সের অনেকেই সেসব পড়তে বা এ সংক্রান্ত ছবি দেখতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। ইদানিং অবশ্য দেখি কয়েকটি পত্রিকা, যেগুলো কয়েক বছর আগেও অপরাধের বিস্তারের খবরগুলোকে প্রাধান্য দিতে, তারা এখন আর সেসব খবরকে সর্বাগ্রে তুলে ধরার আগ্রহ বোধ করে না। কেন কে জানে।

দ্বিতীয় যে ধরণের খবর আসে, সেগুলোই মূলত হচ্ছে নৈরাশ্যজনক এবং ক্ষতিকারক। এ খবরগুলোতে থাকে আমাদের মন্ত্রী ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতনদের বক্তব্য, যারা বিভিন্ন সভা-সমিতিতে অংশ নিয়ে নিরন্তর বলে যান দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি ওমুক বছরের চেয়ে ভালো, তমুক আমলের তুলনায় মানুষ কম মরছে ইত্যাদি।

এসব দায়িত্মজ্ঞানহীন বক্তব্যের প্রচুর নিন্দা পথেঘাটে হয়ে থাকে। ঢালাও নিন্দায় তা যাচ্ছি না। কয়েকটি ফলাফল ও পরিণতির কথা বলতে চাই।

দেশের সাধারণ মানুষ জানেন আর না-ই জানেন, কিংবা যা-ই জানেন, সরকার নিয়ন্ত্রিত যে কয়েকটি দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা তুলনামূলক ভাবে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম ও ঝুঁকির কাজ করেন, তার মাঝে অন্যতম হচ্ছে আইন-শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী, অর্থাৎ পুলিশ ও র‌্যাব। অপরাধ বিষয়ক অনেক সিনেমা-নাটক আমরা দেখি। বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী একাধিক উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে অপরাধ জগত। আমাদের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী কাঠামোয় প্রতিনিয়তি নিয়মতান্ত্রিক ভাবে যেসব অপরাধের রহস্য উদঘাটিত হয়, তার প্রক্রিয়া নিয়ে সেরকম অনেক সিনেমা, নাটক ও উপন্যাস তৈরি করা সম্ভব।

পুলিশ ও র‌্যাবকে কাজের পুরো প্রক্রিয়াটিই ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের শত্রু মানেই হচ্ছে অস্ত্রধারী ভয়ংকর অপরাধী। র‌্যাব-পুলিশকে প্রতিনিয়ত এই অপরাধীদের মুখোমুখি হতে হয়। অপরাধের খবর পেতে ও অপরাধীকে ধরতে তাদেরকে বিপজ্জনক জগতে প্রবেশ করতে হয়, প্রত্যক্ষ পরোক্ষ ভাবে যোগাযোগ করতে হয় বিপজ্জনক মানুষদের সাথে। সেখানে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে প্রয়োগ করতে হয় নানান কৌশল, চাতুর্য ও বুদ্ধিমত্তা। পত্রিকায় অপরাধের খবরগুলো আসে এবং এটা স্বাভাবিক যে পুলিশ এগুলোকে সংঘটিত হওয়া থেকে আটকাতে পারেনি বলেই অপরাধগুলো হয়েছে। কিন্তু কত শত-হাজার অপরাধ সংঘটন যে তারা প্রতিদিন প্রতিরোধ করছে, তা আমরা জানি না, কেননা তার অনেকটুকুই পত্রিকায় ছাপা হয় না। কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়া হয়তো কেউ জানেনই না অনেক ঘটনার ব্যাপারে।

প্রচন্ড ঝুঁকির মাঝে সরকারী দায়িত্ম পালনের ফলে র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরা তাদের জীবনযাত্রাকেও ঝামেলামুক্ত রাখতে পারেন না। তীব্র মানসিক পরিশ্রমের খুব সুস্পষ্ট প্রভাব পড়ে তাদের পরিবারের উপরেও। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী কাঠামোর বিভিন্ন পর্যায়ে যারা নিয়োগ পান, তারা আর দশটি সাধারণ পরিবার থেকেই এসেছেন। বিভিন্ন পরীক্ষায় পাস করে তারা বাহিনীতে যোগ দেন। কিন্তু যোগ দেয়ার পর সেই জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক বলার আর কোন সুযোগ থাকে না। আর দায়িত্ম পালন করতে গিয়ে ঝুটঝামেলার শিকার হওয়া তো আছেই। কক্সবাজারের ঐ ঘটনাতেই আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক পুলিশ, যার মধ্যে ২৬ জন ডাকাতদের এলোপাতাড়ি ফায়ারিং-এর ফলে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থতা ও অন্যান্য কারণে সরকারের প্রতি তীব্র জনবিক্ষোভের প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলান পুলিশ সদস্যরা। যেমন মুন্সীগঞ্জের বিস্তীর্ণ জলাভূমি অধিগ্রহণ করে বিমানবন্দর নির্মাণের যে সিদ্ধান্ত বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার গ্রহণ করেছিল, তার দ্বারা ক্ষুদ্ধ মুন্সীগঞ্জবাসীর প্রায় পুরোটা রাগই মিটেছিল পুলিশের উপর। স্থানীয় থানার একজন উপপরিদর্শক গণধোলাইয়ে মারা যান, আহত হন প্রায় দুইশতাধিক পুলিশ, যাদের কেউ কেউ এখনও রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যেসব কষ্টসাধনের কথা বলা হল, তার জবাবে বিতর্কে উৎসাহী কেউ এ কথা বলতে পারেন যে তারা সুবিধাও পাচ্ছে অনেক। কর্মকর্তারা পরিবারসহ সরকারী বাসভবনে থাকতে পারছেন, সাধারণ সদস্যদের জন্যও রয়েছে ব্যারাক। এ সকল সুবিধা সত্ত্বেও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত জনসংখ্যার ফলে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যে তাদের নিজেদের কর্মক্ষমতার বেশি শ্রম দিতে হয়, সে বিষয়ে কোন তর্ক চলে না। এই সেদিনও দেখলাম রাজারবাগ পুলিশ লাইনে মহিলা পুলিশদের হোস্টেলের একটি পুরো ফ্লোরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে। এমনিতেই লোডশেডিং-এর যন্ত্রণায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কঠিন, তার উপর সেখানে বিদ্যুৎ থেকেও নেই। সেই হোস্টেলের বাসিন্দা মহিলা পুলিশ সদস্যরা নিশ্চয়ই আরামে দিন কাটান না। পরিশ্রমের ডিউটির পর নির্দ্দিষ্ট সময়ে অপ্রতুল বিশ্রামের জন্য যে হোস্টেলে তারা ফিরে আসেন, সেখানেও তারা শান্তি পাচ্ছেন না।

এই পরিস্থিতিতে, অপরাধ হচ্ছে না বা আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি ভালো, এসব বক্তব্য দিয়ে আমাদের মন্ত্রীরা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিশ্রমী সদস্যদেরই অবমাননা করেন। দেশের মানুষ যখন দেখে মহামারীর আকারে সর্বত্র খুন-খারাপি হচ্ছে, তখন মন্ত্রীদের এসব বক্তব্যের ফলে মানুষের ক্ষোভ শুধু মন্ত্রীদের উপর নয়, পুরো ব্যবস্থার উপর গিয়ে জমা হয়, যার ফল মন্ত্রীদের চেয়ে ঐ সদস্যদেরকেই বেশি ভোগ করতে হয়। কেননা মন্ত্রীদের এসব পাতি বক্তব্যের ফলে মানুষ আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপর আস্থা হারায়, যার ফলে ওসব গণধোলাইয়ের ঘটনা বেড়ে যায়। এমন কি ক্রসফায়ারে হত্যাকান্ড ঘটলেও তাতে বাহবা দেয়ার লোকের অভাব হয় না, কেননা তাদের উপায় নেই।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী গত মার্চ মাসে একটি সভায় বক্তৃতার সময়ে আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, যে বাড়ির লোক খুন হয়েছে সে বাড়িতে গিয়ে এনারা বলেন দেশে নাকি অপরাধ নাই। মানসিক সুস্থতার ব্যাপারটিতে কোন মতামত বা সমর্থন জানাতে যাব না, কেননা এটি নির্ধারণ করবেন ডাক্তাররা, যা কাদের সিদ্দিকী নন বা নই আমিও। তবে এটা বুঝতে পারি যে মন্ত্রীদের ঐসব কথাবার্তা স্বাভাবিক নয়। কেউ কেউ বলেন, এসব হচ্ছে রাজনৈতিক বক্তব্য। রাজনৈতিক বক্তব্য মানে কি? যে বাড়ির লোক খুন হয়, সে বাড়িতে গিয়ে অপরাধ নেই দাবী করার মানে তো মিথ্যাচার। রাজনৈতিক বক্তব্য মানে কি শুধুই মিথ্যাচার?

সেদিন কয়েকজন সাংবাদিক হালকা মেজাজে একজন আরেকজনকে বলছিলেন, পত্রিকায় যেসব জনমত জরিপ হয়, সেখানে একদিনন ‘চিহ্নিত সন্ত্রাসীর ক্রসফায়ারে মৃত্যু বা গ্রামবাসীর হাতে গণধোলাইয়ে ডাকাতের মৃত্যু সমর্থন করেন কি’, এ জাতীয় প্রশ্ন রেখে দেখা যেতে পারে। কোন সন্দেহ নাই যে ফলাফল দেখে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চোখ কপালে উঠবে।

কথাটি ভুল নয়। চিহ্নিত সন্ত্রাসীর ক্রসফায়ারে মৃত্যু হলে প্রকৃতপক্ষেই সেই সন্ত্রাসীর বিচরণক্ষেত্র এলাকার বাসিন্দারা মোটেই কোন আক্ষেপ করেন না, বরং ক্রসফায়ারকে বাহবা দেন। গ্রামবাসীর হাতে ডাকাতে মৃত্যুর ক্ষেত্রেও বাস্তবতা অনুরূপ। কক্সবাজারে রবিবারের ঐ ঘটনায় গ্রামবাসী ডাকাতদের মেরেছে সারা দিন ব্যাপী। প্রথম দফায় দু’জনকে পেয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। বাকিরা পালিয়ে গিয়েছিল পাহাড়ের দিকে। গ্রামবাসী রীতিমত সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে সে পাহাড়কে প্রথম ঘেরাও করেছে, তারপর একেক দফায় অভিযান চালিয়ে দুই দফায় ৪ জন করে আরও ৮ জনকে মেরেছে। দিনশেষে তাদের হাতে নিহত ডাকাতদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০-এ। এরকম কেন হল? হয়েছে কারণ আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপর থেকে মানুষ আস্থা হারাচ্ছে।

আস্থার এই বিলুপ্তির কারণ শুধু বাহিনীর ব্যর্থতা নয়। এর জন্য মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতনদের দায়িত্মজ্ঞানহীনতাও দায়ী। যখন দেখা যায় ১৯৯৯ সালের মালিবাগ হত্যাকান্ড ও যুবলীগ নেতা ইব্রাহীম হত্যাকান্ড থেকে অপর যুবলীগ নেতা ও এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন ভোজবাজির মত অব্যাহতি পেয়ে যান, নাটোরে ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত ১৯ আসামী খালাস পাওয়া মাত্র ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী তাদেরকে উজ্জ্বলবর্ণ গাঁদাফুলের মালা পড়িয়ে বরণ করেন, তখন মানুষের মনে হয় অপরাধীকে হাতে পেলে আর ছাড়াছাড়ি নেই। এর ফলে বিচার ব্যবস্থা ঘটনার নাগাল পাবার আগেই শেষ হয়ে যায় অনেক মানুষের প্রাণ, যাদের সংশ্লিষ্টতা বা দায়িত্ম আদৌ কদ্দূর ছিল, তা আর জানা যায় না।

দুঃখের সাথে বলতে হয়, বড় দায়িত্ম পাবার পর আমাদের কর্তাব্যাক্তিরা ক্রমশ জনবিচ্ছিন্ন হতে থাকেন বলেই ওভাবে বলতে পারেন। এখনকার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে একটি বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা যখন মাইক্রোফোনের সামনে বলেন যে আইন-শৃংখলার অবস্থা ভালো, তখন তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কনিষ্ঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার সাথে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে তারা কতটা একমত।

লিমনের প্রসঙ্গ দিয়ে শেষ করব। এই লিমনের ঘটনাটি মিডিয়ার মনযোগ পেয়েছে। কিন্তু মনযোগ পায়নি এমন দুটো ঘটনাও এর আগে ঘটেছে। একটির শিকার ছিল তরুণ মডেল কায়সার মাহমুদ বাপ্পি, আরেকটির শিকার ছিল অ্যাপোলো হসপিটালের তরুণ কর্মী মহিউদ্দীন আরিফ। বাপ্পি মারা গিয়েছে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে চালানো অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে। আর আরিফ মারা গিয়েছে র‌্যাব সদস্যদের নির্যাতনে। লিমনের ঘটনাটি এখনও পরিণতির অপেক্ষায় আছে। তবে বাকি দুটো ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্তই বলছে র‌্যাব সদস্যরা দোষী।

তিনটি ক্ষেত্রেই র‌্যাব বা পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের সদস্যদের পক্ষে সাফাই গাওয়া হয়েছে। এই সাফাই গাওয়া বন্ধ হোক। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রই হচ্ছে ভালো ও মন্দের সংমিশ্রণ। ভাবার কোন কারণ নাই যে পুলিশ বা র‌্যাবে কোন মন্দ থাকবে না। সেই মন্দরা থাকবে, তারা অপকর্ম করবে। সবগুলো অভিযোগকে আমরা অপকর্ম হিসেবেই বা ধরব কেন? দক্ষ লোকদেরও কি তো ভুল হতে পারে না? এটা অনাকাংখিত ঠিকই, কিন্তু অবাস্তব বা অসম্ভব নয়। এই মন্দদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার কোন কারণ থাকতে পারে না। অতএব প্রত্যেকটি বাহিনীতে দুষ্টুকর্ম সাধনকারীদেরকে চিহ্নিত করে তাদের কৃতকর্মকে তদন্তের আওতায় আনা হোক। একটি বা দুটি মানুষের ভুলকে কোন কর্মকর্তা অস্বীকার করলে তার পুরো বাহিনীটি কলংকিত হয়। সেই বাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতা কমে এবং এতে কাজ করতে থাকা সৎ ও পরিশ্রমী কর্মীদের মর্যাদা হানি হয়। সাধারণ মানুষের মাঝে র‌্যাবের যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা অবশিষ্ট আছে। লিমনের ঘটনার সুষ্ঠু সুরাহা না হলে এমন ঘটনা আরও ঘটবে, যার ফলে র‌্যাবের গ্রহণযোগ্যতা কমবে, আর সেটা যে দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির জন্য কত ভয়াবহ একটা সংকেত হয়ে দাঁড়াবে, তা আমাদের কেউ কেউ হয়তো উপলব্ধি করছি না।

২৯ এপ্রিল তারিখে বাংলাদেশ ফার্স্টে প্রকাশিত

মুহম্মদ তাওসিফ সালাম

২৬ এপ্রিল, ২০১১

http://shatil.files.wordpress.com/2011/04/mufti-amini-and-maulana-abul-hasnat.jpg

হরতালে একপক্ষ বা দুটো পক্ষের জন্য না হলেও, গত ৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির হরতালটিতে সাধারণ মানুষের জন্য বেশ কয়েকটি চমক ছিল। হরতালের আহবানকারী দল বা গোষ্ঠী দেশের প্রধান দুটো দলের একটি না হলেও (একটির সাথে জোটবদ্ধ), হরতাল দেখে অনেক ক্ষেত্রেই তা বোঝার উপায় ছিল না।

হরতাল হয়ে যাবার পর স্বাভাবিক ভাবে যা হয়- সরকার দাবী করেছে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক ছিল, হরতাল পালনকারীরা দাবী করেছে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়েছে। কিন্তু দেশের প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমগুলো হরতালের সফলতা-ব্যার্থতার পাশাপাশি একটি ভিন্ন বিষয়ের উপর আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল। ভিন্ন বিষয়টি ছিল- মাদ্রাসার কোমলমতি ছাত্রদের হরতালের পক্ষে পথে নামতে বাধ্য করা।

প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক, উভয় মিডিয়াতেই হরতালের বেশ কয়েকটি দৃশ্যপট তুলে এনে সেখানে কিশোরদের উপস্থিতির বিষয়টি স্পষ্ট করে দেখাবার চেষ্টা করা হয়। একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেল আটককৃত কয়েকজন মাদ্রাসা ছাত্রের বক্তব্যও প্রচার করে, যেখানে তারা বলছে যে শিক্ষকরা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদেরকে পথে নামিয়েছে।

যেকোন ধরণের সাধারণ কর্মসূচী, সেটি রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক, আন্দোলনভিত্তিক বা সংবর্ধনামূলক যাই হোক না কেন, শুধু শিশুদেরই নয়, কাউকেই সেখানে যোগ দিতে বাধ্য করার বিষয়টিকে সমর্থন করা যায় না। সব সরকারের আমলেই কোন উচ্চপদস্থ মন্ত্রী বা রাজনীতিকের আগমন উপলক্ষে স্কুল কলেজের শতশত ছাত্রছাত্রীকে রোদ-বৃষ্টির মাঝে রাস্তার দু’ধারে দাঁড় করিয়ে রাখার সংস্কৃতিটি দেখা যায়, যা খুবই দরিদ্র মানসিকতার পরিচায়ক।

এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতিতে জড়িত বৃহত্তর ব্যাক্তিবর্গের মানসিক গঠনের একটি আভাস পাওয়া যেতে পারে। যদিও কোন মন্ত্রী নিশ্চয়ই ফোন করে বলেন না যে আমি আসব, হাজার হাজার ছেলেমেয়ে জোগাড় কর, সাধারণত অতি উৎসাহী সরকারী কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনীতিকদের উদ্যোগেই এ কাজগুলো হয়ে থাকে, তবুও মূল উপলক্ষ ব্যাক্তিটি, তিনি কোন মন্ত্রী কিংবা আমিনী যেই হোন না কেন, দায়িত্ম এড়াতে পারেন না। তিনি যদি নিজে উদ্যোগ নিয়ে সেই শিশুসমাগম না থামান, তবে বুঝতে হবে মুখ ফুটে না বললেও তিনি বিষয়টি সমর্থন করছেন, যা দুঃখজনক।

মাদ্রাসা ছাত্রদেরকে লাঠি তুলতে বাধ্য করার ফলে যারা ব্যাথিত হয়েছেন ও এর প্রমাণ দেখাবার জন্য সচেষ্ট হয়েছেন, তারা গণমাধ্যমের দায়িত্মশীল অংশবিশেষ, সন্দেহ নেই।

কিন্তু বাংলাদেশে, এটা কি শুধু ইদানিংই ঘটছে নাকি আগে থেকেই ছিল স্পষ্ট করে বলতে পারছি না, একটা খুবই ন্যাক্কারজনক ব্যাপার হল, কোন বিষয়ে আমরা উদ্বিগ্ন হব আর কোন বিষয়ে হব না, এই বিষয়গুলো নির্বাচনের ব্যাপারে আমরা অতি সূক্ষ্ম বাঁছবিচারের আশ্রয় নেই। যেমন, জোরপূর্বক শিশুসমাগম যাকে ব্যাথিত করেছে, অন্তত যে গণমাধ্যমগুলো এ ব্যাপারে সরব হয়েছে, তাদের কর্মকান্ডের উপর গভীর মনোনিবেশ করে দেখা গেল, ঐ কর্মসূচীর সাথে সম্পৃক্ত একজন ব্যাক্তি, মাওলানা ফজলুল হক আমিনী, তার একটি জলজ্যান্ত পুত্রসন্তান, নাম মাওলানা হাসনাত, হরতালের কয়েকদিন পরেই সে গায়েব হয়ে গেল কিন্তু সেই গণমাধ্যমগুলো এই প্রসঙ্গে কোন বিশ্লেষণের ধারই ধারছে না।’

এ মাসের ১০ তারিখ গত রোববার, ব্যবহার্য গাড়ি মেরামতের উদ্দেশ্যে আমিনীপুত্র মাওলানা হাসনাত দু’জন সহযোগীকে নিয়ে ধোলাইখালে যান। বেলা এগারোটার দিকে তারা টিপু সুলতান রোডে দিল্লী সুইটমিটস নামক দোকানে দাঁড়িয়ে হালকা খাবার খাচ্ছিলেন। এ সময়ে একটি মাইক্রোবাস দোকানের সামনে এসে থামলে তা থেকে অন্তত ছয়জন সশস্ত্র ব্যাক্তি নেমে এসে মাওলানা হাসনাতের কাছে নিজেদেরকে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোক বলে পরিচয় দেন এবং তাকে মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। এ সময়ে সঙ্গে থাকা দু’জন হাসনাতকে কোথায় ও কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনগুলো কেড়ে নেয়া হয় এবং সশস্ত্র ব্যাক্তিবর্গ মাইক্রোবাসে করে মাওলানা হাসনাতকে নিয়ে স্থানত্যাগ করেন।

ঘটনার ১২ দিন পর গত ২৩ এপ্রিল শনিবার মাওলানা হাসনাতকে রাজধানীর বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের পাশ থেকে হাত, মুখ ও চোখ বাঁধা ও অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। ভোরে ঐ অঞ্চলের স্থানীয়রা তাকে দেখে তার হাত, মুখ ও চোখ খুলে দিলে তিনি পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেন। উল্লেখ্য তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি অন্তর্ধানের মুহুর্ত থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছিল। মুক্ত হওয়ার পর নিজের ক্যাপ্টরদের সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট ভাবে কিছু জানাতে পারেননি, কেননা আটকের পর থেকেই তার চোখ বাঁধা ছিল। তবে ক্যাপ্টরদের সাথে তার কথাবার্তা হয়েছে। ক্যাপ্টররাই বলেছেন বেশি। বারবার বলা হয়েছে যেন তার বাবা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচী বর্জন করেন। আন্দোলন থেকে সরে না দাঁড়ালে মেরে ফেলার ভয়ও দেখানো হয়।

হাসনাত জানিয়েছেন তিনি নিশ্চিত তার ক্যাপ্টররা ছিল সরকারের কোন বাহিনীর লোক। এর পালটা বক্তব্যও আছে অবশ্য। হাসনাতের অন্তর্ধানের পর যখন তার পরিবার সহ বহু মানুষ ও সংগঠন দাবী করছিল অতীতের একাধিক ঘটনার মত হাসনাতকেও এই সরকারই আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে গুম করেছে, তখন ঢাকায় আইন-শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত একাধিক বাহিনীর কর্তাব্যাক্তিরা বিষয়টি মুহুর্মুহ অস্বীকার করেছেন।

বর্তমান সরকার দায়িত্ম গ্রহণের পর জলজ্যান্ত মানুষের গায়েব যাওয়ার ঘটনা এটা প্রথম তো নয়ই, এটা যে আসলে কততম ঘটনা তা নিরূপণ করা এই পরিস্থিতিতে বেশ কঠিন। তবে আলোচিত ঘটনাগুলোর মাঝে রয়েছে ঢাকার নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলার ও বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম অন্তর্ধান রহস্য। এই চৌধুরী আলমকে গত বছর বিএনপির ডাকা একটি হরতালের আগের দিন রাজধানীর বেইলী রোড থেকে একই ভাবে মাইক্রোবাস যোগে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তারও কোন খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি। সরকারের হাতে আটক বিএনপি নেতা সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরী জানান যে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে তারও চৌধুরী আলমের মত পরিণতি হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। ঐ জিজ্ঞাসাবাদে চৌধুরী আলমের পরিণতি সম্পর্কে তাকে জানানো হয়, হত্যার পর পেট কেটে নাড়িভুড়ি বের করে তাকে নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের পর সাক্ষাতকালে সালাহউদ্দীন তার আইনজীবি, সাংবাদিক ও আত্মীয়স্বজনদের এই তথ্য দেন।

আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার বিষয় বাঁছাবিচার প্রসঙ্গে যা বলছিলাম, জলজ্যান্ত এই মানুষগুলো উধাও হয়ে যাচ্ছে, আলোচিত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে তাদেরকে পাওয়াই যাচ্ছে না, অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত ঘটনাগুলোতে তাদেরকে পাওয়া যাচ্ছে তুরাগ নদীর পাড়ে বালিতে পোতা অবস্থায় কিংবা নারায়ণগঞ্জের কোন এক ডোবায় হাত পেছনে বাঁধা ও গলা কাটা অবস্থায় আর হাসনাতের মত কতিপয় অত্যন্ত সৌভাগ্যবানদের হাত, মুখ, চোখ বাঁধা অবস্থায় এখানে সেখানে ফেলে যাওয়া হচ্ছে, এই ঘটনাগুলো ঐ সংবাদমাধ্যমগুলোতে কর্মরতদের ছুঁয়ে যাচ্ছে না, তা হতে পারে না। সেসব সংবাদমাধ্যম, সেগুলোর রাজনৈতিক বিশ্বাস বা নীতিমালা যাই হোক না কেন, সেখানে তো আর নিশ্চয়ই কসাই ধরে এনে কলম মাইক্রোফোন হাতে ধরিয়ে বসিয়ে দেয়া হয় নি, অতএব যা ঘটছে সেগুলো তাদেরকে স্পর্শ করছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের জেনেও না জানা কারণে তারা সেগুলো নিয়ে কিছু বলছেন না, বা অন্যান্য অনেক কিছু বলে সেগুলো ধামাচাপা দিতে চাইছেন।

উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাঠক-দর্শক-অনুরাগী জুটিয়ে নেবার পর সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে জনমত গঠনে প্রভাব সৃষ্টি করার যে বহুলপ্রচলিত পদ্ধতিটি রয়েছে, সেই পদ্ধতিটি বহুলব্যবহারের ফলে দেশের গণমাধ্যম ও সাধারণ জনসাধারণের মাঝে খুব ধীরে হলেও একটি দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। যেভাবে সব চলছে, তাতে এই দূরত্ব কমবে না, বরং বাড়তে থাকবে।

সংবাদমাধ্যমের কর্তাব্যাক্তিরা নিজেদের ব্যাক্তিগত মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস বা দর্শনের প্রভাব বজায় রাখুন, তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু চারপাশে যা ঘটছে, সেগুলো তুলে ধরার ব্যাপারেও যদি রাজনৈতিক দর্শনের প্রয়োগ করে কোন ঘটনার প্রচারকে অতিরঞ্জন আবার কোন ঘটনার প্রচারকে বিবর্জন করা হয়, তাহলে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা যে ক্ষতির শিকার হবে, তা আখেরে গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর আঘাত হানবার পথকে সুগম করতে পারে।

মুহম্মদ তাওসিফ সালাম
১৬ এপ্রিল, ২০১১

বাংলাদেশে চাঞ্চল্যকর অর্থ কেলেঙ্কারিগুলোর সমালোচনায় রাজনীতির বেশ দৃশ্যমান উপস্থিতি থাকার ফলে ঠিক কি পরিমাণ টাকার জালিয়াতি হয়েছে, তা মুহুর্মুহ রাজনৈতিক বক্তব্য-পাল্টাবক্তব্যে হারিয়ে যায়। পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক কেলেংকারিতে প্রচারিত অর্থের পরিমাণ হাজার থেকে লক্ষ কোটির মাঝে ঘোরাফেরা করেছে। সম্প্রতি বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থর সংসদীয় বক্তব্যের ফলে ‘তিরিশ থেকে চল্লিশ হাজার কোটি’ সংখ্যাটি জাতীয় সংসদের রেকর্ডভুক্ত হয়েছে।

এটা বলা অপেক্ষা রাখে না যে যে অর্থ কেলেংকারিতে হাজার হাজার কোটি টাকা জড়িত, সেই কেলেংকারির নায়করাই হচ্ছে সে টাকাগুলোর প্রকৃত দখলকারী, যারা রাজনীতির সব হিসেব-নিকেষ বাদ দিলেও শুধু ঐ অর্থের জোরেই প্রচন্ড ক্ষমতাবান।

পুঁজিবাজারের কেলেংকারি তদন্তের আগপর্যন্ত বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সাবেক সরকারী ব্যাংকার ইব্রাহিম খালেদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোন প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু তদন্তের পর সেই প্রতিবেদন জমা দেয়া, প্রকাশ ও তাতে উল্লেখিত তথ্যকে ঘিরে একটি তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত হঠাৎ ঘোষণা দেন যে সেখানে দায়ী ব্যাক্তি হিসেবে কয়েকজনের নাম দেয়া আছে, যেগুলো এই সরকার প্রকাশ করবে না। প্রকাশ না করার কারণ হিসেবে অর্থমন্ত্রী, তিনি একটি গণতান্ত্রিক সরকারের ‘কারও প্রতি অনুরাগ বা ভয়ের বশবর্তী হয়ে কিছু না করা’-র শপথ নেয়া মন্ত্রী, তিনি দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে জানান, ঐ নামের লোকজন অনেক ক্ষমতাবান, তাই তাদের নাম বলা যাবে না।

এই প্রকাশ করা না করার প্রসঙ্গেই জন্ম নেয় বিতর্কের, যার ফলে দেশের সংবাদমাধ্যমের বেশ জবরদস্ত কিছু অংশীদার ইব্রাহিম খালেদের প্রতি সেই আচরণ করা শুরু করলেন, যেই আচরণ তারা কিছুদিন আগেই করেছিলেন ডক্টর ইউনুসের প্রতি।

সংবাদমাধ্যম এখন শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না। সংবাদমাধ্যম এখন কাগজ, টেলিভিশন, রেডিও ও কম্পিউটারের স্ক্রিন পর্যন্ত বিস্তৃত। এই উল্লেখিত মাধ্যমগুলোর প্রত্যেকটিই বাংলাদেশের কয়েকটি বহুল প্রচারিত সংবাদমাধ্যম রয়েছে। এই মাধ্যমগুলোতে যারা ডক্টর ইউনুসের প্রতি কিছুদিন আগে করা আচরণের ধরণগুলো মনে রেখেছেন, সেগুলোকে চোখের সামনে ভাসালে তারা বোধ করি সেই বিচারে তখনকার ইউনুস সাহেবের চেয়ারে এখনকার ইব্রাহিম খালেদ সাহেবকে বসাতে পারবেন। বেখাপ্পা লাগবে না।

পুঁজি বাজারে বিপুল পরিমাণ অর্থ জালিয়াতি হওয়ার পর এবং তার অংশীদার তেত্রিশ লক্ষ ব্যবসায়ীর প্রায় পথে বসবার দশা হওয়ার পর অনেক ঘটনা ঘটেছে ও ঘটছে। তবে মূল বা বেসিক ঘটনাটি ক্রমানুসারে হচ্ছে,

– একটি মহাপ্রতারণা করা হয়েছে। বহু মানুষ বহু বহু অর্থ বাজারে টেনে এনে সেগুলো গাপ করা হয়েছে। গাপ করেছে কয়েকজন মানুষ, যারা অর্থমন্ত্রীর ভাষ্যমতে এতই ক্ষমতাবান যে তাদের নাম নাকি তিনিই নিতে পারছেন না।

– সেগুলো তদন্ত করতে একজনকে বলা হয়েছিল, যেই তিনি তদন্ত প্রতিবেদনে কয়েকটি নাম ও কয়েকটি লাইন লিখলেন, ওমনি তার উপর শব্দবাণ নিক্ষিপ্ত হতে লাগল। যে নাইমুল ইসলাম খানকে কখনও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে অন্তত আমি দেখিনি, তিনিও এসে বললেন ইব্রাহিম খালেদের নাকি নীতির স্খলণ হয়েছে, ইব্রাহিম খালেদ নাকি দুর্নীতিবাজ। এই নাইমুল ইসলাম কিছুদিন আগে ডক্টর ইউনুসেরও একজন হঠাৎ গজিয়ে ওঠা সমালোচক ছিলেন।

– যে অর্থমন্ত্রী বললেন ক্ষমতাবানের নাম নেয়া যায় না, যে এমপি বললেন বিনিয়োগকারীরা সব ফটকা, যে অর্থ উপদেষ্টা বললেন বিনিয়োগকারীরা নাকি আদৌ সরকারের মাথাব্যাথাই না, তাদের বক্তব্য নিয়ে মিডিয়াকে বিন্দুমাত্র ভাবিত দেখা গেল না।

বাস্তবতা হচ্ছে, কোন বহুল আলোচিত ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ফলাও ভাবে যা প্রচারিত হয়, তা কোন কোন ক্ষেত্রে শুধু সেই ঘটনাটিরই ব্যাখ্যা নয়, বরং সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট হাজারটা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতার নির্যাস। বিশেষ করে কোন কোন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত কোন খবরের কয়েকটি লাইন পড়েই স্মরণ করতে হয় কে সেটির মালিক।

এই পরিস্থিতিতে একদল সংবাদ বিশ্লেষক সারাদিন মাথা কুটলেও কেউ বিশ্বাস করবেন না যে ইব্রাহিম খালেদ দুর্নীতি করে এখানে জলঘোলা করেছেন। বিশ্বাস করবেন না এই কারণে নয় যে সবাই ইব্রাহিম খালেদকে খুব ভালো জানেন। বিশ্বাস করবেন না এই কারণে যে- হঠাৎ করেই একজন নির্দ্দিষ্ট ব্যাক্তির, সে ইউনুসই হোক আর ইব্রাহিম খালেদই হোক আর শেখ হাসিনার যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগত আইনজীবি পায়াম আখাভানই হোক, চরিত্রহননে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সমবেত ও অন্তহীন চেষ্টার মাঝে যে কোথাও এতটুকু সৎ সাংবাদিকতা নেই, সেটি বোঝেন বাংলাদেশে এমন মানুষের সংখ্যা এখন অনেক। এই সংবাদমাধ্যমগুলোই রাজনীতি আর ব্যবসার দলাদলি করতে গিয়ে মানুষকে চালাক বানিয়ে ফেলেছে।

বোকা মানুষ ঠেকে শিখে চালাক হয়, চালাক মানুষ কিন্তু আর বোকা হয় না। যে পাঠক বা দর্শক বা ইন্টারনেট ব্যবহারকারী খবর পড়ে তার দিকে ঝুঁকে গিয়ে গন্ধ শোঁকার অভ্যেস একবার রপ্ত করে ফেলেছে, তার আর সেই অভ্যেস থেকে নিষ্কৃতি নেই, নিষ্কৃতি নেই আমাদের সংবাদমাধ্যমেরও।

অতএব ইব্রাহিম খালেদকে নিয়ে নষ্ট খেলা বন্ধ হোক। শেয়ার কেলেংকারিতে জড়িত মহাদস্যুদের বাঁচাবার চেষ্টা বন্ধ হোক।

http://firstcache.files.wordpress.com/2011/01/daily-star-vs-salman-f-rahman-over-stock-collapse-500px.jpg

খবরটি গত সোমবার ডেইলি স্টার পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল প্রথম পাতায়। পুঁজিবাজারে সরকারদলীয় রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের দুর্নীতির আলোচনা তুঙ্গে থাকা বর্তমান সময়ে ডেইলি স্টারের ঐ বিশেষ খবরটিতে যেন ছিল চুম্বকার্ষণ। কিংবা তার চেয়েও বেশি কিছু। অবশেষে খবর প্রকাশের দিনের শেষ ভাগে সালমান এফ. রহমান এটিএন নিউজে এক সাক্ষাতকার দেয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতিতে একটি অন্য মাত্রা যোগ করেছেন।

 

কী ছিল ঐ রিপোর্টটিতে

রিপোর্টের শিরোনাম- All fingers pointed at one man. অত্যন্ত সতর্কতার সাথে লেখা রিপোর্টটিতে একটি বারের জন্যেও কোন বিশেষ প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে রিপোর্টের অর্ধেকের বেশি অংশ জুড়েই রয়েছে ঐ ব্যবসায়ীর পরিচয়। তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে ব্যবহৃত বিশেষণ ও উল্লেখগুলো হল- তিনি ক্ষমতাসীন দলের এমপি, দলে প্রভাবশালী, তার প্রতিষ্ঠান কয়েক বছর আগেও ঋণের ভারে জর্জরিত ছিল, কর্মীদের বেতন দিতে পারত না, কিন্তু ২০০৯-এর মাঝামাঝি থেকে তারা দেশের একটার পর একটা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিতে শুরু করে। পরিচয় পর্বে এও বলা হয়, ১৯৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারিতেও এই ব্যবসায়ী জড়িত ছিলেন, কিন্ত ‘পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব’-এর অজুহাত দেখিয়ে সরকার তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয় নি।

http://shatil.files.wordpress.com/2011/01/fm-meet-on-stock-collapse-2-600px.jpg

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচকের অস্বাভাবিক পতন বিষয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘পদ্মা’-তে অর্থ মন্ত্রী এ.এম.এ. মুহিতের সাথে কিছু অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীর ঐ বৈঠকে এই বিশেষ ব্যাক্তির ভূমিকা প্রসঙ্গে বলা হয়, বৈঠকে অংশ নেয়া একাধিক ব্যাক্তি স্টক এক্সচেঞ্জের ঐ বিপর্যয়ের জন্য ঐ ব্যবসায়ীকে দায়ী করেন। জবাবে ব্যবসায়ী জানান তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী এবং এহেন সম্বোধনে তিনি অপমানিত হয়েছেন। এতে বৈঠকে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে অর্থ মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তা স্বাভাবিক হয়।

 

এটিএন নিউজে সালমান এফ. রহমানের সাক্ষাতকার

সোমবার রাতে এটিএন নিউজের স্টুডিওতে এসে মুন্নি সাহাকে সালমান এফ. রহমান একটি সাক্ষাৎকার দেন। স্টক মার্কেট কলাপস নিয়ে বাতাসে উড়তে থাকা খবর যেগুলোর অধিকাংশের সাথে প্রধানমন্ত্রী পরিবারের একাধিক সদস্যের নামের পাশাপাশি সালমান এফ. রহমানের নামটিও জড়িয়ে আছে, সেই খবরগুলো প্রসঙ্গে মুন্নি সাহা সালমান এফ. রহমানের কাছে জানতে চান। নরমে-গরমে, হেসে কিংবা কখনও ক্ষেপে সালমান এফ. রহমান সেগুলোর জবাব দেন। তার বেক্সিমকো ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সাত বছর ধরে জমতে থাকা ঋণের বোঝার পুরোটা মিটিয়ে দিয়েছে, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের এমন খবরের প্রতিবাদ করে তিনি বলেন, তারা যখন ঐ খবরটি করে তখনও ঋণ পুরোটা মিটানো হয়নি। উল্লেখিত সময়ে তার প্রতিষ্ঠানের দূরবস্থার কথা স্বীকার করে তিনি যোগ করেন, এমনও হয়েছে যে ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে তিনি বাকি কর্মীদের বেতন দিয়েছেন। কীভাবে প্রতিষ্ঠানটি রাতারাতি এখনকার মত নধর আকৃতি পেয়ে গেল, মুন্নি সাহার এই প্রশ্নের জবাব তিনি এভাবে দেন- কোম্পানির ভিত্তি বরাবরই শক্ত ছিল, অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর তার পরিবারের সক্রিয় সদস্যরা বিদেশ থেকে ফিরে এসে ব্যবসার হাল ধরে, তিনিও জেল থেকে বেরিয়ে এসে সক্রিয় হন।

http://shatil.files.wordpress.com/2011/01/fm-meet-on-stock-collapse-1-600px.jpg

ঋণের ভারে জর্জরিত একটি প্রতিষ্ঠান রেকর্ড পরিমাণ ঋণ উৎরে শুধু মাত্র পারিবারিক পুনর্মিলনীর দিয়ে কয়েক বছরের মাঝে জিএমজি এয়ারলাইন্স, ওয়েস্টিন হোটেল, বিডিনিউজ২৪-এর মালিকানা কীভাবে পেতে পারে, মুন্নি সাহা সালমান এফ. রহমানকে এই প্রশ্ন করে বিব্রত করেননি।

ডেইলি স্টার প্রথম আলো-র সাথে সালমান এফ. রহমানের একটি ‘মেক্সিকান স্ট্যান্ডঅফ’ ঘটেছিল প্রায় এক বছর আগে। ঋণে জর্জরিত অবস্থা থেকে সালমান এফ. রহমানের প্রতিষ্ঠানের উত্তরোত্তর উত্তরণকে প্রশ্ন করে কয়েকটি রিপোর্ট ছাপে প্রথম আলো। তার জবাবে সালমান এফ. রহমান সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান প্রথম আলো ডেইলী স্টার বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্থ করার চেষ্টা করছে, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে চাইছে। তিনি ওয়ান-ইলেভেনওয়ালাদের সাথে প্রথম আলো ডেইলী স্টারের সুসম্পর্কের কথাটি উল্লেখ করেন, এবং মাইনাস-টু ফর্মুলার প্রণেতা হিসেবে তাদেরকে চিহ্নিত করেন। তার জবাবে ডেইলি স্টার সম্পাদক ও প্রথম আলো প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, “একজন বছরের পর বছর ঋণ খেলাপ করে যাবে, কেউ তা নিয়ে কিছু বলতে পারবে না? সালমান এফ. রহমান এমন কী মানুষ যার সমালোচনা করলে সরকার অস্থিতিশীল হয়ে যাবে?” মেক্সিকান স্ট্যান্ডঅফই বটে!

সেই দিকগুলো সাম্প্রতিক স্টক মার্কেট কোলাপসের মধ্য দিয়ে যেন আরেকটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ডেইলি স্টার তার গোটা রিপোর্টে কোথাও সালমান এফ. রহমান বা বেক্সিমকোর নাম উল্লেখ করে নি, তবে এটিএন নিউজের সাক্ষাৎকারে সালমান এফ. অম্লানবদনে ডেইলী স্টারের ‘ঐ বিশেষ ব্যবসায়ী’ হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করে রিপোর্টটির সমালোচনা করেছেন। তিনি রিপোর্টটির ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন করেন এবং কয়েকটি ঘটনা বিকৃত ভাবে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান। যেমন- ডেইলী স্টার বলছে বৈঠকের একজন অংশগ্রহণকারী কলাপসের জন্য সালমান এফ. রহমানকে দায়ী করলে কথা কাটাকাটি শুরু হয় ও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে, যা নিরসনে অর্থ মন্ত্রী এগিয়ে আসেন। সালমান এফ. রহমান জানান ওরকম কিছুই সেখানে ঘটেনি। বৈঠকের এক পর্যায়ে তাকে ও তার প্রতিষ্ঠানকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা হয় স্বীকার করে তিনি জানান, তিনি সেখানে তোলা প্রশ্নগুলোর এক এক করে জবাব দেন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে জবাব দিতে গিয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি ‘এক্সাইটেড’ হয়ে পড়েন। সম্ভবত চেঁচিয়ে উত্তর দেয়ার ব্যাপারটাকে তিনি ‘এক্সাইটেড’ দিয়ে প্রকাশ করেছেন। তিনি যোগ করেন যে বৈঠকের শেষে কয়েকজন ব্যাক্তি তাকে জানিয়েছেন যে তার জবাব খুব ভালো হয়েছে, তবে আরেকটু নিম্নস্বরে ঠান্ডা মাথায় জবাব দিলে ভালো করতেন।

 

‘ইয়োর রাইট টু ন্যো’ ও ঢাক ঢাক গূঢ় গূঢ়-এর সহাবস্থান

‘ইয়োর রাইট টু ন্যো’-কে ডেইলি স্টার তাদের শ্লোগান হিসেবে বেঁছে নিয়েছে, যেমন বেঁছে নিয়েছে নিউ এজ ‘বায়াসড ট্যুয়ার্ডস পিপল’-কে। শ্লোগানগুলো সৎ, সত্যনিষ্ঠ ও দায়িত্মশীল সাংবাদিকতার প্রতীক। পত্রিকা হিসেবে ডেইলি স্টার বহুলপঠিত। চলমান ঘটনা ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর উপর খবর জানতে পত্রিকাটি বহু মানুষের জন্যই প্রাথমিক ও একমাত্র উৎস। সেই বিচারে বহু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রভাব ফেলার ক্ষমতা ও যোগ্যতা, দুইই পত্রিকাটির আছে। এই ক্ষমতা অতীতে তারা ব্যবহারও করেছে। এই ব্যবহার তাদেরকে বহুলপ্রচারিত প্রশংসা ও বহুলপ্রচারিত তিরষ্কার, দুইই এনে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সত্য প্রকাশে তাদের অপারগতার বিষয়টি আপত্তিজনক তো বটেই, অত্যন্ত হতাশাজনকও। ‘All fingers pointed at one man’ শীর্ষক রিপোর্টটিতে তাদের শ্লোগানকে আংশিক ভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের ওয়েবসাইটে রিপোর্টটির নীচে পাঠক মন্তব্য পড়লে ব্যাপারটি আরও স্পষ্ঠ হয়ে উঠবে। প্রথম পাঠক মন্তব্যটিতেই এই ‘ঢাক ঢাক গূঢ় গূঢ়’ অবস্থানের সমালোচনা করে একে অগ্রহণযোগ্য আচরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কয়েক বছর আগে পত্রিকাটির সম্পাদক মাহফুজ আনাম একটি টিভি সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, “সালমান এফ. রহমান এমন কী মানুষ যার সমালোচনা করলে সরকার অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে?”। এই কথাটি মনে রেখে ডেইলি স্টারের ঐ রিপোর্টটি পড়লে একজন পাঠকের মনে হতেই পারে, অবশেষে ডেইলি স্টারের দৃষ্টিতে সালমান এফ. রহমান কি এমন কোন ব্যাক্তি হয়ে উঠেছেন যার সমালোচনা করলে তারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশংকা করছেন?

প্রবন্ধটি ৪ নভেম্বার, ২০১০ তারিখে দৈনিক আমার দেশ-এ এবং একই দিনে বাংলাদেশ ফার্স্ট ওয়েব ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।

 

শওকত মাহমুদ ও মুহম্মদ তাওসিফ সালাম

 

এই সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ক্যাথলিক খ্রীস্টানদের ধর্মগুরু পোপ বেনেডিক্ট ব্রিটেন কাঁপানো সফরে গিয়েছিলেন। তখন কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির মধ্যে ধর্মবিশ্বাস নিয়ে বিতর্কটা ভালই জমে উঠেছিল। রক্ষণশীল দলের চেয়ারপার্সন পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত এমপি লেডি ওয়ারসি শ্রমিক দলের ধর্মনিরপেক্ষতা তথা ধর্মহীনতার নীতিকে তুলোধুনো করে বলেছিলেন (১৫ সেপ্টেম্বর অক্সফোর্ডে ইংল্যান্ডের ধর্মাযাজকের সম্মেলনে):

 

They were too suspicious for faith’s potential for contributing to society- behind every faith-based charity… the fact is that our world is more religious than ever. Faith is here to stay. It is part of human experience.

লেডি ওয়ারসির এই মন্তব্যকে টেনে আনার কারণ হল, পরের মাস অক্টোবারে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের নির্বাচনে মৌলবাদের জিগির তুলে লুৎফুর রহমানকে মনোনয়ন না দিয়ে লেবার পার্টি বিরাট ভুল করে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে লুৎফুর রহমান অবিস্মরণীয় বিজয় ছিনিয়ে আনেন। যেমনি করে রেসপেক্ট পার্টির জর্জ গ্যালওয়ে ইরাক যুদ্ধের প্রতিবাদ করে ইস্ট লন্ডনে লেবারকে হটিয়ে ঐতিহাসিক বিজয় এনেছিলেন।

 

এবারই প্রথম এই কাউন্সিলে সরাসরি ভোটে বিপুল নির্বাহী ক্ষমতাসম্পন্ন মেয়রের ভোট হল। এই কাউন্সিলে শ্বেতাঙ্গদের পাশাপাশি বহু এশীয়রা থাকে, যাদের মধ্যে বাংলাদেশিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। পূর্ব লন্ডনের এই কাউন্সিল বরাবরই লেবারদের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি। এখানে প্রায় সব দল-মতের ইমিগ্র্যান্টরা লেবারকে সমর্থন করে মূলত দলটির প্রো-ইমিগ্রেশান ও সামাজিক সুরক্ষা নীতির জন্য। আওয়ামী লীগ ঘরানার লোকজন এতদিন লেবার পার্টিতে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল যার দ্বিতীয় পতন হল লুৎফুরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। স্থানীয় বাংলাদেশি এমপি রুশনারা আলীও প্রচন্ড রাজনৈতিক ঝাঁকুনি খেলেন লুৎফুরের বিরোধিতা করে। লেবারের আচরণে বাংলাদেশিরা প্রচণ্ড ক্ষুদ্ধ হয়ে প্রতিবাদী ভোট দিয়ে লুৎফুরকে এমন কর্তৃত্বে বসিয়েছে যে, ২০১২ সালে এই এলাকায় তাঁর হাত দিয়েই বসবে অলিম্পিকের জমজমাট আসর।

 

বিলাতের বাংলাভাষীদের বড় একটা অংশের সন্দেহ, মনোনয়ন নিয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটিকে দ্বিধাভিবক্ত করে এর ফাঁকে কোন শ্বেতাঙ্গকে এই প্রাণবন্ত কাউন্সিলের মাথায় বসানোর কোন চক্রান্ত থেকে থাকলে বাংলাদেশিরা তাকে উল্টে দিয়েছে। এও সত্য যে, লুৎফুরকে লেবার দলের ক্ষুদ্ধ এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমর্থকেরাও ভোট দিয়েছে। বৃহত্তর লন্ডনের সাবেক মেয়র এবং আগামী নির্বাচনে লেবারের মেয়র প্রার্থী কেনেথ লিভিংস্টোন লুৎফুরের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন।

 

লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে সরাসরি ভোটে মেয়র নির্বাচনে লেবার পার্টির যাত্রা যে গণতন্ত্রের মুন্ডুপাত দিয়ে শুরু হয়েছে, তাতে সম্ভবত সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। কোন নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক প্রস্তুতির মৌলিক দিকগুলো কী কী, তা বুঝতে উচ্চভুরু রাজনৈতিক বিশ্লেষক হওয়ার দরকার হয় না। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট এলাকার নেতাকর্মীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের প্রতিফলন ঘটছে, এটা নিশ্চিত করাই হচ্ছে গণতন্ত্রভিত্তিক নির্বাচনী প্রস্তুতি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে টাওয়ার হ্যামলেটসের সদ্যসমাপ্ত মেয়র নির্বাচনে লেবার পার্টির আসল লড়াইটা হয়েছে গণতন্ত্রের সাথে। দলটির স্থানীয় প্রতিনিধিরা যে লুৎফুর রহমানকে প্রার্থীতার জন্য মনোনীত করেছিলেন, সে লুৎফুর রহমানকে মনোয়ন না দিয়ে লেবার পার্টি প্রাথমিক ভাবে গণতন্ত্রের উপর চড়াও হয়েছিল। আখেরে গণতন্ত্রই লেবার পার্টির উপর চড়াও হয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসে যে ঘটনার জন্ম দিল, তা অবশ্যই লেবার পার্টির প্রতি গণতন্ত্রের একটি স্মরণীয় চপেটাঘাত, যার কালসিঁটে দলটিকে অনেক কাল ধরে বয়ে বেড়াতে হতে পারে। নির্বাচনী ফলাফল সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, এলাকাটিতে লেবারের এই বিপর্যয় ২০০৫ সালে ব্যাক্তি জর্জ গ্যালওয়ের কাছে দল লেবারের পরাজয়ের চেয়েও বেশি মারাত্মক।

 

লেবারের টিকেট নিয়ে পরপর দুইবার সরাসরি ভোটে কাউন্সিলার নির্বাচিত হওয়া লুৎফুর রহমানকে টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়র নির্বাচনের জন্য মনোয়ন দিয়েও অতি ঠুনকো কারণ দেখিয়ে সেই মনোয়ন কেড়ে নেয় লেবার পার্টি। এই কেড়ে নেয়ার পেছনে কারণ হিসেবে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটি (এনইসি)-র কাছে লুৎফুর রহমান প্রসঙ্গে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত অপর লেবার নেতা ও আওয়ামী লীগ সমর্থক হেলাল উদ্দীন আব্বাসের মিথ্যা বিষোদগারকেই দায়ী করা হয়। লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেলে বিশাল ইস্ট লন্ডন মসজিদকে কেন্দ্র করে যে পরিচালনা,তাতে ধর্মপ্রাণ লুৎফুর রহমান সংশ্লিষ্ট ছিলেন। মক্কার হেরেম শরীফের ইমাম আব্দুর রহমান আস-সুদাইসকে যেখানে দাওয়াত দিয়ে আবার পেছনে লুৎফুর সক্রিয় ছিলেন, ইমাম সাহেবের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন, লুৎফুর উগ্রবাদী মুসলিমদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে ইত্যাকার অভিযোগ করে লেবার পার্টির নেতৃত্বের একাংশকে বিভ্রান্ত করেন স্থানীয় মূল ধারার আওয়ামী লীগাররা, যাদের মাঝে কলামিস্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরীও ছিলেন। এতে পূর্ব লন্ডনের ব্যাপক মানুষ প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিল, “পোপ লন্ডনে এলে মৌলবাদ হয় না, কাবা শরীফের ইমামকে আনলে মৌলবাদ কেন হবে?” এই প্রতিবাদ জানানো মানুষদের মধ্যে সচেতন ধর্মপ্রাণ আওয়ামী লীগরারও রয়েছেন। অমূলক ঐ অভিযোগের ভিত্তিতে লুৎফুর রহমানের মনোনয়ন কেড়ে নেয়াই সার নয়, তার পরিবর্তে দল ঐ হেলাল উদ্দীন আব্বাসকেই মনোয়ন দেয়, যার পক্ষে প্রচারণায় সক্রিয় ভাবে অংশ নিয়েছেন লেবার নেত্রী ও সদ্য নির্বাচিত হাউজ অব কমনস সদস্য রুশনারা আলী এমপি। অথচ চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবার পর ১৪ সেপ্টেম্বারে লুৎফুর যখন আনুষ্ঠানিক ভাবে তার ক্যাম্পেইন উদ্বোধন করেন তখন রুশনারা আলী সেখানে যাননি। বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রায় সবার চোখেই এটা দৃষ্টিকটু ঠেকেছে।

 

http://firstcache.files.wordpress.com/2010/11/rushanara-ali-and-helal-uddin-abbas-600px.jpg

রুশনারা আলী এবং হেলাল উদ্দীন আব্বাস

 

লেবার পার্টির নেতা নির্বাচনে রুশনারা ডেভিড মিলিব্যান্ডকে সমর্থন করেছিলেন। ইস্ট লন্ডনে এনে ডেভিড মিলিব্যান্ডকে হাইলাইটও করা হয়েছে। যার ফলে ছোট ভাই এড মিলিব্যান্ডের কাছে তাঁর পরাজয়ের ঘটনাটি ছিল রুশনারার জন্য এক বড় আঘাত। অবশ্য আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার মেয়ে কাউন্সিলার টিউলিপ সিদ্দিকি এসব ঘটনা থেকে নিজের ইমেজকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তবে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের জন্য লুৎফুরের এই বিজয়ই শুধু নয়, দুর্নীতির অভিযোগে তাদের সমর্থক লর্ড সভার বাংলাদেশি সদস্য ব্যারনেস পলা মঞ্জিলা উদ্দীনের লর্ডশীপের দীর্ঘমেয়াদী সাসপেনশানও আরেক চপেটাঘাত। ব্যারনেস পলা মঞ্জিলা উদ্দীন বাংলাদেশ নিয়ে এক সেমিনারে গত জুলাই মাসে আওয়ামী লীগের প্রতি নগ্ন পক্ষপাত দেখিয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে সমালোচিত হয়েছিলেন।

 

কিন্তু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে টাওয়ার হ্যামলেটসের অধিবাসীগণ দলীয় ইমেজকে নয়, ব্যাক্তি ইমেজকে গুরুত্ব দিয়েছেন, ধর্মের প্রশ্নে কাউকে অপবাদ দেওয়ার প্রতিবাদ করেছেন। সংখ্যার হিসাব তাই বলছে। দলীয় পরিচয়বিহীন প্রার্থী লুৎফুর রহমান পেয়েছেন অর্ধেকেরও বেশি ভোট। আর দলীয় ইমেজের বন্দনাকারী লেবার প্রার্থী হেলাল উদ্দীন আব্বাস পেয়েছেন এক চতুর্থাংশ ভোট। তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা লুৎফুর রহমানের প্রাপ্ত ভোটের অর্ধেকেরও কম। বাকি এক চতুর্থাংশ ভোট ভাগাভাগি করেছেন টরি, গ্রিন আর লিবারাল ডেমোক্রেট প্রার্থীগণ। ২০০৫ সালে বেথনাল গ্রিন এবং বো আসনে জর্জ গ্যালওয়ের কাছে উনা কিং-এর পরাজয়, যার মধ্য দিয়ে স্থানীয় লেবারের মূলধারায় শোকের মাতম পড়ে গিয়েছিল, সেই পরাজয়ও কিন্তু এত মারাত্মক ছিল না, গ্যালওয়ে মাত্র ৮২৩ ভোটে জিতেছিলেন। লুৎফুর সেটিকে ছাপিয়ে চলে গেছেন বহুদূর। বাংলাদেশি হিসেবে সুবিধা পেয়েছেন তাই বা বলি কী করে। ১২ হাজারেরও বেশি ভোটে যে লেবার প্রার্থীকে তিনি হারিয়েছেন, তিনি হচ্ছেন অপর বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত ও আওয়ামী লীগ সসমর্থক হেলাল উদ্দীন আব্বাস।

 

 

‘শেক্সপিয়ারীয়’ নির্বাচনের নেপথ্যে…

 

স্থানীয় লেবার পার্টির একটি অংশ যে লুৎফুর রহমানকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে খুবই আগ্রহী, তা প্রথম বোঝা গিয়েছিল আগস্ট মাসে, সম্ভাব্য মনোয়ন-প্রত্যাশীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে দুই বার লুৎফুর রহমানের নাম বাদ দেয়ার মধ্য দিয়ে। লুৎফুর রহমান বিষয়টি হাইকোর্টে নিয়ে গেলে সেখান থেকে তার নাম সংযোজন করার নির্দেশ দিয়ে রায় দেয়া হয় এবং লুৎফুর রহমান সংক্ষিপ্ত তালিকায় তার অবস্থান ফিরে পান। কিন্তু এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে টাওয়ার হ্যামলেটসে ইতিহাসের প্রথম সরাসরি মেয়র নির্বাচনে লুৎফুর রহমানের যাত্রা সহজ হবে না, কেননা তার শত্রুরা অবস্থান করছিল তা নিজ (বর্তমানে প্রাক্তন) দলের মধ্যেই।

 

সংক্ষিপ্ত তালিকার ৭ জনের মধ্য থেকে একজনকে নির্বাচিত করার লক্ষ্যে ৪ সেপ্টেম্বার, ২০১০ তারিখে দলের টাওয়ার হ্যামলেটস কার্যালয়ে সর্বোচ্চ ৮৬৮ জন এবং সর্বনিম্ন ৮৪১ জন প্রতিনিধি পাঁচ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত এক ভোটাভুটিতে অংশ নেন। পূর্বে সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে বাদ পড়া লুৎফুর রহমান প্রাথমিক পর্যায়ের এই ভোটাভুটিতে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন। নীচের ছকটিতে এই ভোটাভুটির তথ্য দেয়া আছে:

 

http://firstcache.files.wordpress.com/2010/11/tower-hamlets-labour-primary.jpg

সূত্রঃ LabourBriefing.org.uk

 

মাঠপর্যায়ের এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল লেবার নেতা কেনেথ ক্লার্কের তত্ত্বাবধানে। ৬ সেপ্টেম্বারে এই কেনেথ ক্লার্কই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন এবং উপস্থিত শতশত লেবার কর্মী ও সংবাদকর্মীর সামনে লুৎফুর রহমানকে টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়র নির্বাচনের লেবার প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন।

 

১৪ সেপ্টেম্বার তারিখে এই কার্যালয়েই লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিক ভাবে লুৎফুর রহমানের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়। লেবার নেতা জেমস ফিটজপ্যাট্রিক এমপি এক ভিডিও অ্যাড্রেসের মাধ্যমে লুৎফুর রহমানের প্রতি তার সমর্থনের কথা জানান এবং উপস্থিত সমর্থকদের নিশ্চিত করেন যে লুৎফুর রহমানই হবেন টাওয়ার হ্যামলেটসের সর্বোত্তম মেয়র। পরে অবশ্য এই জেমস ফ্রিটজপ্যাট্রিকের পরিচয় বদলে যায়।

 

মাঠ পর্যায়ের ভোটে ভরাডুবির শিকার এবং অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী হেলাল উদ্দীন আব্বাস ২০ সেপ্টেম্বারে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটি (এনইসি)-র কাছে ৯ পৃষ্ঠাবিশিষ্ট একটি অভিযোগপত্র পেশ করেন। পত্রে আব্বাস লুৎফুরের বিরুদ্ধে অনিয়ম, কথিত ইসলামী উগ্রবাদীদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন, অনুগত রাজনৈতিক কর্মীদের পদ প্রদান ও নিয়মবহির্ভূত রাজনৈতিক আচরণের অভিযোগ আনেন।

 

এক্ষেত্রে উগ্রবাদীদের সমর্থন প্রসঙ্গে আনীত অভিযোগের বিষয়টি বিশ্লেষণ না করে পারছি না। হেলাল আব্বাসের এই বিশেষ অভিযোগের ভিত্তি প্রসঙ্গে জানলে সব পাঠকই আশ্চর্য যে হবেন এমনটা হলফ করে বলতে পারি না। কেননা বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার চলমান হুজুগে হেলাল আব্বাসের সাথে একাত্মতা ঘোষণাকারীও জুটে যাবেন কিছু, সন্দেহ নেই। তবে আমরা লজ্জাবোধ করছি এটা জেনে যে, লুৎফুর রহমানকে উগ্রপন্থী আখ্যা দেয়ার পেছনে হেলাল আব্বাসের তুলে ধরা প্রধান একটি যুক্তি ছিল মক্কা শরীফ (মসজিদে হারাম)-এর ইমাম শেখ আব্দুর রহমান আস-সুদাইসের সাথে লুৎফুরের সম্পর্ক ও সাক্ষ্যাতের বিষয়টি!

 

ক্রিশ্চানদের নেতা পোপের সাথে বারংবার সাক্ষ্যাৎ করা রাষ্ট্রনায়কগণ কেন উগ্রপন্থী নন এবং কেন মসজিদে হারামের ইমামের সাথে সাক্ষ্যাৎ করার অপরাধে লুৎফুর রহমান উগ্রপন্থী, এই প্রশ্নটি হেলাল আব্বাসকে করার সুযোগ এখনও আমাদের হয়নি। বাড়িতে নামাজ শিক্ষা, ইসলামী ইতিহাস, হাদিস শরীফ ইত্যাদি বিষয়ের উপর বই রাখলেও মিডিয়া কোন বিলম্ব না করে ইসলামী উগ্রপন্থী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দিবে, ইদানিং তাই দিচ্ছে, হয়তো এই বিশ্বাস থেকেই হেলাল আব্বাসরা এনইসির কাছে লুৎফুর রহমানের ‘উগ্রপন্থী’ পরিচয়টি ফলাও করে প্রচার করেছিলেন।

 

শুধুমাত্র হেলাল আব্বাসের ঐ অভিযোগের ভিত্তিতেই ২১ সেপ্টেম্বারে লেবার পার্টির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক এই এনইসি মাঠপর্যায় থেকে নিরংকুশ বিজয়লাভ করা লুৎফুর রহমানের মনোনয়ন বাতিল করে দেয়। ব্যাখ্যা স্বরূপ লেবার পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়, “মনোনয়ন-নির্ধারণী প্রাথমিক ভোটে অংশ নেয়া দলীয় প্রতিনিধিগণের যোগ্যতা এবং প্রার্থী হিসেবে লুৎফুর রহমানের আচরণ, উভয় প্রসঙ্গেই প্রাপ্ত কিছু মারাত্মক অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়গুলোর তদন্তের জন্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে… প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যেহেতু লেবার প্রার্থী হিসেবে লুৎফুর রহমানের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে, এই পরস্থিতিতে নির্বাচনের জন্য অপর একজন মনোনয়ন প্রত্যাশীকে লেবার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া ছাড়া এনইসির আর কোন উপায় নেই।”

 

হেলাল আব্বাসের অভিযোগ, তার সূত্র ধরে লুৎফুর রহমানের প্রার্থীতা বাতিল ইত্যাদি বিষয়ে এনইসি সংক্রান্ত তথ্যাবলী লেবার পার্টি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ওয়েবসাইট লেবারব্রিফিং (LabourBriefing.org.uk) থেকে জানা যায়। ওয়েবসাইটটিতে প্রকাশ করা হয়, যে বিশেষ অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়ে এনইসি লুৎফুর রহমানের প্রার্থীতা বাতিল করেছে, তার লেখক হচ্ছেন হেলাল উদ্দীন আব্বাস। লেবারব্রিফিং জানাচ্ছে, অভিযোগকারীর অভিযোগ শুধু আমলেই নেয়া হয়নি, সেই অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যাক্তিকে নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করার কোন সুযোগ দেয়া হয় নি, বরং তার সাথে অভিযোগকারীর রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়টি জেনেও অভিযোগকারীকে উদ্ভুত পরিস্থিতি থেকে সুবিধা গ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। লেবারব্রিফিং এক পর্যায়ে এনইসির ঐ বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মৃদু সমালোচনা করে উল্লেখ করেছে, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে হয়তো এটা প্রতিষ্ঠা পেল যে প্রাথমিক ভোটাভুটিতে নির্বাচিত ব্যাক্তির বিরুদ্ধে কোন প্রকারের অভিযোগ আনতে পারলেই দ্বিতীয় এমনকি তৃতীয়স্থানের অধিকারীরাও তাকে সরিয়ে নিজেরা মনোয়ন পেতে পারেন।

 

লেবার পার্টির প্রার্থী মনোনয়নে এই সমস্ত নাটকীয়তা দেখে প্রতিপক্ষ টরি প্রার্থী নিল কিং নির্বাচনটিকে এক ‘শেক্সপিয়ারীয় নির্বাচন’ (Shakespearean Election) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। নাটকের কিন্তু এখানেই শেষ নয়।

 

লুৎফুরকে অপসারণের পেছনে এনইসি প্রদর্শিত যুক্তি যে সম্পুর্ণ অগ্রহণযোগ্য ছিল তা নির্বাচনের মাধ্যমে পরে চূড়ান্তরূপে প্রমাণিত হলেও, তাৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়ায়ও সেখানকার রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ এনইসির ঐ সিদ্ধান্তের মুন্ডুপাত করেন। লুৎফুর রহমানের বিরুদ্ধে হেলাল আব্বাসের আনা এবং এনইসির মেনে নেওয়া অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা, কোন বিশ্লেষকই সেই বিতর্কের ধার মাড়াননি। তাদের প্রত্যাখ্যানের পেছনে মূলত যুক্তি ছিল এই যে, লুৎফুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ একান্তই গুরুতর হলে এনইসি তাকে তলব করে তার ব্যাখ্যা চাইতে পারত। তা না করে তারা তাদের এমন একজন সদস্যের অভিযোগকে আমলে নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে সদস্য মাঠপর্যায়ের ভোটাভুটিতে পাঁচটি রাউন্ডের চারটিতেই শতকরা ১৫ ভাগেরও কম এবং শেষবার ২০ ভাগেরও কম ভোট পেয়েছেন এবং একবারের জন্যও প্রথম তো সুদূর পরাহত, দ্বিতীয় স্থানটিও অধিকার করার যোগ্যতা জুগিয়ে উঠতে পারেন নি। সবচেয়ে বড় কথা, এই ব্যাক্তি টাওয়ার হ্যামলেটসে লেবার পার্টির মাঠপর্যায়ের ভোটাভুটিতে লুৎফুর রহমানের পরাজিত প্রতিযোগী। পরে লুৎফুরকে অপসারণ করে এই হেলাল আব্বাসকেই লেবার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়ে এনইসি তাদের নীতিবিসর্জনের ষোলকলা পূর্ণ করে। শুধু তাই নয়, ২৬ সেপ্টেম্বারে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার প্রাসাদে লেবার নেতৃবৃন্দ মিলিত হয়ে লুৎফুর রহমানসহ তার সমর্থক লেবার নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেন। বহিষ্কৃত বাংলাদেশি নেতৃবৃন্দের মাঝে আটজনই ছিলেন সরাসরি ভোটে নির্বাচিত কাউন্সিলার। তারা হলেন অহিদ আহমেদ, ওলিউর রহমান, লুতফা বেগম, রানিয়া খান, আমিনুর খান, রাবিনা খান, সেলিনা খাতুন এবং আলিবর রহমান।

 

 

 

২৬ সেপ্টেম্বারে ওয়েস্টমিনস্টার প্রাসাদে অনুষ্ঠিত লেবার নেতৃবৃন্দের এই বৈঠকটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বিশেষ একটি এলাকায় দলের আভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে আলোচনার স্থান হিসেবে ওয়েস্টমিনস্টারকে বেছে নেয়ার মধ্য দিয়ে মধ্য দিয়ে একাধিক লেবার এমপির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে এই বিশ্লষকরা মনে করেন। এদের মাঝে প্রবীণ লেবার নেতা, সাবেক কাউন্সিলার এবং বর্তমানে সক্রিয় রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকার পিটার কেনিয়ন মত দিয়েছেন, লুৎফুর রহমানকে বহিষ্কারের মূল ভিত্তি ঐ অভিযোগগুলোর জবাব দেয়ার কোন সুযোগ তো লুৎফুরকে দেওয়া হয়ইনি, উপরন্তু তাকে সহ তার সমর্থকদের হেনস্থা করতে ওয়েস্টমিনস্টারে বৈঠক করে দুইজন লেবার এমপি তাদের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এই দুইজন লেবার এমপি হচ্ছেন রুশনারা আলী এবং জেমস ফিটজপ্যাট্রিক। পিটার কেনিয়ন তার ব্লগে সরাসরি লিখেছেন, ওয়েস্টমিনস্টারে বৈঠক করতে চাইলে হলরুমের বুকিং কেবল এমপিরাই করতে পারেন। এক্ষেত্রে এই দুই এমপির কোন একজন বা উভয়ই ওয়েস্টমিনস্টারের ঐ বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন, যার মধ্য দিয়ে তারা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।

 

উল্লেখ্য, এই জেমস ফিটজপ্যাট্রিকই কিন্তু ১৪ সেপ্টেম্বারে ঘোষণা করেছিলেন যে লুৎফুরই হতে পারেন টাওয়ার হ্যামলেটসের সর্বোত্তম মেয়র। কিন্তু স্থানীয় আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিবিদদের সৃষ্ট বিভ্রান্তির ফলে টাওয়ার হ্যামলেটসকে নিয়ে লেবার পার্টিতে যে ক্ষমতার খেলা চলছিল, তার জের ধরে লুৎফুরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন হাউজ অব কমন্সের এই সদস্য। লুৎফুর রহমানের মনোনয়ন বাতিলসহ তাকে ও তার সমর্থক কাউন্সিলারদের দল থেকে বহিষ্কারের অগণতান্ত্রিক সব সিদ্ধান্ত ছিল ক্ষমতার এই খেলারই ফলাফল। এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে লন্ডনের সাবেক মেয়র কেনেথ লিভিংস্টোন, যিনি ২০১২ সালে অনুষ্ঠিতব্য লন্ডনের মেয়র নির্বাচনে লেবারের একজন সম্ভাব্য প্রার্থী, বলেছেন যে এড মিলিব্যান্ডের মত একজন দলনেতা সেসময়ে উপস্থিত থাকলে লেবার পার্টির এনইসি কখনওই এসব অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের জন্মস্থান হত না। উল্লেখ্য, বড় ভাই ও সাবেক মন্ত্রী ডেভিড মিলিব্যান্ডের বিরুদ্ধে লড়ে লেবার পার্টির নেতা নির্বাচিত হন এড মিলিব্যান্ড এবং রুশনারা আলী ঐ নির্বাচনে ডেভিড মিলিব্যান্ডের প্রতি প্রত্যক্ষ সমর্থন জানিয়েছিলেন। টাওয়ার হ্যামলেটসে মনোনয়ন সংক্রান্ত সেসব ঘটনা লেবার নেতা নির্বাচনের কয়েকটি মাত্র দিন আগের ঘটনা।

 

http://firstcache.files.wordpress.com/2010/11/tower-hamlets-election-results.jpg

 

টাওয়ার হ্যামলেটসে বাংলাদেশি কমিউনিটির ঐক্যের মাঝে ফাটল ধরিয়ে নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক অভিলাষ পুরণ করতে যারা তৎপর ছিলেন, তাদের প্রতি টাওয়ার হ্যামলেটস অধিবাসীদের জবাব উপরের ছকটিতে ফুটে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সামাজিক কাঠামো জাহান্নামে যায় যাক, ক্ষমতা কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না বা যেকোন মূল্যে প্রতিপক্ষের জিত ঠেকাতে হবে, এই মনোভাব থেকে সেই বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীটি সুদূর টাওয়ার হ্যামলেটসে লেবার পার্টির ছত্রচ্ছায়ায় থেকেও যে পরিত্যাগ করতে পারেনি, লুৎফুরের নির্বাচনী যাত্রার প্রতিটি স্তরে রয়েছে তার প্রমাণ। তবে, তাদের প্রতি ভাগ্যের পরিহাসই হবে হয়তো, এই একই নির্বাচনের ফলাফল আবার এটাও প্রমাণ করে দিয়েছে যে মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে মৌলবাদ হিসেবে চিহ্নিত করে রাজনৈতিক ফায়দার অন্বেষণকারীরা সর্বত্রই সাধারণ মানুষদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হবে।

http://shatil.files.wordpress.com/2010/09/chhatro-league-atrocities-prime-minister-and-2-ministers.jpg

(উপরে) বরিশাল পলিটেকনিক ইন্সটিউটে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। (নীচে) ৩১ আগস্ট, ২০১০ তারিখে জাতীয় শোক দিবস প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভার শেষ দিনে ছাত্রলীগের প্রতি সীমাহীন বিরক্তি প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। (ইনসেট) পাট মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি ও পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন

ছাত্রলীগের কার্যকলাপে প্রধানমন্ত্রীর বিরক্তি খুব স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পেল গতকাল ৩১ আগস্ট, ২০১০ তারিখে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত জাতীয় শোক দিবস বিষয়ক আলোচনায়। বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি মূলত ছাত্রলীগের উদ্দেশ্যে ও এই প্রসঙ্গে যা যা বললেন,

কোন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত হলে আইনমাফিক তার শাস্তি পেতে হবে।

সংগঠনে ছাত্রদল ও শিবিরের লোকজনদের ঢুকতে দেয়া যাবে না।

শৃংখলা ভঙ্গকারীদের বহিষ্কার করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আরও বহিষ্কার করা হবে, আইনভঙ্গকারীকে কোন ছাড় দেয়া হবে না।

একটি স্বল্পশিক্ষিত নেতৃত্ব জাতিকে ভালো কিছু এনে দিতে পারবে না দেশবাসীর সে অভিজ্ঞতা হয়েছ। অতএব পড়াশুনায় আরও বেশি মনযোগী হতে হবে।

ছাত্ররাজনীতিতে বিলাসিতার কোন স্থান নেই। ছাত্ররাজনীতি করতে হলে তা করতে হবে মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্য নিয়ে।

আদর্শবিবর্জিত রাজনীতি কোন ভাল ফল বয়ে আনতে পারবে না।

ছাত্রলীগের কেউ অপরাধ করলে তাকে ছাড় দেয়া হবে না, প্রধানমন্ত্রী এই বিশেষ সতর্কবার্তাটির উপর বিশষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। কথা হচ্ছে, এই ছাড় না দেয়ার ব্যাপারটি কি ওনার এই বক্তব্যের সময় থেকে বলবত হল, অর্থাৎ এর আগে কি ছাড় দেয়া হচ্ছিল কি না, সে ব্যাপারে দেশের মানুষ নিশ্চিত ভাবে কিছু বলতে পারে না। কারন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের হল দখলের সময় ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেন নিহত হওয়ার পর প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া, আর এফ. রহমান হল দখলে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আবু বকর সিদ্দিকি নিহত হওয়ার পর প্রশাসনের প্রতিক্রিয়ার তফাত ছিল খুবই দৃষ্টিকটু ভাবে বেশি। যাই হোক, সেই বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে আমরা বরং ছাত্রলীগের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বিরক্তি ও সতর্কবার্তার উৎকৃষ্টতা অন্বেষণ করি, কিছুটা আশ্বস্ত বোধ করি।

এটা মোটামুটি হলফ করে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল যেভাবে ছাত্রলীগকে সতর্ক করেছেন, আমাদের দেশের আর কোন প্রধানমন্ত্রীকে এর আগে নিজের দলের কোন অঙ্গসংগঠনের প্রসঙ্গে কখনও এ ধরণের অবস্থান নিতে হয় নি। এর আগেও ২০০৯ সালে ছাত্রলীগের অভূতপূর্ব অবাধ্যতা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বার পর তার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক প্রধান-এর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এ ধরণের ঘটনাও সম্ভবত দেশের প্রধান কোন রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে ঘটেনি। ছাত্রলীগকে তবুও কেউ দমতে দেখেনি। অব্যাহত থেকেছে দোতলা-তিনতলা থেকে ছুঁড়ে ফেলা, নসরুল্লাহ্‌ ও আবু বকর সিদ্দিকিরা কেউ ভাঙ্গা মেরুদন্ড নিয়ে বা কেউ মাথার পেছনে দেড় ইঞ্চি ব্যাসের ছিদ্র নিয়ে আমাদের ছেড়ে না ফেরার জগতে চলে গেছে।

আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার প্রতি আশা করি দেশের কিয়দাংশ মানুষেরই এই বিশ্বাসটা আছে যে, তিনি যদি সত্যিই চান ছাত্রলীগের রাশ টেনে ধরে যাবতীয় অপকর্ম সাধন থেকে থামাতে, তিনি পারবেন। সেক্ষেত্রে তিনি হয়তো ইতমধ্যেই উপলব্ধি করেছেন যে ছাত্রলীগের মূল্যবোধ সংস্কারের যে প্রক্রিয়াটি এখন একটি অবশ্যকরণীয়, সে প্রক্রিয়াটি সফল করতে হলে ওনাকে ছাত্রলীগের বাইরে এসে মূল সংগঠনটিতেও কিছুটা সময় দিতে হবে, বিশেষ করে তার মন্ত্রীসভায়।

আরেকটু আলোকপাত করি।

অবশ্য বেশি আলোকপাত করার দরকার হবে না। দুটি ইউটিউব ভিডিও এখানে এমবেড করা আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেই দুজনকে তার পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ম দিয়েছিলেন, ভিডিও দুটিতে সেই দুইজন আওয়ামী লীগ নেতাকে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে। আলোকপাত যা করার তারাই করবেন।

আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি

নীচের ভিডিও ক্লিপটি একুশে সংবাদের একটি ফুটেজ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জাতীয় উন্নয়ন বিরোধী কর্মকান্ড শীর্ষক একটি আলোচনায় বক্তব্য রেখেছিলেন পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি। তার এই বক্তব্যটি ইতমধ্যেই ইন্টারনেটে যথেষ্ট প্রচার পেয়েছে, যেখানে তিনি সাংবাদিক ও আইনজীবিদের উদ্দেশ্য করে বেশ কিছু অশ্লীল ও লেখার অযোগ্য মন্তব্য করেছেন। সেগুলো আপনারা ভিডিওটিতেই দেখে নিবেন। এখানে শুধু ছাত্রলীগের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক অংশটুকু লিখছি। নীচের কথাগুলো আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি বলেছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে,

“কোরআন তেলাওয়াত করে সাপের ছোবল থেকে বাঁচা যাবে না। ওর জন্য যা দরকার তাই করতে হবে। নিজেরা নিজেরা মারামারি কর, অদের দুই চাইরটার সাথে মারামারি কর না ক্যান?”

রমেশ চন্দ্র সেন

নীচের ক্লিপটিতে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনকে। গত ১২ মে, ২০১০ তারিখে ঠাকুরগাঁও জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল জেলার শিল্পকলা অ্যাকাডেমি মিলনায়তনে। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিয়ে রমেশ চন্দ্র সেন নীচের বক্তব্যটি এন। লতিফ সিদ্দিকির পুরো বক্তব্যের একটা অংশ ছাত্রলীগের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হলেও, রমেশ সেনের প্রায় পুরো বক্তব্যটাই প্রাসঙ্গিক। ঠাকুরগাঁও জেলার ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন,

“নিয়োগ… এই সবগুলি আমাদের, একআধটা হয়তো স্লিপ হইতে পারে, জানি না ঠিক, ভুলক্রমে, কিন্তু আমাদের। পুলিশের চাকরিতেও তেমনি আমরা দিয়েছি, চেষ্টা করেছি আমাদের ছেলেদের দেওয়ার। আরও, এই যে এই ২০ তারিখে (২০ মে, ২০১০) পুলিশের চাকরির নিয়োগ হবে, অবশ্যই আমরা আমাদের নিজেদের ছেলেদের দেওয়ার ব্যবস্থা করব। তাছাড়া এই সামনে, এই ১৮ তারিখ থেকে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ হবে, আবার হেডমাস্টার নিয়োগ হবে। এ ব্যাপারে আমরা তথ্য নিচ্ছি। এই তথ্যগুলো নেয়ার পরে, অবশ্যই, আমরা আমাদের ছেলেদের প্রাধান্য দিয়ে কাজ করব।”

আমার এই লেখা ইহজগতে কখনও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গোচরে আসবে কিনা জানিনা, তাও বলি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি ছাত্রলীগকে নিয়ে যত ভাল পরিকল্পনাই করুন না কেন, আপনার সেই পরিকল্পনাগুলো ভেস্তে দেয়ার জন্য আপনার ভাষ্যমতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির যতটা ভূমিকা রাখতে পারত, তার চেয়ে বহু গুণে বেশি ভূমিকা ইতমধ্যেই রেখে ফেলেছেন আপনারই দলের দুজন শীর্ষ নেতা, যাদের উপরের আপনার ভরসা শুধু দলভিত্তিক নয়, এদের উপর ভরসা করে আপনি এদেরকে দুটো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ম দিয়েছেন।

এদের একজন আপনার অনুগত ছাত্রদের বলছে অন্য দলের ছেলেদের সাথে মারপিট করতে, আরেকজন বলছে তারা যাই করুক না করুক না কেন সরকারি সব চাকরি তাদের জন্য রেখে দেওয়া হচ্ছে।

রাজনীতি ও অপরাধ নিয়ে নির্মিত সিনেমা নাটকগুলোতে আমরা দেখি খল চরিত্রগুলো টগবগে তরুণদের অপরাধের জগতে আরও গভীরে তলিয়ে যাবার জন্য এগিয়ে দেয়। তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়, তাদেরকে উত্তপ্ত করে তুলে শত্রু নিধনের জন্য। টগবগে তরুণদের ব্যবহার করে শত্রু নিধনের ঘটনা বাস্তবেও ঘটে বেশি, সিনেমা নাটকগুলোতে সেগুলোরই প্রতিফলন হয়। সিনেমা নাটকে সেসব খল চরিত্রগুলোকে যতটা সহজে দেখিয়ে দেয়া হয়, বাস্তবে তাদের নাগাল পাওয়া সহজ হয় না। গোপন স্থানে বসে বাস্তব জীবনের সেসব খল চরিত্র কীভাবে একটি নিষ্পাপ তরুণকে অপরাধ করার জন্য উৎসাহ দিচ্ছে, সেসব দেখবার সুযোগ একজন সাধারণ নাগরিকের হয় না।

আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি সাধারণ নাগরিকদের জন্য সেই চিত্রটি সর্বসমক্ষে এনে দিলেন।

ভিডিও ক্লিপটিতে দেখুন কীভাবে একজন বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা তার দলের তরুণদের প্রতি অন্যকে হামলা করার পরামর্শ দিচ্ছেন। পশ্চিমা বিশ্বে যে ধরণে্র দৃশ্য গোপনে ধারণ করে জনসমক্ষে এনে দিলে সেই রাজনীতিকের রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটত চোখের পলকে, সে রকম একটি দৃশ্য আমাদের দেশে সবকটি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা একযোগে ধারণ করে সবার সামনে তুলে ধরল, কিন্তু এখনও “নিজেরা নিজেরা মারামারি কর, অদের দুই চাইরটার সাথে মারামারি কর না ক্যান?” বক্তব্য দেয়া রাজনীতিকের কিছু হয়নি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ছাত্রলীগের কর্মীদের বলেছেন, লেখাপড়ায় আরও মনযোগী হতে। ঐ কথা মা-বাবা ও শুভানুধ্যায়ী নিকটাত্মীয় অভিভাবক ছাড়া তাদের আর কেউ বলে না। দোতালা, তিনতালা থেকে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য দেখে হয়তো মা-বাবাও সেকথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু আপনি বলেছেন। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, তারা যে ইতমধ্যেই জেনে গিয়েছে যে পড়াশুনো না করলেও তাদের জন্য পুলিশে, প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক এমনকি প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকরির ব্যবস্থা করা আছে, তাদের কি আর লেখাপড়ায় ফেরানো সহজ হবে?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি তো তাদের বলেছেন অপরাধ করলে আইনমাফিক ব্যবস্থা থেকে তাদের আর কেউ বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার মন্ত্রীসভার সদস্য রমেশ চন্দ্র সেনের কাছ থেকে তো তারা ইতমধ্যে জেনেছে যে তাদের অপকর্ম নিয়ে বেশী আলোচনা করলে চ্যানেল ওয়ানের মত আরও কিছু চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাবে। রমেশ চন্দ্র সেন তো আপনার সরকারের ব্যাপারেই বললেন, সরকার নাকি এরকম আরও কিছু চ্যানেল বন্ধ করার জন্য চেষ্টা করছে। পাশাপাশি লতিফ সিদ্দিকি তাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন, নিষ্কর্ম বসে থেকে কোন লাভ নেই, যার জন্য যেটা প্রযোজ্য তার সাথে সেটাই করতে হবে। নিজে নিজে মারামারি বন্ধ করার কথাই তিনি বলেননি, তিনি বলেছেন তারা যেন অন্যান্য দলের ছেলেদের সাথেও মারপিট করে। তো, ছাত্রলীগের যারা ঐ দুই মন্ত্রীর কথা শুনে একটু হলেও উজ্জীবনের সন্ধান পেয়েছে, তাদের ফেরানো কি সহজ হবে? তাদের ফেরাতে হলে আগে আপনার এই মন্ত্রী দুজনের সাথে আপনার একটা বিহিত হওয়ার দরকার নয় কি?

https://i0.wp.com/www.bangladeshfirst.com/images/uploaded_images/80.jpg

ঢাকার গুলিস্তানে দ্বিমুখী যানজট (ছবিঃ বাংলাদেশ ফার্স্ট)

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার একেএম শহীদুল হক আফসোস করেছেন এই বলে যে, তিন বা পাঁচ শতাংশ মানুষ আইন ভঙ্গ করতে পারে, কিন্তু ১০০ ভাগ লোক আইন ভঙ্গ করলে পুলিশ কী করবে?

অর্থাৎ কমিশনার সাহেব আইন-শৃংখলার ব্যাপারে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। এই বিশেষ সময়ে ওনার উদ্বেগের কিছু কারণ অনুমান করা কঠিন নয়। চলছে রমজান মাস। মুসলিম-প্রধান দেশের আর দশটা রাজধানীর মত ঢাকাতেও রমজান মাসে শহর-চরিত্রের বলতে গেলে একটা আমূল পরিবর্তন ঘটে। গুরত্বের বিচারে বাজারদর নিয়ন্ত্রণের ঠিক পরেই অবস্থান নেয় আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি। এমনকি কোন কোন ঘটনার পর এই রমজান মাসে বিশেষ করে ঢাকাতে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতিই হয়ে উঠে সরকারের প্রধান মাথা-ব্যাথা, ২০০৭ সালের রমজানে মলম পার্টির দৌরাত্মে যেমনটা ঘটেছিল।

তবে সাধারণ মানুষের আইন ভঙ্গের প্রবণতার ব্যাপারে ডিএমপি কমিশনার যে বক্তব্যটা দিলেন, তা খুব সম্ভবত তিনি দিয়েছেন ট্রাফিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে। প্রাত্যহিক জীবনে আর কোথাওর চেয়ে রাস্তাঘাটেই একজন নাগরিককে সবচেয়ে বেশী করে এবং প্রায় প্রতিটি মুহুর্তেই আইনের বেড়াজালের মধ্যে থাকতে হয় পথচারী, গাড়ীচালক বা যাত্রী- যে ভূমিকাতেই হোক না কেন। ছোট বা বড় আইন ভঙ্গের ঘটনার সরাসরি প্রভাবটা গিয়ে পড়ে শহরের যানচলাচল পরিস্থিতির উপর, এবং বলতে দ্বিধা নেই, আমরা অর্থাৎ সাধারণ মানুষদের কিছু আইন না মেনে চলাটা রাজধানী ঢাকার যানজটের জন্য বিশেষ ভাবে দায়ী।

ট্রাফিক আইন মেনে চলার প্রসঙ্গ আসলে, এবং সেখানে যদি ঢাকার সাধারণ নাগরিকদের কেউ দোষী করেন (কোন পুলিশ কর্মকর্তা করলে তো কথাই নেই), তাহলে সাধারণ নাগরিকদের অধিকাংশই একটা ব্যাপার অবশ্যই উল্লেখ করবেন। সেটি হচ্ছে, শহরে চলাচলকারী আমাদের রাজপুরুষরা ট্রাফিক আইন কতটা মেনে চলেন।

বর্তমানে আমাদের শাসনব্যবস্থার মধ্যে শুধু ‘রাজনীতি’ শব্দটিতে ছাড়া আর কোথাও ‘রাজ’ শব্দমূলটি পাওয়া যায় না। তাও লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মন্ত্রী-আমলাসহ প্রশাসনের ঊর্দ্ধতন চাঁইদের বোঝাতে প্রায়ই এই ‘রাজপুরুষ’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। এখন কথা হচ্ছে, আমাদের রাজপুরুষরা রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময়ে ট্রাফিক আইন কতটা মেনে চলেন।

যাওয়ার রাস্তায় যানজট থাকলে একটি পুলিশের জিপ বা অন্যকোন গাড়ী আইন ভেঙ্গে পাশের উলটো দিকে যাওয়ার প্রায় ফাঁকা রাস্তাটির ডান পাশ ঘেঁষে এগিয়ে যাচ্ছে, কিংবা একটি পতাকাবাহী গাড়ী (রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ব্যাতীত) যানজট ঠেলে কোনরকমে তার পুলিশ-এসকর্ট সমেত চৌরাস্তা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, যদিও তখনও ট্রাফিক সিগন্যাল এগোবার অনুমতি দেয়নি, ঢাকায় চলাফেরা করতে গেলে এসব দৃশ্য চোখ এড়িয়ে যাবার কোন কারণ নেই। উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ সমষ্টিগত ভাবে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে, রাস্তায় নামলে এদের অনেককেই ট্রাফিক আইনের প্রতি ওভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতে দেখা যায়।

তাহলে ঢাকার যানজটের তীব্রতার পেছনে ‘রাজপুরুষ’-দের ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করার ওসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভূমিকা কতটুকু। তারা কি আইন ভেঙ্গে ঘটনাস্থলেই একটা যানজটের সৃষ্টি করেন? হয়তো করেন, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের আইন মেনে না চলার ঐ ঘটনাগুলো ঘটনাস্থলে যতটা না প্রভাব ফেলে তার চেয়ে বেশী প্রভাব ফেলে সামগ্রিক বিচারে।

কোন কোন সূত্রমতে ঢাকার জনসংখ্যায় প্রতি বছর বাহির থেকে ১৪ লক্ষ লোক যুক্ত হয়। এই পরিস্থিতিতে ব্যবস্থা না নিলে ভেঙ্গে পড়বার অপেক্ষায় থাকা ছাড়া ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থার আর কিছুর করার থাকবে না।

একজন সাধারণ নাগরিক যিনি কোন বাসে বা প্রাইভেটকারে বা সিএনজি অটোরিকশাতে বসে আছেন এবং অসহনীয় যানজটে ত্যাক্ত-বিরক্ত হচ্ছেন, উলটো দিকে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে আইন ভেঙ্গে চলতে থাকা পুলিশের গাড়ীটি সেই নাগরিকের উপর প্রভাব ফেলে সবচেয়ে বেশী। এসব ঘটনার ফলে, আইনকে শ্রদ্ধা করার যতটুকু প্রবৃত্তি সেই নাগরিকের মধ্যে গড়ে উঠেছিল, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা সংস্কার যার বদৌলতেই হোক না কেন, সে প্রবৃত্তি ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। এই ঘটনার দেখাদেখি যদি তিনিও একটি ট্রাফিক আইন ভেঙ্গে বসেন এবং দ্বিতীয় কোন পুলিশ সদস্যের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে আইনভঙ্গের ব্যাখ্যা হিসেবে তার সেই পুলিশকে আইন ভাঙ্গতে দেখার অভিজ্ঞতার উল্লেখ করেন, তাহলে তার শাস্তি বিন্দুমাত্র লোপ তো পাবেই না, উপরন্তু তিনি দ্বিতীয় ঐ সদস্যের কাছ থেকে কিছু ভৎসর্না পাবেন, অপমানিতও হতে পারেন। এ পর্যায়ে আইনের প্রতি তার শ্রদ্ধা লোপ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুতলয়ে চলতে থাকে। এই শ্রদ্ধা কমতে থাকার ঘটনাটি মূলত যে কুপ্রভাবটি ফেলে, তা হচ্ছে- সেই ব্যাক্তি ও তার মতন অনেকেই ট্রাফিক আইন মেনে চলাটিকে আর অতীব গুরুত্বপূর্ণ কিছু হিসেবে গণ্য করেন না।

এখন, উপরের যত সহজ ও সরল ভাবে প্রক্রিয়াটির ব্যাখ্যা দেয়া হল, সবার ক্ষেত্রে তা ওভাবে নাও ঘটতে পারে। কারও ক্ষেত্রে তা প্রভাব কম ফেলবে, কারও ক্ষেত্রে হয়তোবা ফেলবে বেশী। কিন্তু দিনশেষে যেটা দাঁড়ায়, “আমি রং সাইড দিয়ে গেলে আমাকে কে কী করবে?”, আমাদের রাজপুরুষদের এই চিন্তাধারা ঢাকার ট্রাফিক পরিস্থিতির অবনতির পেছনে বেশ শক্তিশালী ভূমিকাই পালন করে।

তবে একটা ব্যাপার উল্লেখ করতে হয়, একটি গাড়ীর মালিক, জিম্মাদার বা ব্যবহারকারী যিনিই হোন না কেন, রাস্তা দিয়ে গাড়ীটি প্রকৃতপক্ষে চলে তার চালকের ইচ্ছা অনুসারেই। এক্ষেত্রে গাড়ীটিকে আইন ভাংতে দেখলেই নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না যে এটি যিনি ব্যবহার করেন তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। হয়তো সেই গাড়ীর মালিক বা ব্যবহারকারী রাজপুরুষ আইন ভঙ্গের প্রবণতাকে ঘৃণা করেন, কিন্তু গাড়ীচালক সেই ব্যবহারকারীর অনুপস্থিতিতে তার পেশা, পদ বা অবস্থানের সুযোগ নিয়ে রাস্তায় কোন ট্রাফিক আইন ভাংছে কিনা এবং তার ফলে সামগ্রিক ভাবে কী বিরূপ প্রভাব পড়ছে, সেসব ব্যাপারে যদি তারা একটু মনযোগ দেন,তাহলে হয়তো তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও যানজট নিরসনে কিছুটা ভূমিকা পালন করতে পারবেন।



১২ মে, ২০১০ তারিখে দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত রিপোর্ট,

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা
জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে মতিউর রহমানকে
নিজস্ব প্রতিবেদক


মতিউর রহমান, প্রথম আলোর সম্পাদক

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ও সাংবাদিক টিপু সুলতানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। এই মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামি সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর দেওয়া জবানবন্দির পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। সিআইডি সূত্র এ কথা জানায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিআইডির একাধিক কর্মকর্তা গতকাল মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে জানান, কালের কণ্ঠে গত সোমবার আবদুস সালাম পিন্টুর জবানবন্দি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় প্রথম আলো ক্ষুব্ধ। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে কয়েকজন সাংবাদিক তাঁদের দোষারোপ পর্যন্ত করছেন। ফলে তাঁরাও এখন বিব্রত অবস্থায় আছেন।

গত ২৭ এপ্রিল আবদুস সালাম পিন্টুকে হাজির করা হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শরিফুর রহমানের আদালতে। ২০০১ সালের ১৬ জুন চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে বোমা হামলা মামলায় (মামলা নম্বর ১০ (০৬) ২০০১) রিমান্ডের জন্য ওই দিন শুনানি হয়। এই মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী আনিসুর রহমান দীপু কালের কণ্ঠকে জানান, সিআইডি পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত পিন্টুর চার দিনের (গত ২৭ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত) রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ওই দিনই সিআইডি পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পিন্টুকে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় নেয়।

সিআইডি সূত্র মতে, পিন্টুকে রিমান্ডে এনে এই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করাকালে প্রসঙ্গক্রমে চলে আসে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিষয়টি। এ সময়ই আবদুস সালাম পিন্টু প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের সম্পৃক্ততার কথা বলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতেই ২৯ এপ্রিল তাঁর এই জবানবন্দি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় পুলিশ লিপিবদ্ধ করে। গত মঙ্গলবার কালের কণ্ঠে যে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে, পিন্টুর জবানবন্দিতে সে সবই উল্লেখ আছে বলে সূত্র জানায়।

সূত্র আরো জানায়, মামলাটির অধিকতর তদন্ত অনেকটাই চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে এসেছিল। তবে এ ধরনের কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য চলে আসায় মোড় অনেকটা ঘুরে গেছে। আর এ কারণেই আরো বেশ কিছু সময় প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তাই আদালত থেকে তিন মাসের সময় নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, তদন্তে জানা যাচ্ছে যেসব ব্যক্তি আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার পাশাপাশি অরাজনৈতিক ‘তৃতীয় শক্তি’র হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে চেয়েছিলেন, তাঁরা এ হামলার ঘটনায় সহায়তা করেছেন। এসব তথ্য বের হয়ে আসায় তাঁরা এখন অধিকতর তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার অজুহাত তুলে নতুন রহস্য উন্মোচনে বাধা সৃষ্টি করতে চাইছেন। গতকাল দৈনিক প্রথম আলোতে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্তবিষয়ক একটি রহস্যজনক প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ায় নানা প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। ‘বদলে দেওয়া’র স্লোগানে মুখর পত্রিকাটি কৌশলে তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।

ওই পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকতর তদন্তে মাওলানা তাজউদ্দিনসহ হামলায় জড়িত জঙ্গিদের সহযোগী হিসেবে তৎকালীন প্রভাবশালী অনেকের নাম বেরিয়ে আসছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়। কিন্তু এ প্রভাবশালীদের মধ্যে কারা সন্দেহভাজন, তা প্রকাশ করা হয়নি।

দৈনিক কালের কণ্ঠে ছাপা হওয়া এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনের পাল্টা প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর জবানবন্দির ব্যাপারে গতকাল প্রকাশিত প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘খোঁজ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোনো কিছুই জানাতে পারেননি। জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেন, এমন কোনো জবানবন্দির কথা তাঁরা জানেন না। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হকও একই রকম মন্তব্য করেন।’ প্রথম আলোর মতো পত্রিকায় এ ধরনের প্রতিবেদন হাস্যকর। সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের ভালো করেই জানা থাকার কথা, কোনো মামলার তদন্ত শেষ হওয়ার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী আসামিদের দেওয়া প্রাথমিক জবানবন্দির তথ্য সাধারণত অবগত থাকেন না। তদন্ত কর্মকর্তারা বিষয়গুলো সংরক্ষণ ও যাচাই করে থাকেন। সে ক্ষেত্রে দৈনিক প্রথম আলো তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রকাশ না করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, র‌্যাব ও ডিবি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি ছেপে ধোঁয়াশা তৈরি করে পাঠকদের বিভ্রান্তিতে ফেলেছে। কারণ তাঁরা কেউই সরাসরি তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন। বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তার বাইরে খুব বেশি কারো অবগত থাকার কথা নয়।

সিআইডি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিআইডি ২৯ এপ্রিল এ ধরনের কোনো জবানবন্দি নেয়নি। তা ছাড়া ওই দিন পিন্টু ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় রিমান্ডেও ছিলেন না। আংশিক সত্য এ তথ্যের আড়ালে পত্রিকাটির অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে বলেই সন্দেহ করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। আগের দিন দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে কোথাও বলা হয়নি আবদুস সালাম পিন্টু ২১ আগস্ট মামলায় রিমান্ডে ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, তিনি জবানবন্দি দিয়েছেন সিআইডি দপ্তরে। সেখানে তিনি অন্য বোমা হামলা মামলায় রিমান্ডে ছিলেন।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তদন্তে বেরিয়ে আসে, সমাবেশে হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে জঙ্গিদের আর্জেস গ্রেনেড সরবরাহ করেছিলেন মাওলানা তাজউদ্দিন। তাজউদ্দিন পিন্টুর ছোট ভাই। তাঁরা দুই ভাই এ মামলার অভিযুক্ত আসামি। পিন্টু এ মামলায় কারাগারে থাকলেও তাজউদ্দিন পলাতক।’ এ দুজনের সঙ্গে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ও প্রতিবেদক টিপু সুলতানের সম্পর্কের কথা প্রকাশ পেয়েছে জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ১৬১ ধারার জবানবন্দিতে।

এদিকে কালের কণ্ঠে আলোচিত জবানবন্দি প্রকাশের পর প্রথম আলোর সাবেক ও বর্তমান কর্মীদের অনেকে জানিয়েছেন, জঙ্গিনেতা তাজউদ্দিন একাধিকবার প্রথম আলো কার্যালয়ে মতিউর রহমানের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাঁরা দীর্ঘ সময় আলাপও করেছেন।

Bangladesh Updates says,

“Statements of former BNP minister Abdus Salam Pintu and HuJI leader Mufti Hannan were allowing the detectives to believe that radical leader and another HuJI kingpin Maulana Tajuddin has had somewhat links with the 21 August assassination attempt on Sheikh Hasina.”

“Recent CID quizzes over Abdus Salam Pintu and some other low-cap HuJI leaders have revealed that Maulana Tajuddin and Prothom Alo editor Matiur Rahman once have maintained a very active communication, particularly prior to the 21 August bombings at Bangabandhu Avenue. Some former employees of Prothom Alo who worked there in 2004 also have agreed that such communications existed. Even some of them have confirmed that Matiur Rahman with some other men from Prothom Alo held numerous long meetings with Tajuddin prior to the 21 August bombings.”

“Now, CID have decided to quiz Matiur Rahman over his relation with Maulana Tajuddin.”

“Notably, Prothom Alo has made precise cover-stories over operations of organizations like HuJI and other radical Islamic groups. But Maulana Tajuddin, who has always been a high profile HuJI leader, have never come to the focus of any single report made by Prothom Alo.”

রুহুল কুদ্দুস বাবু। ভাইসাহেবের দুটো পরিচয় আছে। আসলে আছে তিনটি, তো তৃতীয়টির জন্য সামান্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন, তাই সেটা পরে দেই। প্রথম পরিচয় হচ্ছে, তিনি খুব শীঘ্রই বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় একজন বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন। একেবারে হাইকোর্টের জাস্টিস। নিয়োগ দিবে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার। এই গেল প্রথম পরিচয়।

দ্বিতীয়টা হচ্ছে, তিনি একজন প্রাক্তন ছাত্রনেতা। আগে জাসদ করতেন। পরে ছাত্রলীগের নেতা হন। উনি কিন্তু ঐ ঢাকা ইউনিভার্সিটির দুই সাংবাদিক পিটানো সৈকতের মত এলেবেলে ছাত্রলীগ নন। ইনি ছাত্রলীগের টিকেট নিয়ে রাকসুর জিএস হয়েছেন, সালটা ঠিক খেয়াল নেই, তবে আশির দশকের একদম শেষের দিকে রাকসুর কোন একটা ইলেকশানে। জনপ্রিয় নেতাই বটে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবু বকর সিদ্দিকীর কথা নিশ্চয়ই ভুলিনি। এই আবু বকর সিদ্দিকীকে নিয়ে যখনই আলোচনা হবে, তখনই এটা উল্লিখিত হবে যে এই নিরীহ ও মেধাবী ছেলেটা ছাত্রলীগের দুটি গ্রুপের সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছিল। রাজশাহীর ফারুক হোসেনের মৃত্যুর পর প্রায় দেড় হাজার গ্রেপ্তার করা হলেও, এই আবু বকর সিদ্দিকী মারা যাওয়ার পর ঐ মামলায় এখনও কোন গ্রেপ্তার হয়নি। আঘাতের ফলে বকরের মাথার পেছনের ছিদ্রটির ব্যাস দেড় ইঞ্চির বেশী হওয়া স্বত্ত্বেও নয়। কারণ একটাই, ফারুক ছাত্রলীগ সদস্য ছিল, আর বকর জানত না যে মৃত্যুর আগে তার ছাত্রলীগে যোগ দেয়া উচিত ছিল। লীগ-দল-পার্টি-মৈত্রী-সমাজ ইত্যাদির কোনটার সদস্য না হয়েও বকরের মৃত্যু হয়ছে ‘রাজনৈতিক সহিংসতায়’। দুটো দলের মারপিটও নয়, হল দখলে ছাত্রলীগের দুটো গ্রুপের মারপিট ও পরে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে পুলিশের পদার্পণ।

আসলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আবাসিক পরিচয় আব্দুল লতিফ হল। আবু বকরের মতই মেধাবী। আবু বকর কিন্তু শুধু পত্রিকার ভাষার মেধাবী ছাত্র ছিল না, সে একেবারে রেজাল্ট শিটের মেধাবী ছাত্র। ঢাবিতে ইসলামিক হিস্ট্রি বিভাগে তার ব্যাচে সে-ই ছিল সবচেয়ে বেশী সিজিপিএ-অলা ছেলে। এমনকি খুন হওয়ার তিন সপ্তাহ পরে দেওয়া রেজাল্টেও দেখা গেল বকরই ফার্স্ট হয়েছে।

১৯৮৮ সালের ১৭ই নভেম্বার। ঐ আব্দুল লতিফ হল দখল বা অনুরূপ কোন একটা মহৎ উদ্দেশ্যে বিশিষ্ট ছাত্রনেতা রুহুল কুদ্দুস ভাইয়ের গ্রুপের সাথে তার প্রতিপক্ষ গ্রুপের একটা পানিপথের যুদ্ধ সেদিন হয়েছিল। এই পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহীম লোদী বা বাবরের পক্ষের কজন সৈন্য শহীদ বা গাজী হল দুর্জনেরা তা বলে যায়নি। তবে সেই যুদ্ধে আসলাম গেল মরে। একেবারে আবু বকর সিদ্দিকীর মত আচমকা, কিংবা তার চেয়ে বেশী বা কম।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছাত্রহত্যার যেকোন ঘটনার পরই অভিভাবক শ্রেণীর মানুষজন বলেন, “কেন যে তোরা যাস পলিটিক্স করতে, মা বাবা কত কষ্ট করে পড়ায়, পড়তে পাঠায়, আর তোরা এসব করে পরিবারটাকে ধ্বংস করিস”, ইত্যাদি। কিন্তু আবু বকর বা আসলাম কারও ক্ষেত্রেই একথা গুলো বলার সুযোগ নেই। কেননা তারা কেউ কোন দলের সক্রিয়-নিষ্ক্রিয় কোন সদস্যই ছিল না।

যাই হোক, পরের দিন, অর্থাৎ ১৮ই নভেম্বার, বোয়ালিয়া থানায় আসলামের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটা হত্যা মামলা দায়ের করা হল। মামলার নাম্বার, ১৯৮৯ সালের নভেম্বার মাসের ১৪নং মামলা। আসামী ৩০ জন। প্রধান আসামী রুহুল কুদ্দুস বাবু। মামলার এজহারে তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করলেন, “জাসদ ছাত্রলীগ নেতা রুহুল কুদ্দুস বাবু কিরিচ দিয়ে আসলামকে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে”।

তদন্ত শেষে ১৬ জনকে বাদ দিয়ে ১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী বাকি ১৪ জনের নামে পুলিশ চার্জ গঠন করে। রুহুল কুদ্দুস বাবু ১নং আসামী। চার্জ গঠনের শুনানি শেষে চার্জশিট থেকে কয়েকজনকে বাদ দেয়া হয়। কিন্তু হাইকোর্টে এই বাদ দেয়াকে চ্যালেঞ্জ করে রিভিশান দায়ের করা হলে হাইকোর্ট চার্জশীটের কাউকে বাদ না দেয়ার নির্দেশ দেন। এই শেষের রায়টি হয় ২০০৯ সালের ২রা জুলাই তারিখে, রায় দেয় হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ। অর্থাৎ মামলাটি আজও পুরোপুরি সচল ও জীবিত।

জনাব বা জনাবা পাঠক, কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে আসলামকে মারার অভিযোগে রুহুল কুদ্দুস বাবু-র বিরুদ্ধে মামলাটি আজও রাজশাহীর জেলা ও দায়রা জজ কোর্টে বিচারাধীন আছ, মামলা নং-২৫৯/২০০২। রুহুল কুদ্দুস বাবু ১নং আসামী, ভিক্টিমকে কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে মারার দায়ে অভিযুক্ত।

মাননীয়, শ্রদ্ধেয়, জাহাপনা, প্রিয় ইত্যাদি বিশেষণযুক্ত পাঠক, আপনাকে উদ্দেশ্য করে বলছি বা লিখছি, ইনশাল্লাহ এই সপ্তাহেরই কোন একটা দিনে এই রুহুল কুদ্দুস বাবু, এই রুহুল কুদ্দুস বাবু মানে সেই রুহুল কুদ্দুস বাবু, যার নামে মামলার এজহারে ভিক্টিমকে কুপিয়ে মারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু তাই না, হাইকোর্টে তা গৃহীতও হয়েছে, সেই রুহুল কুদ্দুস বাবু হাইকোর্টের একজন বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাবেন।
নিয়োগ লাভের জন্য অধীর অপেক্ষায় আরও কয়েকজন যারা আছেন, তারা রুহুল কুদ্দুস বাবুর তুলনায় রীতিমত বিনা বিচারে বেহেশ্ত নসিব হওয়ার যোগ্য। তারা হলেন-

খসরুজ্জামান সাহেব, যিনি বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষায় আছেন, ২০০৬ সালের ৩০শে নভেম্বারে প্রধান বিচারপতির এজলাসের দরজার কাঁচ লাত্থি দিয়ে ভাংছেন।

আবু জাফর সিদ্দিকী, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক (১৯৯৭-২০০১)
জাহাঙ্গির হোসেন সেলিম, বর্তমানে অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের জুনিয়ার
খসরুজ্জামান, বর্তমানে ডেপুটি এ্যটর্নি জেনারেল ও আওয়ামী প্যানেল থেকে নির্বাচিত সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবি সমিতির সাবেক সভাপতি
প্রমুখ

দলীয় বিবেচনায় বিচারপতি নিয়োগের ঘটনা এই প্রথম তো নয়ই, এমনকি দ্বিতীয়ও নয়। বিগত বিএনপি সরকারের সময়ই মার্কশীটের ফ্লুইড চালিয়ে রেজাল্ট বদলে নিয়োগ দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য পরে সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে বিষয়টি তোলার আগেই আলোচিত ফায়েজী সাহেবের বিচারপতি জীবনের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটে। সংক্ষিপ্ত বিচারক জীবনে তিনি দুই বিএনপি নেতাকে খালাস দিয়ে যে দুটি রায় দেন, সেগুলোও বাতিল হয়ে যায়।

কিন্তু একটি সচল, জীবিত মামলার এজহারে যার নামে ভিক্টিমকে কিরিচ দিয়ে মারার কথা উল্লেখ করা আছে, সেরকম কোন মানুষকে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের ঘটনা বাংলাদেশে প্রথম, এই বিষয়ে অনেক টাকা বাজি ধরা যেতে পারে।

একটি মামলার চার্জশীট থেকে বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা জয়নাল হাজারীর নাম বাদ দেয়াকে অনুমোদন না করার অপরাধে বর্তমান আইন প্রতিমন্ত্রী (যিনি বটতলার উকিল হিসেবে আখ্যায়িত হওয়ার পর বেজায় রেগে যান) কামরুল ইসলাম একজন বিচারপতির বিরুদ্ধে সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু এরকম হাস্যকর প্রস্তাবে নিতান্ত আনাড়ি আইনজীবিরাও মশকরা শুরু করে দেয়াতে কামরুল ইসলাম তা দ্বিতীয়বার উচ্চারণ থেকে বিরত থাকেন।

তো, কামরুল ইসলামের মত লোকেরা যেখানে আইন প্রতিমন্ত্রী, সেখানে কি রুহুল কুদ্দুস বাবুর মত লোকদের বিচারক হওয়া স্বাভাবিক না?

না, স্বাভাবিক না। খুনের মামলার ১নং আসামীর বিচারক হওয়া তার চেয়েও মারাত্মক ব্যাপার। তার চেয়ে কামরুল ইসলাম সাহেবের ঐসব মন্তব্যও অনেকটা সহ্য করে নেয়ার মত।

মুহম্মদ তাওসিফ সালাম
১৯ মার্চ, ২০১০

বর্তমান সরকার যে বিরোধী দল বিএনপিকে নিয়ে এক ধরণের অবসেশানে ভুগছে, তা এই মুহুর্তে সম্ভবত অনস্বীকার্য। সংসদে আসনের হিসেবে অপেক্ষাকৃত দূর্বল বিএনপির প্রতি সরকারী দল কিছুটা অমনযোগী হলে একটি অন্য আলোচনার সূত্রপাত হতে পারত। কিন্তু আসলে তা ঘটছে না, বরং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের কথাবার্তায় বিরোধী দল বারবার আসছে। কিন্তু এই মনযোগের মাত্রাটাই হচ্ছে দুশ্চিন্তার মূল কারণ।

বিরোধী দল কেন সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করে না, কেন সরকারকে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে উপযুক্ত পরামর্শ দিচ্ছে না, সরকারের দুশ্চিন্তাটা এই ধাচের হলেও না হয় আমরা কিছুটা স্বস্তি পেতাম। কিন্তু বিএনপিকে নিয়ে সরকারের অবসেশানের মূলে যে বিষয়বস্তুগুলো রয়েছে, তার সাথে ঐসব সুন্দর সুন্দর আলোচনার কোন সম্পর্ক নেই। বিএনপিকে কীভাবে শিক্ষা দেয়া যেতে পারে, বিএনপি কিছু করলে রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক কী কী উপায়ে জবাব দেওয়া হবে, মূলত এগুলো হচ্ছে আলোচ্য বিষয়। এখান থেকেই কোন না কোন একটা পয়েন্ট তুলে নিয়ে কখনও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, কখনও আইনমন্ত্রী, কখনও বা এলজিআরডি মন্ত্রী নানান বিএনপি-মুখর আলোচনায় মেতে উঠেন। এমনকি ‘নতুন’, ‘অনভিজ্ঞ’ বা ‘স্বল্পকালীন বিশেষ ক্ষমতাবানদের প্রিয়জন’ ইত্যাদি বিশেষণ যোগ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরই পদবঞ্চিতরা যাদের ব্যপারে মাঠে ঘাটে কুৎসা গেয়ে বেড়ান, মন্ত্রীসভার এমন কিছু সদস্যও অনেক সময় বিএনপি-মুখর আলোচনার লোভ সামলাতে পারেন না।

বাংলাদেশের মানুষ তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশী রাজনীতি সচেতন এ কথা কম বেশী অনেক আলোচনাতেই উঠে আসে। অতএব রাজনৈতিক কূটকচালি তাদের প্রাত্যহিক জীবনের একটা অঙ্গ হতে পারত। কিন্ত অধিকাংশেরই তা হয়ে ওঠে না। দেশের জ্বালানী পরিস্থিতির ভবিষ্যত, দ্রব্যমূল্যের ঊর্দ্ধগতি, শ্রমবাজারের করুণ অবস্থা, কৃষকদের ফসলের উপযুক্ত দাম না পাওয়া, বিদ্যুতের অভাবে সেচকাজ ব্যহত হওয়ার আশংকা প্রভৃতি নিয়ে একবার চিন্তিত হয়ে পড়লে তখন মানুষ আর কাঁদা ছোড়াছুড়ির সময় কোন পক্ষের প্রতিই বিশ্বাস স্থাপনে প্রবৃত্ত হয় না। চলতি সবগুলো সমস্যার জন্য বিগত সরকারকে দায়ী করার ঘটনাকে তখন মানুষ দেখে দায় এড়ানোর অজুহাত হিসবে।

ঢাকায় কর্মস্থলে যাবার সময় যানজটের কারণে যার দেরী হয়ে যাচ্ছে, তার কাছে মূখ্য হচ্ছে যে সরকার যানজট নিরসনে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সে বিষয়টি। বিএসএফের গুলিতে সীমান্তবর্তী গ্রামের যে নারী পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে বিধবা হয়েছেন, তার কাছে মূখ্য হচ্ছে সরকারের কথিত বন্ধুদের এরকম অমানুষিক আগ্রাসন নিরসনে গৃহীত ব্যবস্থা। ঐ সদ্য বিধবা বাংলাদেশী নারী আশ্চর্য হয়ে ভাবেন, তার স্বামীর মত ১৪ জন এ বছর বিএসএফের বলি হল, অথচ ডঃ দিপু মণি নামের ভদ্র, শিক্ষিত ও সুন্দর ব্যবহারের রাজনীতিবিদ যাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্ম দেয়া হয়েছে, তিনি একটি বিবৃতি পর্যন্ত দিলেননা, একটা প্রতিবাদ জানালেন না।

নিম্ন বা মধ্য আয়ের যে মানুষটি কাঁচাবাজার করতে গিয়ে প্রতিদিনই উচ্চমূল্যের কারণে একটু একটু করে তার প্রয়োজনীয় কেনাকাটার পরিমাণ সংকোচন করে আসছেন, তার কাছে মূখ্য হচ্ছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনে সরকারের ভূমিকা। নির্বাচনী সমাবেশে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর শ্লোগান “আওয়ামী লীগকে ভোট দেব, ১০ টাকা কেজির চাল খাব”, এই শ্লোগান তার কানে বাঁজে, এবং তিনি আশ্চর্য হয়ে দেখেন যে এলজিআরডি মন্ত্রী এই শ্লোগানকে অস্বীকার করেছেন। অনার্স পড়তে থাকা বা অনার্স-মাস্টার্স দুটোই শেষ করে চাকরি না পাওয়া যে ছেলে বা মেয়েটি টিউশানি করে বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে পার্স ও মোবাইল খুইয়েছে, তার কাছে মূখ্য হচ্ছে সন্ত্রাস দমনে সরকারের ভূমিকা। ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মসংস্থান বাজার প্রসারণ নিয়ে সুন্দর সুন্দর যে কথাগুলোর উল্লেখ ছিল, সেগুলো সে পড়েছে, এবং অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তার অন্তত একটা ভগ্নাংশেরও বাস্তবায়ন হওয়ার।

তো, সমস্যার মধ্যেই আমাদের বসবাস। এতটুকু একটা জায়গায় আমরা এতগুলো মানুষ বাস করছি। আজকে যে অনার্স পড়তে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, সে তার নিম্ন মাধ্যমিকের সমাজ বিজ্ঞান বইতে জেনেছিল বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১২ কোটির কিছু বেশী। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক হিসাব মতে সেই সংখ্যা এখন ১৬ কোটি ২২ লক্ষ। তো, এই দেশে আবার দুশ্চিন্তায় চুল ছিড়বার মত সমস্যা থাকে না কি করে? দেশের মানুষ হয় জানছে নয়তো একদম সরাসরি উপলব্ধি করছে যে একটা না, হাজারো সমস্যা রয়েছে যেগুলো সমাধানে ঝাঁপিয়ে পড়া দরকার। সমাধানের প্রচেষ্টা কতটুকু দেখছে সেটা ভিন্ন বিতর্ক, কিন্ত মানুষ ফলাও ভাবে এটাও দেখছে যে সরকারের ঊর্দ্ধতন দায়িত্মশীল ব্যক্তিবর্গের একটা প্রধান আলোচ্য বিষয় হচ্ছে বিরোধী দল। তাও আবার বিরোধী দলকে কিভাবে উন্নয়ন কর্মকান্ডে শামিল করা যায় তা নিয়ে মাথাব্যাথার চিহ্নও দেখা যাচ্ছে না, বরং প্রধানমন্ত্রী নিজ মুখে উচ্চারণ করছেন যে ওমুক সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়েছে বিএনপিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্যে।

তো, বিরোধী দলের প্রতি বেশী বেশী মনযোগের কিছুটা চিরায়ত সমস্যাগুলো সমাধানে ব্যায় করা হলে হয়তো আমরা একটু স্বস্তি পেতে পারতাম।

স্বাগতম

লেখক সংঘে আপনাকে স্বাগতম। এই ব্লগটির উপাদানসমূহ যদি আপনি পছন্দ করে থাকেন, তাহলে আশা করা যেতে পারে নিন্মোক্ত ব্লগগুলোও আপনার ভালো লাগবে।

আর ইংরেজী লেখক সংঘ তো থাকছেই।

অগাষ্ট 2017
সোম বুধ বৃহ. শু. শনি রবি
« এপ্রিল    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

RSS বিবিসি বাংলা

  • An error has occurred; the feed is probably down. Try again later.